বাড়ি বানাতে ব্যাংকের টাকা তোলাই কাল হল মা-ছেলের

২৬ জানুয়ারি পাবনার চাটমোহর উপজেলার দীঘুলিয়া গ্রাম থেকে মালয়েশিয়া প্রবাসীর স্ত্রী লাবনী এবং তার ছেলে রিয়াদ হোসেনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

পাবনা প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 1 Feb 2024, 04:28 PM
Updated : 1 Feb 2024, 04:28 PM

টাকা ও স্বর্ণালঙ্কারের লোভে পাবনার চাটমোহর উপজেলায় প্রবাসীর স্ত্রী ও ছেলেকে তিন যুবক হত্যা করেছে বলে দাবি করেছে পুলিশ।

ঘটনার এক সপ্তাহ বাদে বৃহস্পতিবার নিজের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে মা ও ছেলে হত্যায় জড়িত তিনজনকে গ্রেপ্তারের তথ্য জানান পাবনার পুলিশ সুপার মো. আকবর আলী মুনসী।

গ্রেপ্তার তিন যুবক হলেন- উপজেলার ধুপুলিয়া এলাকার মো. সাদ্দাম হোসেন (২৬), তার ভাই মো. হোসেন আলী (৩৭) এবং রাজবাড়ীর খানখানাপুর দত্তপাড়া এলাকার মো. হুমায়ন মিজি ওরফে হৃদয় (২৮)।

এর মধ্যে সাদ্দামের বিরুদ্ধে ২০২২ সালের অক্টোবরে চাটমোহরের ফৈলযানা এলাকায় চালক ইসমাইল হোসেনকে শ্বাসরোধে হত্যা করে অটোরিকশা ছিনতাই মামলার প্রধান আসামি। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা মামলা রয়েছে।

হোসেন আলী ও হৃদয়ের বিরুদ্ধেও চুরি, দস্যুতাসহ একাধিক মামলা রয়েছে।

২৬ জানুয়ারি উপজেলার দীঘুলিয়া গ্রাম থেকে মালয়েশিয়া প্রবাসী আব্দুর রশিদের স্ত্রী লাবনী খাতুন এবং তার ১০ বছরের ছেলে রিয়াদ হোসেনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। লাবনীর রান্নাঘর আর ছেলে রিয়াদের মরদেহ বাড়ির পুকুর পাড়ে গাছে সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। এ ঘটনায় লাবনীর ভাই শাহাদাত হোসেন বাদী হয়ে অজ্ঞাত আসামি রেখে হত্যা মামলা করেন।

পরে পুলিশ সুপারের নির্দেশে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাসুদ আলমের নেতৃত্বে পুলিশ সদস্যরা এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে মাঠে নামেন। তিন আসামিকে পাবনা, ফরিদপুর ও গোপালগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার আকবর আলী মুনসী বলেন, লাবনীর স্বামী প্রায় সাত বছর ধরেই মালয়েশিয়ায় থাকেন। সম্প্রতি তিনি বাড়ি বানানোর জন্য কিছু টাকা পাঠিয়েছেন। সেই টাকা লাবনী ব্যাংক থেকে উত্তোলন করেন এবং প্রায় ২৫ হাজার ইট ক্রয় করেন।

Also Read: রান্নাঘরে মায়ের আর গাছে ঝুলছিল ছেলের লাশ

Also Read: পাবনায় মা-ছেলে হত্যা: মামলা, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ২ যুবক আটক

“হোসেন আলী ও লাবনী খাতুন একই গ্রামে বসবাস করেন। লাবনীর ব্যাংক থেকে টাকা তোলা ও ইট ক্রয়ের বিষয়টি তিনি জানতে পারেন। ফলে ধারণা করেন, লাবনীর কাছে টাকা আছে।”

এই ধারণা থেকেই হোসেন আলী বিষয়টি প্রথমে তার আপন ছোট ভাই সাদ্দামকে জানান বলে উল্লেখ করেন পুলিশ সুপার। বলেন, “সাদ্দাম দীর্ঘদিন ধরেই শ্বশুরবাড়ি গোপালগঞ্জে থেকে চুরি ও ছিনতাইয়ের কাজ করে আসছিলেন। পরে তারা এর সঙ্গে হৃদয়কে যুক্ত করেন। ২৫ জানুয়ারি সকালে সবাই ফরিদপুর থেকে পাবনার উদ্দেশে রওনা হন। হোসেন আলী গ্রামে ফিরলেও সাদ্দাম ও হৃদয় টেবুনিয়াতে অবস্থান করেন।”

“পরিকল্পনা অনুযায়ী, লাবনীর অবস্থান নিশ্চিত হয়ে ওইদিন রাতে হোসেন আলী অন্য দুজনকে দীঘুলিয়ায় নিয়ে আসেন। পরে তিনজন একত্রিত হয়ে লাবনীর বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেন।”

পুলিশ সুপার বলেন, “রাত ১টার দিকে সাদ্দাম ও হৃদয় গাছ বেয়ে লাবনীর বাড়ির ভেতর প্রবেশ করেন। তারা বাড়ির ফটক খোলা রাখেন এবং ঘরের পেছনে টিন কেটে ঢোকার চেষ্টা করেন। কিন্তু তখন শব্দে লাবনীর ঘুম ভেঙে যায়। তিনি বিছানা ছেড়ে ঘরের দরজা খুলতেই পেছন থেকে তিনজন তাকে জড়িয়ে ধরেন এবং কোনোকিছু বুঝে উঠার আগেই গলায় ওড়না পেঁচিয়ে তাকে হত্যা করেন।

“শিশু রিয়াদ ঘুম থেকে উঠে ভয়ে চিৎকার শুরু করলে সাদ্দাম তাকে পুকুরপাড়ে নিয়ে মাফলার পেঁচিয়ে হত্যা করে। পরে ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য লাশটি গাছে ঝুলিয়ে রাখেন।”

পরবর্তীতে সাদ্দাম ও হৃদয় বাড়ি এসে লাবনীর কোমড়ে থাকা চাবি ও কানের স্বর্ণের দুল নিয়ে ঘরে প্রবেশ করে বলে জানান পুলিশ সুপার। তিনি বলেন, “তখন তারা স্টিলের ট্রাঙ্ক থেকে সোনার চেইন, হাতের বালা, কানের দুল, দুই জোড়া রূপার নুপুর, রূপার পায়েল, কিছু টাকা নিয়ে বাড়ির পেছন দিক দিয়ে হোসেন আলীর বাড়িতে চলে আসেন।”

“সোনা ও টাকা ভাগাভাগি করে রাত ৩টার দিকে সাদ্দাম ও হৃদয় গোপালগঞ্জের উদ্দেশে রওনা দেন। এভাবেই কিছু স্বর্ণ ও টাকার লোভে মা ও শিশুকে নৃশংসভাবে হত্যা করে তিনজন।”

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, আসামিদের কাছ থেকে একটি স্বর্ণের চেইন (১২ আনা), এক জোড়া হাতের বালা, এক জোড়া স্বর্ণের কানের দুল (৬ আনা), দুই জোড়া রূপার নুপুর (৮ ভরি), একটি রূপার পায়েল, নগদ ৩০ হাজার টাকা, তিনটি মোবাইল, টিন কাটার কাঁচি, মাফলার ও ওড়না উদ্ধার করা হয়।