Published : 27 May 2026, 06:55 PM
সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে কোরবানির ঈদ উদযাপন করছেন দেশের বিভিন্ন জেলার কয়েকটি গ্রামের মুসলমানরা।
দেশের অন্যদের থেকে একদিন আগে ঈদ পালন করা নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা থাকলেও এসব গ্রামের মানুষ নামাজ, কোরবানি ও ধর্মীয় নানা আনুষ্ঠানিকতায় উৎসবমুখর পরিবেশেই দিনটি উদযাপন করেছেন।
আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য:
গাজীপুর:
সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে ঈদ উদযাপন করছেন গাজীপুর সদর উপজেলার পূর্ব ডগরি এলাকার মানুষ।
বুধবার সকাল ৭টায় স্থানীয় পূর্ব ডগরী এলাকার দারুল ইরফান জামে মসজিদে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে। ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে ভোর থেকেই সেখানে জড়ো হন দূর দূরান্ত থেকে বিভিন্ন এলাকার মুসলমানরা।
নতুন পোশাক পরে কেউ পরিবার নিয়ে, কেউ আবার বন্ধু কিংবা প্রতিবেশীদের সঙ্গে এসে সামিল হন জামাতে।

দারুল ইরফান জামে মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা ও খতিব, ডা. মাওলানা এ কে এম মাহবুবুর রহমান বলেন, “ঈদের নামাজ শেষে দেশ, জাতি এবং বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর শান্তি, সমৃদ্ধি ও কল্যাণ কামনায় বিশেষ মোনাজাত করা হয়।”
নামাজ শেষে একে অপরের সঙ্গে কোলাকুলি করে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। পরে পায়েশ ও বিভিন্ন মিষ্টান্ন খাইয়ে আনন্দ ভাগাভাগি করতে দেখা যায় তাদের।
ঈদের এই জামাতকে কেন্দ্র করে যে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে দায়িত্ব পালন করেন জয়দেবপুর থানা পুলিশের সদস্যরা।
জয়দেবপুর থানার ওসি নয়ন কুমার কর বলেন, পুলিশ সদস্যরা বুধবার সকালে শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব পালন করছে। সুশৃঙ্খলভাবে সেখানে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে।
নোয়াখালী:

সৌদি আরবের মিল রেখে নোয়াখালীর পাঁচ গ্রামে ঈদুল আজহা উদযাপন করা হয়েছে।
গ্রামগুলো হলো, নোয়াখালী সদর উপজেলার নোয়াখালী পৌরসভার লক্ষ্মীনারায়ণপুর ও হরিণারায়ণপুর, কবিরহাট উপজেলার ঘোষবাগ ইউনিয়নের রামভল্লবপুর এবং বেগমগঞ্জ উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়নের বসন্তবাগ ও ফাজিলপুর।
বুধবার সকাল ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে এসব গ্রামের বিভিন্ন মসজিদে ঈদুল আজহার জামাত অনুষ্ঠিত হয়।
এসব গ্রামের বড় পীর হযরত আবু মুহাম্মদ মহিউদ্দীন সৈয়দ আবদুল কাদির জিলানী (রহ.)-এর মতাদর্শ অনুসরণকারী কাদেরিয়া তরিকার অনুসারীরা প্রায় শতবর্ষ ধরে সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে রোজা ও দুই ঈদ উদযাপন করে আসছেন।
যেসব মসজিদে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে বসন্তবাগ সিনিয়র মাদ্রাসা জামে মসজিদ, বসন্তবাগ পোদ্দার বাড়ি জামে মসজিদ, নগর বাড়ির দরজা জামে মসজিদ, ভূঁইয়া বাড়ির দরজা জামে মসজিদ, উত্তর বসন্তবাগ মুন্সি বাড়ি জামে মসজিদ, ফাজিলপুর দায়রা বাড়ি জামে মসজিদ, জিরতলী ইউনিয়নের ফাজিলপুর জামে মসজিদ, রামভল্লবপুর দায়রা শরিফ, হরিণারায়ণপুর রশিদিয়া রহিমিয়া দরবার শরিফ এবং খান্দানে কাদেরী তরিকায়ে আবুল উলাইয়ী গোলামে জাহাঙ্গীরি দায়রা শরিফ।
উত্তর বসন্তবাগ মুন্সি বাড়ি জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা মো. বদরুজ্জামান বলেন, “চাঁদ দেখার ওপর ভিত্তি করেই রোজা ও ঈদ উদযাপন করা হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে চাঁদ দেখা যাওয়ার ভিত্তিতে আমরা সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে ঈদ পালন করছি।
“দীর্ঘ শত বছর ধরে আমরা এ প্রথা অনুসরণ করে আসছি। প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দেশের সঙ্গে মিল রেখে ঈদ উদযাপন করতে পেরে আমরা আনন্দিত।”

ভোলা :
ভোলার বেশ কয়েকটি গ্রামের বাসিন্দারা সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে ঈদুল আযহা উদযাপন করছেন।
বুধবার সকালে ভোলা সদরের পূর্ব ইলিশা উত্তর ইলিশা গ্রামের সুরেশ্বরী দরবারের মুরিদ মো. অলিউর রহমানের বাড়িতে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এতে সুরেশ্বরী দরবারের অনুসারী দুই শতাধিক নারী-পুরুষ একসঙ্গে ঈদের নামাজ আদায় করেছেন।
সুরেশ্বরী দরবারের ভোলার দায়িত্বশীল অলিউর রহমান বলেন, প্রতি বছর তারা সৌদি আরবের সাথে মিল রেখে রোজা রাখেন, ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা পালন করেন।
এ ছাড়াও জেলার বোরহানউদ্দিন উপজেলারর মুলাইপত্তন গ্রামের চৌকিদার বাড়ি, পঞ্চায়েত বাড়িসহ বিভিন্ন এলাকায় ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে।

