২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯ আশ্বিন ১৪৩৩

দেড় শতাধিক দোকান পুড়িয়ে থামে আগুন, ব্যবসায়ীদের মাথায় হাত

নারায়ণগঞ্জে আগুনে কোটি কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি ব্যবসায়ীদের।

দেড় শতাধিক দোকান পুড়িয়ে থামে আগুন, ব্যবসায়ীদের মাথায় হাত

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার গাউছিয়া কাঁচাবাজারে আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত একটি দোকান।

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 24 Mar 2024, 09:31 PM

Updated : 24 Mar 2024, 09:38 PM

বাজারের মাঝখানে বাকরুদ্ধ হয়ে বসেছিলেন চাল ব্যবসায়ী অনিল বিশ্বাস। পাশে বসা এক আত্মীয় বারবার তাকে কিছু খাওয়ার জন্য অনুরোধ করছিলেন। একটি কলা ছিলে দিলেও তা খেতে অসম্মতি জানিয়ে বলেন, “আমারে কিছু খাইতে বইল না, আমি আর খাওয়ার অবস্থায় নাই।”

রোববার ভোররাতে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার গাউছিয়া কাঁচাবাজারে আগুন লাগে। এতে ১৩৭টি দোকান এবং ২৮টি কাঁচামালের ভিটি ছাই হয়েছে। তার মধ্যে উপজেলার হোরগাঁ এলাকার বাসিন্দা অনিলেরও দোকান ছিল।

অনিলের দাবি, “দোকানে প্রায় দুই হাজার ৮০০ বস্তা চাল ছিল। ক্যাশবাক্সে ছিল অন্তত ১২ লাখ টাকা। আগুনে সব ছাই হয়ে গেছে।”

ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের ঢাকা বিভাগের উপপরিচালক সালেহ উদ্দিন সাংবাদিকদের জানান, রাত ৩টা ৩৫ মিনিটে খবর পেয়ে আধ ঘণ্টার মধ্যে ১০টি ইউনিট পৌঁছে আগুন নেভাতে কাজ শুরু করে। সকাল পৌনে ৬টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।

আগুনে বাজারের চাল ও আটার আড়ত, পাইকারি মুদির দোকান, সবজি, ভোজ্যতেল, পেট্রোলিয়াম, লুব্রিকেন্ট ও হার্ডওয়ারসহ ১৬৫টি দোকান ও ভিটে পুড়ে গেছে বলে গাউছিয়া কাঁচাবাজার ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি শঙ্কর ঘোষ জানান।

এতে কোটি কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের।

চাল ব্যবসায়ী অনিল বলেন, “আগুনে সব চাল পুইড়া গেছে। যা কিছু পোড়া থেকে বাঁচছিল, তাও আগুন নেভানোর সময় পানিতে নষ্ট হইয়া গেছে। ক্যাশবাক্সে ১২ লাখ টাকা ছিল, ছুটির দিন থাকায় ব্যাংকে রাখতে পারি নাই। টাকাগুলাও পুইড়া গেছে। আমি নিঃস্ব হইয়া গেলাম।”

ব্যবসার বিপরীতে বীমা করা আছে বলে জানান এই ব্যবসায়ী। বীমা কোম্পানির লোকজন ক্ষতির পরিমাণ দেখে গেছেন। তবে ক্ষতিপূরণ পাওয়া নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে অনিল।

বলেন, “ইন্সুরেন্সের লোকজন আইসা দেইখা গেছে। হেরা সান্ত্বনা দিতেছে, ক্ষতিপূরণ দিব। কিন্তু কত আর দিব? আমার তো সব পুইড়া গেছে।”

কথা বলার সময় অনিলের মোবাইল ফোন বেজে ওঠে। অপরপ্রান্তের ব্যক্তিকে নিজের ক্ষতির সম্পর্কে জানাচ্ছিলেন আর বলছিলেন, “আমি তো শ্যাষ হইয়া গেলাম।”

বাজারের পশ্চিম পাশে দেলোয়ার হোসেন কাজলের পাইকারি দোকানেরও সব পণ্য পুড়ে গেছে। বুধবার দোকানে ২০ লাখ টাকার পণ্য তোলার দাবি করে এই ব্যবসায়ী বলেন, “সিকিউরিটি গার্ড ছাড়া রাতে বাজারে কেউ থাকেন না। আমার বাড়ি বাজার থেকে দূরে। খবর পাইয়া আইতে আইতে দেখি আগুনে আমার সব শ্যাষ। কাছে থাকলে হয়ত কিছু রক্ষা করা যাইত।”

