‘আঁর বাড়িঘর ঠিক করি দেন’
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক বলেন, ফেনীতে সরকারি ও বেসরকারিভাবে ১ লাখ ৬০ হাজার ৩০০ প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে।
‘বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি ঠিক করে দেওয়ার’ দাবি নিয়ে ফেনী শহরের ট্রাংক রোডের জিরো পয়েন্টে দাঁড়িয়ে ছিলেন নজরুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি। নিজের পরনের টি-শার্ট ও প্লাস্টিকের সাদা বস্তায় তিনি তার দাবির কথা লিখেন। পাশে দাবি সম্বলিত প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়েছিল মেয়ে নিকিতা আক্তার।
পেশায় কৃষক নজরুলের বাড়ি ফেনীর পরশুরাম উপজেলার মির্জানগর ইউনিয়নের উত্তর কাউতলী গ্রামের দক্ষিণ মহিলা ঘাট আদু মাঝির বাড়ি। এটি মুহুরী নদীর তীরবর্তী বেড়িবাঁধ এলাকা।
এ বছর তিন দফা বন্যায় বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ায় বাঁধ সংলগ্ন এলাকায় তার বাড়িও বন্যার পানিতে ভেঙে গেছে।
কৃষি জমিতে বালি জমায় করতে পরছেন না চাষাবাদ। ২১ অগাস্ট বন্যার ভয়াবহতা বাড়লে নজরুল নিঃস্ব হয়ে যান। কাজকর্ম বন্ধ থাকায় ত্রাণ সহায়তার আশায় ছুটে বেড়াচ্ছেন বিভিন্ন স্থানে
এক পর্যায়ে স্থানীয়রা তাকে ফেনী প্রেসক্লাবে গিয়ে তার কষ্টের কথা সাংবাদিকদের জানানোর পরামর্শ দিলে তিনি মেয়েকে নিয়ে সেখানে যান।
নজরুল সাংবাদিকদের বলেন, ভয়াবহ বন্যার তার ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। সেখানে থাকার মত কোনো অবস্থা নেই। ১৪ দিন পেরিয়ে গেলেও সরকারিভাবে কোনো ত্রাণ সামগ্রী তিনি পাননি। রোববার বিমানবাহিনীর এক প্যাকেট ও এর আগে বেসরকারি একটি সংগঠন থেকে এক প্যাকেট ত্রাণ সহায়তা পেয়েছেন।
তিনি আকুতি জানিয়ে বলছিলেন, “বন্যায় আঁর বাড়ি-ঘর বেক ভাঙ্গি গেছে, আঁর বাড়িঘর ঠিক করি দেন, পাশে দাঁড়ান আন্নেরা।”
পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া নজরুলের মেয়ে নিকিতা আক্তার বলে, বন্যায় তাদের ঘর ভেঙেছে। মা-বাবা ও আরেক বোনসহ তারা তিনবেলা খেতে পারছে না। তাদের মতো গ্রামের অনেকেই মানবেতর জীবন যাপন করছে।
পরে রাত ১১টার দিকে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদক নজরুল ও তার মেয়ের জন্য তিনদিনের খাবার সামগ্রী (চাল, ডাল, আলু, পেঁয়াজ, চিড়া, গুড়) তুলে দেন।
সীমান্তবর্তী মির্জানগর ইউনিয়নে নজরুলের মতো কয়েক শতাধিক পরিবার রয়েছে; যারা স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় সব হারিয়ে না খেয়ে, খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
ভারি বর্ষণ এবং ভারত থেকে নেমে আসা ঢলে স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়েছে ফেনী। ওই সময় চারদিকে থইথই পানি আর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার কারণে মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছিল আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠা।
পানি বাড়তে বাড়তে এক পর্যায়ে পুরো জেলাই তলিয়ে যায়। তবে গত কয়েকদিন থেকে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে শুরু করে। দুর্ভোগ কমে আসার পর এখন বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তরা অভিযোগ করেছেন, তারা সরকারি কোনো ত্রাণ পাননি।
২১ অগাস্ট ফেনীতে বন্যা শুরুর পর থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত জেলায় বেসরকারিভাবে বিভিন্ন ত্রাণ তৎপরতা দেখা গেলেও সরকারিভাবে ত্রাণ বিতরণ চোখে পড়েনি বলে দাবি করেছেন ক্ষতিগ্রস্তরা।
অবশ্য জেলা ত্রাণ ও পুনবার্সন বিভাগ বলছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই মাস থেকে অগাস্ট পর্যন্ত তিন দফা বন্যায় জেলায় এক হাজার ৬০০ মেট্রিকটন চাল, নগদ ৬২ লাখ টাকা এবং ছয় হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ সাপেক্ষে বিতরণ করা হয়েছে।
এবারের বনর্যায় জেলার ছয় উপজেলায় অন্তত ১০ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জেলা প্রশাসন জানিয়েছে।
ফেনী সদর উপজেলার কালিদহ ইউনিয়নের উত্তর গোবিন্দপুর গ্রামের ইয়াসিন ড্রাইভার বাড়ির জমিদার নাসির জানান, মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত গ্রামের রাস্তায় পায়ের পাতা অবধি পানি জমে আছে। তিনদিন আগেও ঘরে হাঁটু সমান পানি ছিল।
