Published : 28 Jul 2025, 05:25 PM
প্রায় সাড়ে পাঁচ মাস পর খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়-কুয়েটে ক্লাস শুরু হতে যাচ্ছে।
সোমবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি তাদের চলমান আন্দোলন কর্মসূচি তিন সপ্তাহের জন্য স্থগিত করে।
এরপর দুপুরে কুয়েট উপাচার্য অধ্যাপক মো. মাকসুদ হেলালী মঙ্গলবার থেকে ক্লাস শুরুর নির্দেশ দেন।
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “শিক্ষক ও ছাত্ররা একমত হয়েছে, ক্লাস ও তদন্ত কার্যক্রম একসঙ্গে চলবে। এজন্য মঙ্গলবার থেকে ক্লাস শুরুর জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।”
কুয়েট শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ফারুক হোসেন বলেন, “উপাচার্যের আশ্বাসে আন্দোলন কর্মসূচি তিন সপ্তাহের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। প্রশাসন ক্লাস শুরুর ঘোষণা দিলে শিক্ষকরা যোগ দেবে।”
এর আগে গত দুই দিন ধরে উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি, বিভিন্ন অনুষদের ডিন, বিভাগীয় প্রধান, সাধারণ শিক্ষার্থী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা এবং স্থানীয় এলাকাবাসীর সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করেন। দীর্ঘদিন পর ক্লাস ও পরীক্ষা শুরুর ঘোষণা শিক্ষার্থীদের মাঝে স্বস্তি মিলেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কুয়েটের যাত্রা শুরু ১৯৬৭ সালে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল অনুষদের অধীনে খুলনা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ হিসেবে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠানটিকে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি-বিআইটি-খুলনায় রূপান্তর করা হয়।
পরবর্তী সময় খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় নামে স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত হয় ২০০৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর। প্রতিষ্ঠার পর প্রায় ছয় দশকে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রমে এত দীর্ঘ সময় অচলাবস্থা আর দেখা যায়নি।
গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ছাত্ররাজনীতি বন্ধকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে ছাত্রদল ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমর্থকদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়; এতে অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন। ওইদিন রাতে উপাচার্যের বিরুদ্ধে হামলাকারীদের প্রতি পক্ষপাতের অভিযোগ তুলে তার পদত্যাগসহ পাঁচ দফা দাবি তোলেন শিক্ষার্থীরা।
দাবি না মানায় ১৯ ফেব্রুয়ারি বেলা দেড়টার দিকে শিক্ষার্থীরা প্রশাসনিক ও অ্যাকাডেমিক ভবনগুলোয় তালা ঝুলিয়ে দেন।
এর আগে ১৮ ফেব্রুয়ারি বিকাল ৪টা থেকে কুয়েট উপাচার্যকে মেডিকেল সেন্টারে অবরুদ্ধ করা হয়। পরদিন বিকাল সোয়া ৫টার দিকে তিনি মুক্ত হন। অবরুদ্ধ থাকা অবস্থায় তিনি ১৯ ফেব্রুয়ারির জরুরি সিন্ডিকেট সভায় অনলাইনে যুক্ত হয়ে সভাপতিত্ব করেন।
২১ ফেব্রুয়ারি কুয়েটের শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের বাসভবনে তালা ঝুলিয়ে দেয়। ২৪ ফেব্রুয়ারি রাত ১১টার দিকে উপাচার্য বাসভবনে প্রবেশ করেন।
এরপর শিক্ষার্থীরা উপাচার্যকে বাসভবন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য ২৫ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত সময় বেঁধে দেয়। ২৫ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা এবং শিক্ষার্থীদের হল ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
পরবর্তী সময় সংঘর্ষের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ঈদুল ফিতরের ছুটির পর ১৪ এপ্রিল সিন্ডিকেট সভায় ৩৭ শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়। ৩৭ জনকে বহিষ্কারের এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ভিসির পদত্যাগ দাবি করে ওইদিন থেকে আন্দোলন শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। দাবি আদায়ে ২১ এপ্রিল থেকে অনশন শুরু করেন ৩২ শিক্ষার্থী।
কুয়েটের সংকট সমাধানে ২৩ এপ্রিল বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) একটি প্রতিনিধি দল এবং শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক সি আর আবরার কুয়েটে যান।
দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাসে শিক্ষার্থীরা অনশন ভাঙেন। ওইদিন রাতেই কুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক মুহাম্মদ মাছুদ এবং উপ-উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে অপসারণের প্রক্রিয়া শুরুর কথা জানায় সরকার।
১ মে শিক্ষা মন্ত্রণালয় চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. হযরত আলীকে কুয়েটের অন্তর্বর্তীকালীন উপাচার্য পদে নিয়োগ দেয়।
৪ মে থেকে অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম শুরুর কথা থাকলেও ক্লাসে যাননি শিক্ষকরা। ১৮ মে থেকে প্রশাসনিক কার্যক্রমও বর্জন করেন তারা। শিক্ষকদের পক্ষ থেকে জানানো হয় শিক্ষকদের লাঞ্ছনায় জড়িতদের শাস্তি কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত তারা ক্লাসে ফিরবেন না।
২২ মে অন্তর্বর্তীকালীন উপাচার্য অধ্যাপক হযরত আলী পদত্যাগ করেন।
সবশেষ ২৪ জুলাই বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মো. মাকসুদ হেলালীকে কুয়েটের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।