২০২২ সালেও এই বাজারের একাংশে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। সেই সময়ও কাজলের দোকানের অনেক মালামাল পুড়ে গিয়েছিল। সেই ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে পারলেও এবারের আগুনে ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন বলে জানান তিনি।

আরেক চাল ব্যবসায়ী আলী আজগর বলেন, “১০ দিন আগে বিক্রির জন্য ৪০০ বস্তা চাল কিনছি। ১০০ বস্তার মতো বিক্রি হয়েছে। বাকি সব আগুনে পুইড়া গেল। আগুনের সামনে চাইয়া-চাইয়া সব দেখছি, কিচ্ছু করতে পারি নাই।”

পুড়ে যাওয়া চাল থেকে দুই বস্তা চাল সংগ্রহ করতে দেখা যায় আজগরকে। জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এইগুলা তো মানুষে খাইব না। গরু বা মাছের খাওনের কাজে ব্যবহার করা যায় কি-না সেইটা দেখতে হইব।”

আগুন নেভাতে নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকার চারটি ফায়ার স্টেশনের ১০টি ইউনিট কাজ করেছে বলে জানান ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক সালেহ উদ্দিন।

তিনি বলেন, কাঁচাবাজার বলে পরিচিত হলেও সেখানে পেট্রোলিয়াম, লুব্রিকেন্ট ও হার্ডওয়ারের দোকান ছিল। এসব দোকানে দাহ্য পদার্থ থাকায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। শতাধিক দোকান পুড়ে গেছে।

তবে আগুন লাগার কারণ ও সূত্রপাত সম্পর্কে নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেননি এই ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তা।

স্থানীয়রা জানান, এই বাজারের পাশেই দেশের সবচেয়ে বড় পাইকারি ‘গাউছিয়া কাপড় মার্কেট’। কাঁচাবাজারের আগুন কাপড়ের মার্কেটে ছড়ালে আরও ভয়াবহ অবস্থা তৈরি তৈরি হত।

ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা জানান, রমজান ও আসন্ন ঈদকে সামনে রেখে দোকানগুলোতে অতিরিক্ত মালামাল মজুত করেছিলেন তারা।

গাউছিয়া এলাকার কাছাকাছি কোনো ফায়ার স্টেশন না থাকায় আগুনের ব্যাপকতা ছড়িয়েছিল। এ এলাকায় ফায়ার স্টেশন স্থাপনের দাবি জানান ব্যবসায়ীরা।

গাউছিয়া কাঁচাবাজার ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি শঙ্কর ঘোষ বলেন, “ঝড়-বৃষ্টির সময় শর্ট সার্কিট থেকে আগুন লাগতে পারে। নৈশপ্রহরীরা যতক্ষণে আগুন দেখে, ততক্ষণে তা ছড়িয়ে পড়ে। তাছাড়া খবর পাওয়ার প্রায় ঘণ্টাখানেক পর ফায়ার সার্ভিস আসে। ততক্ষণে পুরো বাজারে আগুন ছড়িয়ে পড়ে।”

কাঁচাবাজারটিতে সবগুলো দোকানই টিনশেডের; তাছাড়া এখানে অগ্নিনির্বাপণের কোনো ব্যবস্থা ছিল না বলে জানান এই ব্যবসায়ী নেতা।

খবর পেয়ে দুপুরে নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম দস্তগীর গাজীর পক্ষে তার বড় ছেলে রূপগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি গাজী গোলাম মূর্তজা ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান। এ সময় ব্যবসায়ীরা তার কাছে ক্ষতিপূরণ ও ভুলতা এলাকায় একটি ফায়ার স্টেশন নির্মাণের দাবি জানান।

গাজী গোলাম মূর্তজা সাংবাদিকদের বলেন, “বাবা (গোলাম দস্তগীর গাজী) প্রশাসনের লোকজনের সঙ্গে কথা বলেছেন। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের একটি তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। সাধ্যমতো তাদের পাশে থাকার চেষ্টা করব।

“ভুলতা নারায়ণগঞ্জের ব্যস্ততম এলাকা। দেশের ‘সবচেয়ে বড়’ কাপড়ের বাজারটি এখানে। গত এক সপ্তাহে এই এলাকায় ছোট-বড় অন্তত চারটি আগুনের ঘটনা ঘটেছে।”

স্থানীয় সংসদ সদস্য ভুলতায় একটি ফায়ার স্টেশন স্থাপনের চেষ্টা করছেন বলেও জানান গাজী গোলাম মূর্তজা।