তিনি বলেন, “আমার গ্রামের আশপাশের দরিদ্র কোনো পরিবার সরকারি কিংবা বেসরকারি কোনো ধরনের ত্রাণ পাইনি। স্থানীয় গ্রামবাসী কিছু নিরীহ পরিবারের মাঝে শুকনো খাবার বিতরণ করেছিল।”
একই কথা বলেছেন দাগনভূঞা উপজেলার সিন্দুরপুর ইউনিয়নের সত্যপুর গ্রামের মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, বন্যার ১৪ দিন অতিবাহিত হলেও মঙ্গলবারও সড়কে পানি জমে আছে। সরকারিভাবে কোনো ধরনের চাল বা ত্রাণ সহায়তা এদিন সকাল পর্যন্ত তিনি পাননি। তবে বেসরকারিভাবে চিড়া, মুড়ি পেয়েছেন।
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ফুলগাজী উপজেলার মুন্সীরহাট ইউনিয়নের দক্ষিণ বরইয়া গ্রামের সেলিনা আক্তার বলছিলেন, “গত মাসের শুরু থেকে চেয়ারম্যান ও মেম্বাররা সব পলাতক থাকায় কেউ ত্রাণ দিতে আসেনি। বন্যার পানি নামলেও মেলেনি কোনো সরকারি ত্রাণ।”
মঙ্গলবার পর্যন্ত সরকারি কোনো ত্রাণ পাননি বলে জানিয়েছেন দাগনভূঞা উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের জয়নারায়ণপুর গ্রামের পারুল আক্তার। তার ভাষ্য, “এলাকায় অনেকে চাল পেয়েছে শুনেছি, তবে আমি পাইনি।”
পাঁচগাছিয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন দেলু বলেন, সরকারিভাবে তার ইউনিয়নে ২৩ টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। আর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের সহায়তায় ক্ষতিগ্রস্তের অনুপাতে কোনো কোনো ওয়ার্ডে ২৫০ জন, তো কোনো কোনো ওয়ার্ডে ২৬০ জনকে ১০ কেজি করে চাল বিতরণ করা হয়েছে।
এদিকে বেসরকারিভাবে ত্রাণ কার্যক্রম চলমান রাখা ‘ইয়ুথনেট ফর ক্লাইমেট জাস্টিস’ এর পরিবেশ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক সমন্বয়কারী মোহাইমিনুল ইসলাম জিপাত বলেন, “বন্যা শুরুর পর থেকে সরকারি কোনো সহযোগিতা ছাড়াই প্রচেষ্টা ফাউন্ডেশন, ইয়ুথনেট, আমরাই আগামী, প্রয়াস ও ফেনী সেন্ট্রাল লিও ক্লাবের যৌথ উদ্যোগে সোমবার পর্যন্ত ফেনীর বিভিন্ন উপজেলায় এক লাখ মানুষের কাছে ত্রাণ সামগ্রী পৌঁছানো হয়েছে।
“আমাদের কার্যক্রম বন্যার প্রথম দিন থেকেই শুরু হয়ে এখনও চলমান রয়েছে। শুধু তাই নয় প্রথম থেকেই আমাদের তিনটি টিম উদ্ধার অভিযানে প্রথম সারিতে কাজ করেছে।”
ফেনী বিজিবি-৪ ব্যাটালিয়নের (বীরশ্রেষ্ঠ) অধিনায়ক লেফট্যানেন্ট কর্নেল মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন জানান, ফেনীতে গত ২১ অগাস্ট বন্যার অবস্থার অবনতি হলে ওইদিন থেকে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত বিজিবির ব্যবস্থাপনায় জেলায় বন্যার্তদের জন্য ২৯ হাজার ১৭৪ প্যাকেট ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে দুই লিটার পানি, চাল, ডাল আলু, ভোজ্য তৈল, বিভিন্ন প্রকার বস্ত্র, স্যানেটারি রয়েছে।
তিনি বলেন, জেলায় দুই হাজার ২০০ জন বন্যার্ত এবং ফেনী কারাগারে কারাবন্দিদের মাঝে শুকনা খাদ্য সামগ্রীসহ রান্না করা খাবার, দুই লিটার বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা হয়েছে।
ফেনীর ত্রাণ ও দুর্যোগ কার্যালয়ের দায়িত্বে থাকা সহকারী কমিশনার (নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট) সুলতানা নাসরিন কান্তার বলেন, চলতি অর্থবছরের জুলাই মাস থেকে অগাস্ট পর্যন্ত তিন দফার বন্যায় জেলায় এক হাজার ৬০০ মেট্রিকটন চাল, নগদ ৬২ লাখ টাকা ও ছয় হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ সাপেক্ষে ছয় উপজেলায় ইউএনওদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে তা বিতরণ করেছেন।
পরশুরাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আফরোজা হাবিব শাপলা বলেন, বন্যায় তার উপজেলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। জনপ্রতিনিধি না থাকলেও ছাত্রদের সহায়তায় সরকারি ও বেসরকারিভাবে প্রচুর ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে। এখন ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রস্তুতির কাজ চলমান রয়েছে।
সোমবার রাতে সংবাদ মাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মোমেনা আক্তার বলেন, ফেনীতে এবারের বন্যায় ১০ লাখ লোক দুর্যোগের শিকার হয়েছে। জেলায় সরকারি ও বেসরকারিভাবে ১ লাখ ৬০ হাজার ৩০০ প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। সশস্ত্র বাহিনী হেলিকপ্টার এর মাধ্যমে ৬৩ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করেছে। সরকারি-বেসরকারি ত্রাণ কার্যক্রম এখনও চলমান রয়েছে।
