১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

কক্সবাজার হাসপাতালের লিফটে ‘ত্রুটি’, নিচে মিলল নিখোঁজ নারীর লাশ

“নিখোঁজ হওয়ার দিন তিনি চতুর্থ তলায় লিফটে ঢুকেছিলেন। এরপর তাকে আর বের হতে দেখা যায়নি।”

কক্সবাজার হাসপাতালের লিফটে ‘ত্রুটি’, নিচে মিলল নিখোঁজ নারীর লাশ
কোহিনূর আক্তার

বিডিনিউজ২৪

সৌরভ দেব, কক্সবাজার প্রতিনিধি. বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 08 Mar 2026, 04:21 PM

Updated : 26 Aug 2026, 03:06 PM

কক্সবাজার সদর হাসপাতালে লিফটের নিচ থেকে চার দিন ধরে নিখোঁজ থাকা এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় সামনে এসেছে লিফটের সম্ভাব্য মারাত্মক ত্রুটির প্রশ্ন।

শনিবার বিকাল ৩টার দিকে নারীর মরদেহটি উদ্ধারের কথা জানিয়েছেন কক্সবাজার সদর থানার ওসি মো. ছমি উদ্দিন।

উদ্ধার ৩২ বছর বয়সী কোহিনূর আক্তার উখিয়া উপজেলার রাজাপালং ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ ডেইলপাড়া এলাকার বাসিন্দা এবং কাতার প্রবাসী নুরুল ইসলামের স্ত্রী।

তিনি বুধবার তার সাত বছর বয়সী মেয়েকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে আসেন এবং তাকে সেখানে ভর্তি করেন। সেদিন দুপুর থেকে তিনি নিঁখোজ। 

হাসপাতালের মর্গের সামনে থাকা পরিবারের সদস্যদের মতে, সেদিন বেলা ১টার দিকে তিনি হাসপাতালের নিচে নেমে লিফটে করে আবার উপরে ওঠার চেষ্টা করছিলেন। পরে আর তার খোঁজ মেলেনি। 

এ ঘটনায় পরিবারের সদস্যরা কক্সবাজার সদর মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করে।

সিসিটিভি ফুটেজ থেকে নেওয়া ছবি।

সিসিটিভি ফুটেজ থেকে নেওয়া ছবি।

নিহতের ভাশুরের ছেলে আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “চার দিন ধরে আমরা বিভিন্ন জায়গায় কোহিনূরকে খুঁজেছি। পুলিশ এবং র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)কেও বিষয়টি জানিয়েছি।”

তিনি বলেন, “আজ (শনিবার) সিসিটিভি ফুটেজ দেখে বুঝতে পারি, নিখোঁজ হওয়ার দিন তিনি চতুর্থ তলায় লিফটে ঢুকেছিলেন। এরপর তাকে আর বের হতে দেখা যায়নি।”

মামুন বলেন, “এটি সত্যিই লিফট দুর্ঘটনা নাকি অন্য কোনো কারণে তার মৃত্যু হয়েছে সেটি সঠিকভাবে তদন্ত করে বের করা উচিত।”

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. সুবক্তাগিন মাহমুদ শহেল বলেন, নিখোঁজের অভিযোগ পুলিশের কাছে যাওয়ার পর শনিবার সকালে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে।

তিনি বলেন, “বুধবারের ফুটেজে দেখা যায়, দুপুর প্রায় ১টার দিকে তিনি চতুর্থ তলায় লিফট থেকে বের হয়ে আসেন। কিছুক্ষণ পর লিফটের দরজা বন্ধ হয়ে গেলে তিনি আবার ফিরে এসে দুই হাত দিয়ে দরজা জোর করে খুলে ফেলেন এবং পেছন দিকে ঘুরে লিফটে ঢোকেন। এরপর তাকে আর কোনো তলায় নামতে দেখা যায়নি।”

তিনি আরও বলেন, “পরে ফুটেজ পর্যালোচনার পর হাসপাতালের কর্মীরা লিফটের নিচে গিয়ে খোঁজ করলে সেখানে কোহিনূরের আংশিক পচে যাওয়া মরদেহ পাওয়া যায়।”

আরএমও বলেন, ভোরের দিকে লিফটটি নিচে নামার সময় কর্মীরা দুর্গন্ধ টের পান। প্রথমে ধারণা করা হয়েছিল কোনো প্রাণী মারা গেছে। পরে সেখানে নিখোঁজ রোগীর স্বজনের মরদেহ পাওয়া যায়।

এদিকে হাসপাতালটিতে চিকিৎসা নিতে আসা কয়েকজন রোগী ও স্বজন অভিযোগ করেছেন, লিফটের সেন্সর ঠিকমতো কাজ না করার বিষয়টি নিয়ে আগে থেকেই নানা অভিযোগ ছিল। তাদের দাবি, অনেক সময় দরজা ঠিকমতো খোলে না বা দরজা খুললেও লিফট সেই তলায় থাকে না।

নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হলে এ ধরনের ঘটনা এড়ানো সম্ভব ছিল।

তবে এ বিষয়ে হাসপাতালের লিফটের ত্রুটির অভিযোগ বিষয়ে জানতে চাইলে আরএমও শহেল বিডিনিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "লিফট নিয়মিত দেখভাল করা হয়। ত্রুটির কারণে এমন দুর্ঘটনা বলে মনে হচ্ছে না, ওই নারীর অসচেতনতার বিষয়টি দেখা গেছে সিসিটিভিতে।"

তবে যন্ত্র প্রকৌশলীরা তা মানছেন না। 

মারাত্মক ত্রুটি’ বলছেন যন্ত্র প্রকৌশলীরা

এদিকে এই দুর্ঘটনার জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নারীর অসেচতনতার কথা বললেও ভিন্ন কথা বলছেন যন্ত্র প্রকৌশলীরা। 

