বয়স বাড়িয়ে চাকরি, সন্তান ছাড়া ভাতা নেওয়ার অভিযোগ শিক্ষকের বিরুদ্ধে

২০১৩ সালে প্রায় ৩০ হাজার বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের সুযোগে তার চাকরিও সরকারি হয়ে যায়।

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 11 Sept 2022, 02:25 PM
Updated : 11 Sept 2022, 02:25 PM

বয়স বাড়িয়ে ১৫ বছর বয়সে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকরি নেওয়া এবং অবিবাহিত হয়েও সন্তানের নামে শিক্ষাভাতা তোলার অভিযোগ উঠেছে কুড়িগ্রামের এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে।

রুনা খাতুন নামের এই নারী কুড়িগ্রাম সদরের যাত্রাপুর ইউনিয়নের আরাজি পিপুলবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা।

বিষয়টি তদন্ত করে সদর উপজেলা শিক্ষা অফিসার লুৎফর রহমান ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বরারব প্রতিবেদন পাঠিয়েছেন।

লুৎফর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, “তদন্ত শেষ হয়েছে। অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট প্রতিবেদন পাঠিয়ে দিয়েছি। যে সিদ্ধান্ত আসবে সে মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

প্রত্যন্ত চরের এই স্কুলটিতে যেতে হলে যাত্রাপুর ঘাট থেকে প্রায় ২০-২৫ মিনিট নৌকায় পাড়ি দিতে হয়। বিদ্যালয়টিতে শিশুশ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থী রয়েছে ২২৪ জন। বিদ্যালয়ে শিক্ষকের পাঁচটি পদের মধ্যে আছেন চার জন।

২০১০ সালে রেজিস্টার্ড বেসরকারি স্কুল থাকার সময় স্কুলটিতে শিক্ষকতা শুরু করেন রুনা খাতুন। ২০১৩ সালে সরকার দেশের প্রায় ৩০ হাজার বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করে। ওই সময় তার চাকরিও সরকারি হয়ে যায়।

জানা গেছে, রুনা খাতুন সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার চাকলি গ্রামের বখত জামান ও রেনু বেগম দম্পতির মেয়ে। তিনি ২০১০ সালে সিরাজগঞ্জের আরিয়া মহন স্কুল থেকে মানবিক বিভাগ থেকে জিপিএ-৩.৬৯ পেয়ে এসএসসি পাশ করেন।

এসএসসি সনদ অনুযায়ী তার জন্ম তারিখ ১৩ অগাস্ট ১৯৯৫। কিন্তু তিনি চাকরিতে প্রবেশের সময় ১৩ অগাস্ট ১৯৯০ জন্ম সাল ব্যবহার করে নিয়োগ নেন।

এছাড়া তিনি অবিবাহিত হয়েও নিজেকে বিবাহিত পরিচয়ে ২০১৭ সাল থেকে সন্তান না থেকেও সন্তানের নাম ব্যবহার করে ৫শ’ টাকা হারে শিক্ষা ভাতা নিচ্ছেন।

কিন্তু চলতি বছর শিক্ষকদের ইলেকট্রনিক ফান্ডস ট্রান্সফার (ইএফটি) মাধ্যমে বেতন ভাতা প্রদান করার জন্য তথ্য আপলোড করতে গিয়ে বিষয়টি ধরা পড়ে।

গত ৪ জুলাই কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা শিক্ষা অফিসার লুৎফর রহমান ভুয়া জন্মসাল এবং মিথ্যা তথ্য দিয়ে শিক্ষাভাতা গ্রহণের বিষয়ে কারণ দর্শানোর চিঠি প্রদান করেন।

এই পত্রে জানানো হয়, চাকরিতে প্রবেশের সময় শিক্ষাগত যোগ্যতা ‘খ’ ছকে লিপিবদ্ধ এবং অবিবাহিত হয়েও স্বামী-সন্তান না থেকেও ইএফটিতে সেই তথ্য গোপন করেছেন। এছাড়া প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে শিক্ষাভাতা উত্তোলন করার অভিযোগে সশরীরে উপস্থিত হয়ে কারণ দর্শানোর জবাব দিতে নির্দেশ প্রদান করা হয়।

স্বুলটির এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক জহুরুল ইসলাম বলেন, “নদী ভাঙনের কারণে এখানে কোনো স্কুল ছিল না। কোনো শিক্ষিত মানুষও ছিল না সে সময়। পরে চার জন শিক্ষককে নিয়ে আমরা এখানে স্থানীয় একটা স্কুল করি।

“রুনা আপা এখানকার এক বাসিন্দার আত্মীয়তার সূত্রে চাকরি শুরু করেন। কিন্তু তার বয়স হয়েছিল কিনা সেটা তো আমরা জানব না। এটা সরকারের বিষয় সরকার দেখবে।”

আরেক অভিভাবক বালা বেগম বলেন, “প্রায় এক যুগ ধরে এই চরের স্কুলে রুনা আপা চাকরি করছেন। আমরা জানি তিনি বিয়ে করেননি এবং তার কোনো বাচ্চা নেই। কিন্তু অফিসে তথ্য কী দিয়েছে সেটা তো বাপু হামরা কমু ক্যামনে?”

এ বিষয়ে শিক্ষিকা রুনা খাতুন ভুয়া জন্মসাল এবং অবিবাহিত থাকার কথা স্বীকার করে বলেন, “বয়স ঠিকঠাক করে শো কজের জবাব দিয়েছি।”

সন্তান না থেকেও ২০১৭ সাল থেকে সন্তানের নামে ৫শ’ টাকা হারে শিক্ষা ভাতা তোলার কথাও স্বীকার করেন এই শিক্ষক।

প্রধান শিক্ষক আতাউর রহমান বলেন, “স্কুলটি যখন বেসরকারি ছিল তখনই এক সাথে আমরা চার জন শিক্ষক ২০১০ সালে ২৫ অক্টোবর এখানে নিয়োগ নিই। পরবর্তীতে ২০১৩ সালে বিদ্যালয়টি জাতীয়করণ হয়।

“কিন্তু সহকারী শিক্ষিকা রুনার জন্মসাল ভুয়া ছিল – তা আমরা কাগজপত্র দেখে টের পাইনি। ইএফটি পূরণ করার সময় বিষয়টি সবার নজরে আসে। বর্তমানে এই বিষয়ে উপজেলা শিক্ষা অফিসার তদন্ত করছেন।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক