২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬ আশ্বিন ১৪৩৩

তাহের হত্যা: দুই আসামির ফাঁসি কার্যকরে প্রস্তুত রাজশাহী কারাগার

সন্ধ্যা থেকে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে, কারা ফটকে মোতায়েন করা হয়েছে অতিরিক্ত পুলিশ ও কারারক্ষী।

রাজশাহী প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 27 Jul 2023, 06:44 PM

Updated : 27 Jul 2023, 09:25 PM

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এস তাহের আহমেদ হত্যা মামলার দুই আসামির ফাঁসি কার্যকরের সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। 

দুই আসামি মিয়া মোহাম্মদ মহিউদ্দিন এবং জাহাঙ্গীর আলমের পরিবারের সদস্যরা দুদিন আগেই ‘শেষ দেখা’ করে গিয়েছিলেন। বৃহস্পতিবার রাতেই তাদের দণ্ড কার্যকর করা হবে বলে কারা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। 

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে, কারা ফটকে মোতায়েন করা হয়েছে অতিরিক্ত পুলিশ ও কারারক্ষী। 

জাহাঙ্গীরের বড় ভাই সোহরাব হোসেন রাতে কারাগারে ঢুকেছেন। তাকে লাশ গ্রহণ করার জন্য ডাকা হয়েছে।

কারাগারের চিকিৎসক ডা. মিজান উদ্দিন ও ডা. জুবায়েরসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঢুকেছেন পেছনের ফটক দিয়ে। 

রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, ফাঁসির মঞ্চ তৈরি করাসহ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে সব ধরনের প্রস্তুতি তারা ইতোমধ্যে নিয়েছেন। রাত ১০টা ১ মিনিটে একই মঞ্চে একই সময়ে দুই আসামির ফাঁসি কার্যকর করার কথা রয়েছে। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেলার মো. নিজাম উদ্দিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলবেন ডিআইজি প্রিজনস।” 

Image

মিয়া মোহাম্মদ মহিউদ্দিন  (বামে) ও নিহত অধ্যাপক তাহেরের বাসার কেয়ারটেকার জাহাঙ্গীর আলম।

কারাগারের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কেন্দ্রীয় কারাগারের পূর্ব দিকের দেয়ালের পাশে ফাঁসির মঞ্চ প্রস্তুতের কাজ শুরু হয় এক সপ্তাহ আগেই। নিয়ম অনুযায়ী জল্লাদ টিম গঠন করা হয়েছে। প্রশিক্ষণ শেষে আট জল্লাদের ওই টিম একাধিকবার মহড়াও দিয়েছে। 

এই জল্লাদরাই নির্ধারিত সময়ে আসামিদের ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে যাবেন, পরিয়ে দেবেন কালো টুপি ও ফাঁসির দড়ি। সব আনুষ্ঠানিকতা সেরে দলের প্রধান জল্লাদ একজন সহযোগীকে নিয়ে ফাঁসি কার্যকর করবেন। 

নিয়ম অনুযায়ী, ফাঁসি কার্যকরের পর ৩০ মিনিট লাশ দড়িতে ঝুলিয়ে রাখতে হয়। পরে ময়নাতদন্ত সেরে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয় মরদেহ। 

রাত ১০টায় ফাঁসি কার্যকর হলে ৯টার দিকে দুই আসামিকে বিষয়টি জানানো হবে। এরপর তাদের গোসল করিয়ে শেষ ইচ্ছা জানতে চাওয়া হবে। কারা মসজিদের ইমাম তাদের তওবা পড়াবেন।

ডিআইজি প্রিজনস, সিনিয়র জেল সুপার ও জেলার ছাড়াও জেলা প্রশাসনের প্রতিনিধি, সিভিল সার্জন, মেট্রোপলিটন পুলিশের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকবেন ফাঁসি কার্যকরের সময়। কারাগারে প্রস্তুত রাখা হবে লাশ বহনের জন্য অ্যাম্বুলেন্স। 

দুই আসামির পরিবারের সদস্যরা গত মঙ্গলবার তাদের সঙ্গে শেষ দেখা করেছেন। সেদিন জাহাঙ্গীরের পরিবারের ৩৫ সদস্য এবং মহিউদ্দিনের পরিবারের তিন সদস্য রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে গিয়ে তাদের সঙ্গে দেখা করেন। 

২০০৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পশ্চিমপাড়া আবাসিক কোয়ার্টার থেকে অধ্যাপক তাহের নিখোঁজ হন। ওই বাসায় তিনি একাই থাকতেন। কেয়ারটেকার জাহাঙ্গীর তার দেখাশোনা করতেন। 

