Published : 13 May 2026, 12:44 AM
জমি বিক্রি করে সিঙ্গাপুরে পাঠিয়েছিলেন বাবা; তবে সেখানকার আয় দিয়ে সংসারের অভাব-অনটন কাটছিল না। তাই আরও বেশি আয়ের আশায় যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে পরিবারকে না জানিয়েই ঝুঁকি নিয়ে রাশিয়ায় পাড়ি জমান ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ার আব্দুর রহিম।
কিন্তু সেখানে রাশিয়ার ভাড়াটে সৈনিক হিসেবে যুদ্ধ করতে গিয়ে ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন এ যুবক। আর তাতে থমকে গেছে রহিমের পরিবারের সব স্বপ্ন। এখন তার পরিবারে চলছে কান্নার রোল।
৩০ বছর বয়সী আব্দুর রহিম ফুলবাড়িয়া উপজেলার পুটিজানা নামাপাড়া গ্রামের আজিজুল হকের ছেলে।
আজিজুল পুটিজানা ইউনিয়ন পরিষদের দুই নম্বর ওয়ার্ড জামায়াতে ইসলামীর সভাপতি। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সন্তানকে হারিয়ে শোকের পাশাপাশি ভবিষ্যতের চিন্তায় দিশেহারা তিনি।
আজিজুল হক বলেন, “পরিবারের সুখের আশায় জমি বিক্রি করে তাকে বিদেশ পাঠাই। তার সঙ্গে নিয়মিত কথা হত, পরিবারের যে কোনো সময় যে কোনো বিপদে তাকে পাশে পাওয়া যেত।
“হঠাৎ করেই তার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরে সহযোদ্ধা ও পরিচিতদের মাধ্যমে সোমবার রাতে তার মৃত্যুর খবর আমরা জানতে পারি।”
তিনি বলেন, “আমার পরিবারের এখন কী হবে, আমি কেমন করে চলব?”
রহিমের মা রমিছা খাতুন সন্তানের কথা মনে করে বার বার জ্ঞান হারাচ্ছেন। আর বলছেন, “আমার আদরের সন্তানকে ফিরিয়ে আনিয়া দেও। আমার সব শেষ হয়ে গেছে। আমি আমার সন্তানের লাশ ফেরত চাই।”

নিহতের স্বজনরা বলছিলেন, অন্তত প্রিয়জনের মুখটি শেষবারের মত দেখতে চান তারা। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এমন ঘটনায় যাতে আর কোনো বাংলাদেশি যুবক জড়িয়ে না পড়ে, সে ব্যাপারেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তারা।
নিহতের মামা আফসার আলী বলেন, “আমার বোনের খুব কষ্টের সংসার। ভাগনে খুব আদরের ছিল, কিন্তু পরিবারের জন্য বিদেশে যায় আমার ভাগনে। হঠাৎ করে টাকার লোভে পড়ে যুদ্ধে জড়িয়ে যায়, আমরা ভাগনের লাশটা দ্রুত ফেরত চাই।”
এর পাশাপাশি সরকার যেন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটির পাশে দাঁড়ায়, সে কামনাও করেন তিনি।
জানা যায়, আব্দুর রহিম জীবিকার সন্ধানে কয়েক বছর আগে সিঙ্গাপুর পাড়ি জমান। পরবর্তীতে বিভিন্ন মাধ্যমে পরিবারকে না জানিয়েই তিনি রাশিয়ায় চলে যান। রাশিয়ায় অবস্থানকালে চুক্তিভিত্তিক সেখানকার সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত হন।

চলতি বছর ২ মে রাশিয়া-নিয়ন্ত্রিত ইউক্রেন সীমান্তের যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়ান সেনাবাহিনীর পক্ষে লড়াই করার সময় ড্রোন হামলার শিকার হন তারা।
এই হামলায় মারা যান কিশোরগঞ্জ জেলার রহিমগঞ্জ উপজেলার রিয়াদ রশিদ (২৮)। গুরুতর আহত হন আব্দুর রহিমসহ কয়েকজন।
কয়েকদিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর মারা যান আব্দুর রহিম। পরে সোমবার রাতে তার মৃত্যুর সংবাদ পরিবারের কাছে পৌঁছায়।
একই হামলায় একজন নাইজেরিয়ান নাগরিক নিহত হন এবং লিমন দত্ত নামের আরেক বাংলাদেশি সেনা আহত হয়ে একটি পা হারিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য মোছা. আফরোজা আক্তার বলেন, “আমরা চাই সরকার যেন দ্রুত রহিমের মরদেহ দেশে আনার ব্যবস্থা করে। নিহতের পরিবারের জন্য সরকারের কাছে সহযোগিতার দাবিও জানাই।”
এ বিষয়ে ফুলবাড়িয়ার সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ কামরুল হাসান মিলন বলেন, “আমরা এই পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি। আর দ্রুত লাশটি ফেরত আনতে যে ব্যবস্থা করা দরকার আমরা তা চেষ্টা করব।”
পাশাপাশি তিনি সতর্ক করে বলেন, অর্থের প্রলোভনে পড়ে এরকম ফাঁদে যেন কেউ পা না দেয়।