Published : 01 Jan 2026, 07:41 PM
সিলেটে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ উপেক্ষা করে বাঁশ ও বেতের তৈরি পলো দিয়ে মাছ ধরার বার্ষিক ‘পলো বাওয়া উৎসব’ হয়েছে। প্রতি বছরের ন্যায় এবারও শীতের সকালে বিশ্বনাথ উপজেলার দৌলতপুর ইউনিয়নের গোয়াহরি বিলে এ উৎসবের আয়োজন করা হয়।
তবে এ বছর বিলের পানি কমে যাওয়ায় নির্দিষ্ট সময়ের প্রায় ১৫ দিন আগে ইংরেজি নববর্ষের দিনে ঐতিহ্যবাহী পলো বাওয়া উৎসব পালন করা হয় বলে জানান বিশ্বনাথ উপজেলার দৌলতপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য গোলাম হোসেন।
সিলেট আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ শাহ মো. সজিব হোসাইন বলেন, বৃহস্পতিবার সিলেটে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৯ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস; যাকে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বলা হয়।
গোয়াহরি গ্রামের বাসিন্দারা বলেন, পূর্ব পুরুষদের রেখে যাওয়া ঐতিহ্যকে যুগ যুগ ধরে ধারণ করে রেখেছেন গোয়াহরি গ্রামের বর্তমান প্রজন্মের বাসিন্দারা। নিজেদের ঐতিহ্য অনুযায়ী প্রতি বছর মাঘ মাসের পহেলা তারিখ আনুষ্ঠানিকভাবে পলো বাওয়া উৎসব পালন করা হত। তবে এ বছর বিলের পানি কমে আসায় ১৫ দিন আগেই পালিত হলো উৎসবটি।
এদিন সকাল ১০টায় শুরু হওয়া পলো বাওয়া উৎসব শুরুর আগে থেকে গ্রামে উৎসবের আমেজ তৈরি হয়। বিলে চলে আসা গ্রামের সব বয়সের মানুষ ও অন্য গ্রাম থেকে আসা আত্মীয়-স্বজনরা একসঙ্গে জড়ো হয়ে বিলে মাছ শিকার করেন।

তবে বিলে পানি কম থাকায় ও শীতের তীব্রতার কারণে বেশিরভাগ মাছ শিকারীকে ফিরতে হয়েছে খালি হাতে। কারণ বিলের পানি কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মাছের পরিমাণও কমে গেছে।
এরপরও পলোতে ধরা পড়েছে- বোয়াল, কাতলা, রুই, কার্ফু, শোল, গণিয়া, মিরকা, কাতলাসহ বিভিন্ন প্রজাতির ছোট মাছ।
এবারের পলো বাওয়া উৎসবে সবচেয়ে বড় বোয়াল মাছটি ধরেন মামা বাড়িতে বেড়াতে আসা রাজু আহমদ। মামা গোয়াহরি গ্রামের আব্দুল মতিনের পরিবারের পক্ষে পলো বাওয়া উৎসবে যোগ দিয়ে রাজু বড় বোয়ালের সঙ্গে একাধিক শোল ও কার্ফু মাছ ধরেছেন।
বাবার সঙ্গে পলো বাওয়া উৎসবে যোগ দিতে আসা পাঁচ বছরের মরিয়ম বেগম হাসিমাখা মুখে বলে, “আমার আব্বায় আইজ (আজকে) চাইট্টা (চারটি) মাছ মারছইন (ধরা)।”

প্রবাসী রেজাউল করিম বলেন, “দীর্ঘদিন পর দেশে এসে পলো বাওয়া উৎসবে যোগ দিয়েছি। বোয়াল-কাতলাসহ একাধিক মাছ শিকার করতে পেরে খুবই আনন্দ লাগছে।”
একসঙ্গে থাকা লাল মিয়া, ইকবাল হোসেন ও প্রবাসী মনোয়ার হোসেন জানান, এবার শীতের তীব্রতা খুব বেশি থাকার কারণে অনেক শৌখিন শিকারী বেশি সময় পানিতে থাকতে পারেননি। আর বিলের পানির পরিমাণ কম থাকায় মাছ শিকারও কম হয়েছে।
স্থানীয় যুবক আব্দুল লতিফ বলেন, “শীতের মধ্যে পলো বাওয়া উৎসবে যোগ দিয়ে মাছ শিকার করা ঈদের আনন্দের মতোই লাগছে। তবে মাছের পরিমাণ এবার অন্যান্য বছরের তুলনায় অনেক কম।”
শৌখিন মাছ শিকারী সুয়েব খান বলেন, “মাছ শিকার করে ভালোই লাগছে। তবে বড় মাছের তুলনায় ছোট মাছের পরিমাণ বেশি।”

গোয়াহরি গ্রামের বাসিন্দা যুক্তরাজ্য প্রবাসী প্রবীণ হাজী তৈমুছ আলী বলেন, “এখন আর আগের মতো মাছ শিকার করা যায় না। বিলটি ভরাট হয়ে যাওয়ায় ও পানির চলাচল না থাকায় এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। তবে দীর্ঘদিন পর আবারও পলো বাওয়া উৎসবে যোগ দিতে পেরে খুব আনন্দ পেয়েছি।”
গ্রামের আরেক প্রবীণ হাজী আব্দুল কুদ্দুছ বলেন, “আমাদের পূর্ব পুরুষরা সারা বছরই বিল থেকে মাছ শিকার করে খেয়েছেন। সময়ে পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিলে পানি ও মাছের পরিমাণ কমে এসেছে। তাই এখন অনেককে খালি হাতে ঘরে ফিরতে হয়।”
ইউপি সদস্য গোলাম হোসেন বলেন, বিলে পানি কমে যাওয়ার কারণে গ্রাম পঞ্চায়েতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এবার নির্দিষ্ট সময়ের ১৫ দিন আগেই বার্ষিক পলো বাওয়া উৎসবের আয়োজন করা হয়।