নীলফামারী:
নীলফামারীর জলঢাকায় সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে এক গ্রামে দেড়শতাধিক পরিবার কোরবানির ঈদ উদযাপন করেছেন।
এ উপলক্ষে বুধবার সকালে উপজেলার গোলমুন্ডা ইউনিয়নের পশ্চিম গোলমুন্ডা ও কাকড়া চৌপতি গ্রামের মুসলমানরা সকাল ৮ টায় ঈদের নামাজ পড়েন।
পরে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় পশু কোরবানি করেন তারা।
পশ্চিম গোলমুন্ডা গ্রামে ঈদ জামায়াতের ইমাম মাওলানা মশিয়ার রহমান বলেন, “যেহেতু কোরআন নাজিল হয়েছে মক্কা মদিনার তারিখে এবং সিয়াম ফরজ হয়েছে তাদের তারিখে, তাই আমরা তাদের তারিখটা সহি মনে করি। আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে এ তারিখটা মেনে চলি।
“এছাড়া পৃথিবীর এক একদিন একেক চাঁদের জন্ম এটা নয় পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে চাঁদের খবর শুনলে সেদিন থেকে আরবি তারিখ গণনা শুরু হবে।”

জামালপুর:
জামালপুরের সরিষাবাড়ী, ইসলামপুর ও মাদারগঞ্জ উপজেলার ২০টি গ্রামে কোরবানির ঈদ সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে পালিত হচ্ছে।
বৈরি আবহওয়া ও বৃষ্টি থাকায় বুধবার সকাল ৯টায় জেলার ইসলামপুর উপজেলার নোয়ারপাড়া ইউনিয়নে রামভদ্রা গ্রামে আলতাফুর আকন্দের বাড়িতে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। এতে ইমামতি করান আলতাফুর আকন্দ।
তিনি বলেন, “সারা বিশ্বের মুসলমানরা একই দিনে আরাফাতের ময়দানে সমবেত হয়ে হজ পালন করেন। হজের পরের দিনই হলো ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ।
“যদি হজের দিনটি পুরো বিশ্বের জন্য একটিই হয়, তবে তার পরের দিনের ঈদ কেন আলাদা দিনে হবে? হজের সাথে মিল রেখে পরদিনই ঈদ করা ইসলামের ঐক্যের প্রতীক।”
এছাড়াও সরিষাবাড়ীর বলারদিয়ার, মূলবাড়ী, সাতপোয়া, সাঞ্চারপাড়, পঞ্চপীর, পাখাডুবি, বনগ্রাম, বালিয়া, বাউসী, হোসনাবাদ, পাটাবুগা, পুঠিয়ারপাড় ও বগারপাড় এবং ইসলামপুরের পশ্চিম মণ্ডলপাড়া ও মাদারগঞ্জের কাজিয়ারবাড়িসহ বিভিন্ন গ্রামে ঈদের নামাজ অনুষ্ঠিত হয়।
নামাজ শেষে দেশ ও জাতির শান্তি, সমৃদ্ধি এবং মুসলিম উম্মাহর কল্যাণ কামনায় বিশেষ মোনাজাত করা হয়। পরে কোলাকুলি করে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন এবং কোরবানির প্রস্তুতিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন এসব গ্রামের মানুষ।
গরিষাবাড়ির বলারদিয়া এলাকার রহমতুল্লাহ বলেন, “আমরা কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে ঈদ উদযাপন করছি। শুরুতে বিভিন্ন বাধা বিপত্তি আসলেও দিন দিন আমাদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সকলের উচিত একই দিনে ঈদ উদযাপন করা।”

রাজশাহী :
সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে রাজশাহীর পুঠিয়ায় ঈদের নামাজ আদায় করেছেন কয়েকজন মুসলমান।
বুধবার সকাল ৮টায় উপজেলার কৃষ্ণপুর এলাকার ‘কৃষ্ণপুর মুসলিম জামে মসজিদে’ এই ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়।
এই জামাতে ইমামতি করেন স্থানীয় বাসিন্দা রহিম গাজী। জামাতে নারী-পুরুষ মিলিয়ে মোট পাঁচজন অংশ নেন। এর মধ্যে তিনজন পুরুষ ও দুজন নারী।
নামাজ শেষে অংশগ্রহণকারীরা জানান, আগে চাঁদ দেখা সাপেক্ষে দেশের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী ঈদ পালন করলেও এখন সৌদির সঙ্গে মিল রেখে ঈদের নামাজ আদায় করতে পেরে তারা আনন্দ ও সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন।
খুতবা ও দোয়া শেষে ইমাম রহিম গাজী বলেন, “চাঁদ শুধু বাংলাদেশ বা সৌদি আরবের জন্য ওঠে না, এটি পুরো পৃথিবীর জন্যই উদিত হয়। যেদিন চাঁদ ওঠে, সেদিন থেকেই নতুন মাস শুরু হয়।
“পৃথিবীর বিস্তৃতি বেশি হওয়ায় সব জায়গা থেকে একই সময়ে চাঁদ দেখা সম্ভব হয় না। সেটি আমাদের দেখার সীমাবদ্ধতা, কিন্তু চাঁদের উপস্থিতি বাস্তব।”