নিহত কোহিনূর আক্তারের ঘটনায় পাওয়া সিসিটিভি ফুটেজ বিডিনিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম কয়েকজন যন্ত্র প্রকৌশলীর কাছে পাঠিয়ে মতামত নেয়।

তা পর্যালোচনা করে প্রকৌশলীরা বলছেন, লিফটের দরজা যেভাবে খোলা হয়েছে, তা স্বাভাবিক কোনো নিরাপদ লিফটে হওয়ার কথা নয়।

যন্ত্র প্রকৌশলীদের মতে, আধুনিক লিফটে সাধারণত ইন্টারলক সিস্টেম থাকে। অর্থাৎ লিফটের কেবিন নির্দিষ্ট তলায় উপস্থিত না থাকলে দরজা খোলার কথা নয়। একইভাবে দরজা খোলা থাকলে লিফট চলতে পারে না। এই নিরাপত্তা ব্যবস্থাই লিফট দুর্ঘটনা প্রতিরোধের মূল ভিত্তি।

যন্ত্র প্রকৌশলী হাসিনুর রেজা চঞ্চল বলেন, “যদি লিফট পঞ্চম তলায় থাকে, তাহলে চতুর্থ তলায় দাঁড়িয়ে এত সহজে দরজা খোলা সম্ভব হওয়ার কথা নয়। দরজা খুলতে গেলে সাধারণত শক্ত ইন্টারলক বাধা দেয়। যদি জোর প্রয়োগে দরজা খুলে যায় এবং নিচে শ্যাফট খোলা থাকে, তাহলে সেটি লিফটের মারাত্মক ত্রুটির ইঙ্গিত।”

তিনি আরও বলেন, “এ ধরনের লিফটে সেন্সর, ডোর লক ও একাধিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকার কথা। কিন্তু দরজা খুলে সরাসরি শ্যাফটে পড়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটলে সেটি বোঝায় যে নিরাপত্তা ব্যবস্থাগুলো হয় কাজ করছিল না, নয়তো লিফটটি দীর্ঘদিন ধরে সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়নি।”

প্রকৌশলী সুষ্ময় বড়ুয়া বলেন, কোনো ব্যক্তি জোর প্রয়োগ করলে কখনও কখনও দরজা আংশিক খুলে যেতে পারে। কিন্তু তখনও লিফটের কেবিন সেই তলায় না থাকলে সেটি অত্যন্ত বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করে।

তাদের মতে, এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়াই বোঝায় লিফটটি নিরাপদ ব্যবহারের উপযোগিতা হারিয়ে ফেলতে পারে।

তারা বলেন, হাসপাতাল, শপিং মল বা জনসমাগমস্থলের ভবনে ব্যবহৃত লিফটের নিয়মিত প্রযুক্তিগত পরীক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণ বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। অন্যথায় এ ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকেই যায়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি সিসিটিভিতে দেখা ঘটনাটি সত্যিই প্রযুক্তিগত ত্রুটির ফল হয়, তাহলে এটি শুধু একটি দুর্ঘটনা নয় বরং জননিরাপত্তা ব্যবস্থার বড় ধরনের ব্যর্থতার ইঙ্গিতও হতে পারে।

এ কারণে লিফটের ত্রুটি, রক্ষণাবেক্ষণের মান এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব নিয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত জরুরি বলে মনে করছেন তারা।

নিয়মিত তদারকি করা হয়, দাবি গণপূর্ত বিভাগের

এদিকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) সুবক্তাগিন মাহমুদ শহেল জানান, হাসপাতালের লিফটগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকির দায়িত্ব গণপূর্ত বিভাগের।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কক্সবাজার গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী অভিজিৎ চৌধুরী বলেন, “লিফটটি আমরা মাসে একবার পরিদর্শন করি।”

লিফটের সম্ভাব্য ত্রুটির বিষয়ে জানতে চাইলে শনিবার তিনি বলেন, “অনেক সময় দরজা খোলা যায়। তবে বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখবো।”

তবে রোববার দুপুরে তিনি বলেন, তারা লিফটের ত্রুটি খতিয়ে দেখতে হাসপাতালে গিয়েছিলেন। তবে নিহত রোগীর স্বজনদের বাধার মুখে তা সম্ভব হয়নি। তাই তারা লিফটি ব্যবহার বন্ধ রাখার নির্দেশনা দিয়েছেন। 

কী বলছে পুলিশ

কক্সবাজার সদর মডেল থানার ওসি মো. ছমি উদ্দিন বলেন, “নারীটি নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে তিন দিন আগে থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছিল। অভিযোগ পাওয়ার পর আমরা তার সন্ধানে অনুসন্ধান শুরু করি এবং তথ্য সংগ্রহ করছিলাম।”

তিনি বলেন, “শনিবার খবর পাই হাসপাতালের লিফটের নিচে একটি মরদেহ পড়ে আছে। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সহায়তায় মরদেহটি উদ্ধার করে।”

ওসি জানান, সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে ঘটনার দিন কোহিনূর লিফটে করে চতুর্থ তলায় যান এবং পরে আবার ফিরে এসে লিফটের দরজা জোর করে খোলার চেষ্টা করেন। এরপর লিফটে ওঠার সময় তার পা পিছলে গিয়ে শ্যাফটে পড়ে যেতে পারেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

“তবে এটি প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে,” বলেন তিনি।

এ বিষয়ে জানতে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক মংটিংঞো এর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি।

আর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিশুটি সুস্থ আছে বলে জানিয়েছেন শান্তনু ঘোষ।