বাবার মরদেহ বাড়িতে, ‘বুকে পাথর চেপে’ পরীক্ষায় সুমাইয়া

পরীক্ষা শেষে বাড়ি ফির বাবার মরদেহের কাছে গিয়ে হাউমাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়ে সুমাইয়া।

আবদুর রহমান, কুমিল্লা প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 17 Sept 2022, 06:50 PM
Updated : 17 Sept 2022, 06:50 PM

বাড়িতে যখন বাবার মরদেহ নিয়ে স্বজন-প্রতিবেশীরা আহাজারি করছিলেন তখন এসএসসি পরীক্ষার্থী সুমাইয়া কেন্দ্রে যাচ্ছিল পরীক্ষা দিতে।

শনিবার সকালে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার নোয়াপাড়া গ্রামে এই দৃশ্যে স্বজন-প্রতিবেশীদের কেউ কান্না চেপে রাখতে পারেনি।

সুমাইয়া আক্তার সুইটির এসএসসির দ্বিতীয় দিনের পরীক্ষা শনিবার সকাল ১১টায়। তাই শুক্রবার রাতে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই পরিবারের সদস্যদের কান্নাকাটিতে সুমাইয়া জেগে দেখে বাবা বেঁচে নেই।

রাত শেষে সকাল হলো, বাড়ির আঙিনায় রাখা বাবার মরদেহ। স্বজনদের কান্নায় ভারি হয়ে উঠেছে আশপাশের পরিবেশ।

এরই মধ্যে পরীক্ষার সময় ঘনিয়ে এলো। খবর পেয়ে সহপাঠীরাও পাশে দাঁড়াল সুমাইয়ার। শেষ পর্যন্ত বাবার মরদেহ বাড়িতে রেখেই পরীক্ষা কেন্দ্রে গেল মেয়েটি। তিন ঘণ্টা পরীক্ষা শেষ করে বাড়ি ফিরেছে।

দুপুর ১টায় পরীক্ষা শেষ করে যখন বাড়ি ফিরেছে তখন বাবাকে শেষ বিদায় জানাতে সবাই উপস্থিত, চলছে জানাজার নামাজের প্রস্তুতি। বাড়িতে পৌঁছে বাবার মরদেহের কাছে গিয়ে হাউমাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়ে সুমাইয়া।

বিলাপ করতে করতে বারবার বলছিল, “বাবা, ও বাবা, চোখ খোলো, বাবা আমি পরীক্ষা দিয়ে এসেছি।”

এমন দৃশ্য দেখে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেনি উপস্থিত অনেকেই।

কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার নোয়াপাড়া গ্রামের এবারের এসএসসি পরীক্ষার্থী সুমাইয়া আক্তার সুইটি আবুল কাশেমের মেয়ে।

পাশের কনেশতলা মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এ বছর বিজ্ঞান বিভাগ থেকে পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে সে। সুমাইয়ার পরীক্ষার কেন্দ্র পড়েছে তার বাড়ি থেকে আড়াই কিলোমিটার দূরে অবস্থিত চৌয়ারা গালর্স স্কুলে। শনিবার ছিল বাংলা দ্বিতীয় পত্র পরীক্ষা।

সুমাইয়ার বাবা আবুল কাশেম গাড়ি চালক ছিলেন। তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে সুমাইয়া সবার বড়।

শুক্রবার মধ্যরাতে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মারা গেছেন কাশেম।

কনেশতলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, সুমাইয়া খুবই মেধাবী শিক্ষার্থী। সে স্টুডেন্ট কেবিনেটের প্রতিনিধি। ভালো শিক্ষার্থীর পাশাপাশি একজন ভালো সংগঠকও সে। শুক্রবার রাতে হঠাৎ করেই সুমাইয়ার বাবা আবুল কাশেম মারা যান। সকালে পরীক্ষা দেবে কি-না তা নিয়ে সংশয় দেখা দেয়। পরে সহপাঠীদের সহযোগিতায় নিজেকে সামলে নিয়ে বাড়ি থেকে আড়াই কিলোমিটার দূরে চৌয়ারা গালর্স স্কুলের উদ্দেশ্য রওনা দেয় সে। বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত পরীক্ষা দিয়েছে সুমাইয়া।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে সুমাইয়া আক্তার সুইটি বলেন, “বাবা অনেক কষ্ট করে আমাদের পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। বাবার স্বপ্ন ছিল আমি যেন শিক্ষক হই। বাবার স্বপ্ন পূরণে আমি বাবার লাশ বাড়িতে রেখেই পরীক্ষা দিতে গিয়েছি। আমি সবার কাছে দোয়া চাই, যেন বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে পারি। আর বাবার জন্য সবার কাছে দোয়া চাই।

“এমন পরিস্থিতিতে কখনও পড়ব ভাবিনি। বাবার লাশ বাড়িতে রেখে তিন ঘণ্টা যেন বুকে পাথর চাপা দিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক রেখে পরীক্ষা দিয়েছি।”

শনিবার পরীক্ষা চলাকালে চৌয়ারা গালর্স স্কুল কেন্দ্রে পরিদর্শনে যান কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শুভাশিস ঘোষ।

এ প্রসঙ্গে ইউএনও বলেন, “আমি জানতে পেরেছি পরীক্ষার্থী মেয়েটির বাবা মারা গেছেন এবং বাড়িতে বাবার মরদেহ রেখেই পরীক্ষা দিতে এসেছে সে। তখন পরীক্ষা হলে কর্তব্যরত শিক্ষকদের বলেছি মেয়েটি যেন নার্ভাস না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে। পরীক্ষা শেষে সুমাইয়াকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।  

স্থানীয় বাসিন্দা আবুল বাশার বলেন, আবুল কাশেম কখনও অটোরিকশা আবার কখনও পিকআপ ভ্যান ভাড়ায় নিয়ে চালিয়ে কোনো রকমে সংসার চালিয়ে যাচ্ছিলেন। পাশাপাশি সন্তানদেরও পড়াশোনা করাচ্ছিলেন তিনি। তার মৃত্যুতে পরিবারটি অসহায় হয়ে পড়েছে।

তিনি প্রশাসনের কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি এবং সমাজের বিত্তবানদের পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর অনুরোধ জানান। 

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক