Published : 02 Aug 2025, 09:50 AM
মধ্য বয়স্ক রুবিনা আক্তারের আধাপাকা বাড়ি ডুবে আছে হাঁটু সমান ময়লা পানিতে। ঘর থেকে বের হলেই চারদিকে পানি। এক ঘর থেকে আরেক ঘর, প্রতিবেশীর বাড়িও যেতে হয় পানি ভেঙে। কোথাও শুকনো মাটি নেই।
প্রথমবার কেউ দেখলে মনে করবে, হয়ত প্রবল বৃষ্টির কারণে চারদিকে পানি জমে এ অবস্থা হয়েছে। কিন্তু রুবিনাকে মাসের পর মাস ধরে এই পরিস্থিতিতে বসবাস করতে হচ্ছে। তাদের টয়লেট, গোসলখানা, রান্নাঘর, হাঁস-মুরগির খোয়ার, উঠান, চলাচলের গলি সব জায়গা পানির নিচে। তিন মাস ধরে এভাবেই চলছে কুমিল্লার চাঁনপুরের বাসিন্দাদের।
রুবিনা আক্তার বলছিলেন, “এই সমস্য চাঁনপুর এলাকায় বিগত কয়েক বছরের। একবার বর্ষার পানি জমলেই বছরের বেশিরভাগ সময় বাড়িঘর রাস্তাঘাট ডুবে থাকে। পানি সরার কোনো জায়গা নেই। ঘরে ঘরে চর্মরোগ, খাবার পানির ভয়ানক সমস্যা। বাথরুম-টয়লেটও পানির নিচে।
“এই অবস্থায় থাকা যায় না! আমরা আসলেই নিরুপায় হয়েই নিজের বাড়িঘরে থাকছি, সামর্থ থাকলে কবে চলে যেতাম!”
কুমিল্লা শহর-লাগোয়া এলাকাটিতে প্রায় পাঁচ হাজার বাড়িঘরে ৩০ হাজারের মত মানুষ বসবাস করে। প্রত্যেককে এই ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। এলাকার মানুষজন বারবার জলাবদ্ধতা দূর করার জন্য জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে গিয়েছেন। কিন্তু কোনো কিছুতেই কিছু হয়নি। নিত্যদিন ভোগান্তিই সঙ্গী হয়েছে তাদের।
চাঁনপুরের বাসিন্দা এক যুবক আক্ষেপ করে বলছিলেন, “কুমিল্লার চাঁনপুর হচ্ছে যশোরের ভবদহ। আমরা জলাবদ্ধতার অভিশাপে পড়ে আছি।”

‘বাতির নিচে অন্ধকার’
শহর-লাগোয়া হলেও চাঁনপুর এলাকাটি কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের বাইরে, পাঁচথুবী ইউনিয়নের একটি ওয়ার্ড। এটি কুমিল্লা শহরের পুরনো আবাসিক এলাকা। পুরাতন গোমতী নদীর দুই আইলের মাঝে গড়ে ওঠা এই এলাকাটি ঘনবসতিপূর্ণ।
এখানে বহুতল ভবন, কাঁচা, আধাপাকা, পাকা বাড়ির সব বাসিন্দাই মূলত স্থায়ী। চাঁনপুর বেবিস্ট্যান্ড থেকে শুরু করে পাক্কার মাথা পর্যন্ত প্রধান সড়কের প্রায় দেড় কিলোমিটারজুড়ে যত বাড়িঘর আছে সবগুলোই প্রায় জলাবদ্ধ।
রাস্তার উপর কচুরিপানা জমে এমন অবস্থা হয়েছে সেটি রাস্তা-নালা নাকি জলাশয়- বোঝারও উপায় নেই। প্রধান সড়ক থেকে অলিগলি সব জায়গায় ময়লাপানি।
যশোরের ভবদহ বিলের পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেখানে আশপাশের কয়েকটি উপজেলার লাখ লাখ মানুষ দশকের পর দশক ধরে পানিবন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। সরকারিভাবে বেশ কয়েকবার উদ্যোগ নিলেও সেখানকার মানুষ পানিবন্দি অবস্থা থেকে মুক্তি পাননি। দেশে জলাবদ্ধতার ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা বললে উদাহরণ হিসেবে ভবদহের কথাই উঠে আসে।
ভবদহের মত বিস্তৃত এলাকায় না হলেও চাঁনপুরের পানিবন্দি মানুষের ভোগান্তি সেখানকার বাসিন্দাদের মতই। তবে এখানকার জলাবদ্ধতার মূল কারণ হিসেবে স্থানীয়রা বলছিলেন, রাস্তার দুপাশে অপরিকল্পিত উঁচু বাড়িঘর নির্মাণ, নির্মাণ সামগ্রী ইট-বালু ফেলে ড্রেন ভরাট করা, জলাশয়ে বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ করা এবং পানি নিষ্কাশনের সব পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া।
স্থানীয় বাসিন্দা সেলিম চৌধুরী বলছিলেন, “চাঁনপুর এলাকাটি কুমিল্লা শহরের অন্যতম পুরাতন আবাসিক এলাকা। কিন্তু সিটি করপোরেশনের সীমানার বাইরে পড়ে যাওয়ায়, এলাকাটি যেন বাতির নিচে অন্ধকারের মত।
“আগে শুধু রাস্তাঘাট ডুবে থাকত। এখন বাড়িঘরও ডুবে গেছে। এই সমস্যা প্রায় ৩০ বছর ধরেই, দিন দিন বাড়ছেই।”
সেলিম বলেন, “সবাই পরিকল্পনা ছাড়া বাড়িঘর করেছে, আর এই চাঁনপুরের পূর্বদিক দিয়ে টিক্কারচর এলাকায় পানি অপসারণের জায়গায় বাঁধ দিয়ে অনেকে মাছ চাষ করায়- এই এলাকা থেকে পানি সরে না।”

‘পানির ভয়ে আত্মীয়-স্বজনও আসে না’
সম্প্রতি এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, ময়লা পানিতে সয়লাব এলাকাটি। দীর্ঘদিন জমে থাকা ময়লা পানিতেই হাঁটছে শিশুরা, সাঁতার কাটছে হাঁস। আধাপাকা বাড়িগুলোর পলেস্তারা খসে পড়ছে। পানির কারণে, এই এলাকায় রিকশাও আসতে চায় না।
স্কুলগামী শিশু-কিশোরদের দেখা গেল, তাদের পরনে স্কুলের পোশাক, পিঠে বই-খাতার ব্যাগ; কিন্তু জুতা হাতে। পানি পার হয়ে শুকনায় উঠে তারা জুতা পরে।
চাঁনপুরের মধ্যমপাড়ার ভেতরের একটি বাড়িতে ঢুকে দেখা যায়, এক ঘর থেকে আরেক ঘরে যাবার জন্য মেঝেতে আলগা ইট বিছানো। পানিতে ডুবে থাকা কাঠের আসবাবপত্রের বেশির ভাগের পায়ায় পচন ধরেছে। এই বাড়িটিতে আসতে হলে প্রায় আধা কিলোমিটার পথ পাকা রাস্তার উপর পানি ঠেলে আসতে হয়।
একজন নারী এক শিশুর হাতে-পায়ে চর্মরোগের ক্ষত দেখালেন। বললেন, “এখানে এই রোগে প্রায় সবাই আক্রান্ত। কয়েকদিন পর পর হাঁস-মুরগি মরে ভাসতে থাকে।”
ওই নারী বলেন, “এখন পানির ভয়ে আত্মীয়-স্বজনও আসা ছেড়ে দিয়েছে। এলাকা থেকে বৃষ্টির পানি যাওয়ার সব রাস্তা বন্ধ। একবার বৃষ্টির পানি জমলেই রোদ-বৃষ্টি বারো মাস পানির নিচে থাকে।”
চাঁনপুরের বাসিন্দা কুমিল্লা জিলা স্কুলের শিক্ষার্থী আবিদ হাসান বলেন, “বাসা থেকে স্কুলের জুতা হাতে নিয়ে বের হই। গলি-রাস্তা হেঁটে রিকশায় উঠে জুতা পরি। পায়ে খোস-পাঁচড়া হয়ে গেছে। পানি উঠে আশপাশের দোকানগুলোও খুলে না। বাসার জন্য জিনিস আনতে দূরে যেতে হয়।”
শাহ আলম মজুমদার নামে আরেক বাসিন্দা বলেন, “মানুষজন এই এলাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছে। দোকানপাট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন এই ময়লা পানি ঠেলে আসা যাওয়া- কিভাবে সম্ভব! বাসা থেকে বের হয়ে মসজিদে যেতে হয় ময়লা পানি ঠেলে, স্কুলের জুতা হাতে নিয়ে বাচ্চারা বাসা থেকে বের হয়। কতজন আসলো নিউজ করলো, কিন্তু উপজেলা বা জেলা প্রশাসনের কি নজরে পড়লো না!”
তিনি আরো বলেন, “আমরা ছোটবেলায় দেখেছি, মধ্যমপাড়া মসজিদ থেকে একটু দক্ষিণে নালার মত ছিলো। পানি যেন পুরাতন গোমতীতে পৌঁছায় তার জন্য ড্রেন ছিলো। সব ভরাট হয়ে গেছে। কিছু অসচেতন মানুষের জন্য পুরো এলাকার মানুষ কষ্ট পাচ্ছে। প্রশাসনের কাছে জানাতে জানাতে আমরা হয়রান হয়ে গেছি, এখন জানানোই ছেড়ে দিয়েছি।”

নেপথ্যে ‘প্রভাবশালী চক্র’
একটি জনবহুল এলাকার এমন বেহাল দশা কুমিল্লার সচেতন সমাজ, জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসন সবার জন্য লজ্জাজনক বলে মন্তব্য করেন সমাজকর্মী জহিরুল ইসলাম শান্ত। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “চাঁনপুরবাসী শহরের মধ্যে থেকেও যে মানবেতর জীবনযাপন করছে এর জন্য যে বিষয়গুলো দায়ী সেগুলো তুলে এনে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। পানি নিষ্কাশনের ড্রেনগুলো কেন ভরাট হল এবং কারা ভরাট করল তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। যারা এই এলাকা থেকে পানি নিষ্কাশনের পথে বাঁধ দিয়েছে তাদেরকেও চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা উচিত।”
তিনি আরো বলেন, “প্রশাসন দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্প নেওয়ার আগে বাড়িঘরগুলো থেকে পানি নেমে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। না হয় মানুষ আরো রোগাক্রান্ত হবে। বাড়িঘর, দোকানপাট, রাস্তাঘাট নষ্ট হতেই থাকবে। আর এসবের জন্য দায় প্রশাসনকেও নিতে হবে।”

৫ নম্বর পাঁচথুবী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কাজী তানভীর আহমেদ রাহুল বলেন, “দীর্ঘদিনের এই সমস্যা নিরসনে কয়েকবার উদ্যোগ নিয়েও প্রভাবশালী একটি চক্রের কারণে তা সম্ভব হয়নি। এলাকাটির দুই পাশে পানি অপসারণের রাস্তা বন্ধ হয়ে থাকায় এই সমস্যা। তবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমাদের এখন নির্দেশনা দিয়েছেন, আমরা সে মোতাবেক দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
তিনি আরো বলেন, “মানুষের ভোগান্তি আমাদের সব সময় কষ্ট দেয়। কিন্তু কিছু কিছু সময় আমরা সঠিক নির্দেশনা পাই না এবং সুদৃষ্টি পাই না বিধায় এসব সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হয়। চাঁনপুর এলাকার অন্তত ৩০ হাজার মানুষ এই জলাবদ্ধতার ভুক্তভোগী।”
কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাতেমা তুজ জোহরা বলেন, “আমরা উপজেলার যেসব এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয় সেসব এলাকাগুলোর তালিকা করছি- সে জায়গাগুলোতে কী কী ব্যবস্থা নিতে হবে তার জন্য উপজেলা প্রকৌশলীকে পরিদর্শন করে জানানোর জন্য বলা হয়েছে।”