Image

অধ্যাপক এস তাহের আহমেদ।

পরদিন বাসার পেছনের ম্যানহোল থেকে অধ্যাপক তাহেরের গলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ৩ ফেব্রুয়ারি তার ছেলে সানজিদ আলভি আহমেদ রাজশাহীর মতিহার থানায় অজ্ঞাতনামা কয়েকজনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন। 

অধ্যাপক তাহেরের করা একটি জিডির সূত্র ধরে বিভাগের শিক্ষক মহিউদ্দিন ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ইসলামী ছাত্রশিবিরের তৎকালীন সভাপতি মাহবুবুল আলম সালেহী, কেয়ারটেকার জাহাঙ্গীরসহ আটজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এরপর ৫ ফেব্রুয়ারি গ্রেপ্তারদের মধ্যে তিনজন আদালতে জবানবন্দি দেন। 

জবানবন্দিতে তারা বলেন, অধ্যাপক এস তাহের বিভাগের একাডেমিক কমিটির প্রধান ছিলেন। একই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মহিউদ্দিন অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য কমিটির সুপারিশ চেয়ে আসছিলেন। কিন্তু গবেষণা জালিয়াতির কারণে অধ্যাপক তাহের তা দিতে অস্বীকার করেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে মহিউদ্দিন হত্যার পরিকল্পনা করেন।

বালিশ চাপা দিয়ে খুনের পর বাড়ির ভেতরে থাকা চটের বস্তায় ভরে অধ্যাপক তাহেরের লাশ বাসার পেছনে নেওয়া হয়। লাশ গুমের জন্য জাহাঙ্গীররের ভাই নাজমুল আলম ও নাজমুলের স্ত্রীর ভাই আবদুস সালামকে ডেকে আনা হয়। তাদের সহায়তায় বাসার পেছনের ম্যানহোলের ঢাকনা খুলে তাহেরের লাশ ফেলে দেওয়া হয়।

Image

অধ্যাপক এস তাহের আহমেদ।

২০০৭ সালের ১৭ মার্চ শিবির নেতা মাহবুব আলম সালেহীসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। বিচার শেষে ২০০৮ সালের ২২ মে রাজশাহীর দ্রুত বিচার আদালত চারজনকে ফাঁসি ও দুজনকে খালাস দেয়। 

দণ্ডিত অন্যরা হলেন জাহাঙ্গীরের ভাই নাজমুল ও তার স্ত্রীর ভাই সালাম। তবে ছাত্রশিবিরের নেতা সালেহী ও আজিমুদ্দিন মুন্সি বিচারে খালাস পান। 

পরে দণ্ডিতরা হাই কোর্টে আপিল করেন। হাই কোর্ট মহিউদ্দিন ও জাহাঙ্গীরের রায় বহাল রাখলেও নাজমুল ও সালামের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। 

পরে তাদের দণ্ড বৃদ্ধি চেয়ে আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। শুনানি শেষে ২০২২ সালের ৫ এপ্রিল আপিল বিভাগ হাই কোর্ট বিভাগের রায়ই বহাল রাখে। এরপর আসামিদের রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদনও খারিজ করে সুপ্রিম কোর্ট। 

শেষ ধাপে কারা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করেছিলেন আসামিরা। ছয় মাস আগে রাষ্ট্রপতি সে আবেদনও নাকচ করে দিলে দণ্ড কার্যকরের সব বাধা কাটে। 

আরও পড়ুন:

পুরানো খবর:

অধ্যাপক তাহের হত্যা: শেষ দেখা করতে কারাগারে জাহাঙ্গীরের স্বজনরা

পুরানো খবর:

অধ্যাপক তাহের হত্যা: জাহাঙ্গীরের ফাঁসি স্থগিতের আবেদনও খারিজ

পুরানো খবর:

অধ্যাপক তাহের হত্যা: ফাঁসির আসামি জাহাঙ্গীরের আবেদন খারিজ

পুরানো খবর:

অধ্যাপক তাহের হত্যা: ফাঁসি আটকাতে হাই কোর্টে গেলেও সাড়া মেলেনি

পুরানো খবর:

অধ্যাপক তাহের হত্যা: মহিউদ্দিন-জাহাঙ্গীরের ফাঁসি যেকোনো দিন

পুরানো খবর:

অধ্যাপক তাহের হত্যা: ২ আসামির মৃত্যুদণ্ড আপিলেও বহাল

পুরানো খবর:

ড. তাহের হত্যামামলায় দুজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল