Published : 01 Nov 2022, 06:32 PM
অতীতের ‘রেকর্ড ভেঙে’ চলতি বছর সর্বোচ্চ সংখ্যক মা ইলিশ ডিম ছেড়েছে বলে এক গবেষণায় উঠে এসেছে।
গত বছরের চেয়ে দশমিক ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে এবার ৫২ শতাংশ মা ইলিশ ডিম ছেড়েছে বলে চাঁদপুরের মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের এই গবেষণায় জানা গেছে।
ইনস্টিটিউটের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ আশরাফুল আলম জানান, বিভিন্ন নদ-নদীতে তিনটি ধাপে চালানো গবেষণার ফলাফল বিশ্লেষণ করে এই ফলাফল পেয়েছেন তারা।
জেলে ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, আগামী জাটকা অভয়াশ্রম কর্মসূচি সফলভাবে সম্পন্ন করা গেলে আগামীতে রেকর্ড পরিমাণ ইলিশ উৎপাদন হবে দেশে।
মঙ্গলবার (১ নভেম্বর) থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত আট মাস দেশের কোনো স্থানে জাটকা ইলিশ ধরা যাবে না। তবে এ সময় জাটকার (১০ ইঞ্চি লম্বা) চেয়ে বড় আকারের ইলিশ ধরা যাবে।
ইলিশ গবেষক আশরাফুল আলম জানান, আশ্বিনের অমাবস্যা ও ভরা পূর্ণিমাকে কেন্দ্র করে মা ইলিশ প্রচুর ডিম পাড়ে। প্রজননের প্রধান এই সময়টাতে পরিভ্রমণ স্বভাবের ইলিশ মাছ সাগর ছেড়ে মোহনা ও নদীর মিঠা পানিতে ছুটে আসে।
ইলিশের ডিমের পরিপক্বতা ও প্রাপ্যতা এবং আগের গবেষণার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এ বছর ৭ অক্টোবর থেকে ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিন দেশের ৬টি অঞ্চলের নদ-নদীতে অভয়াশ্রম কর্মসূচি ঘোষণা করা হয় বলে জানান তিনি।

“অনুকূল পরিবেশ ও অভয়াশ্রমে প্রশাসনের তৎপরতার কারণে এ বছর রেকর্ড ৫২ শতাংশ ইলিশ ডিম ছেড়েছে; গত বছর যা ছিল ৫১.৭ শতাংশ।”
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের চাঁদপুর নদী কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান ও আবু কাউসার দিদার জানান, কিছু অসাধু জেলে কর্তৃক ইলিশ নিধন হলেও অনুকূল পরিবেশ পাওয়ায় প্রচুর পরিমাণে মা ইলিশ ডিম ছাড়ার সুযোগ পেয়েছে।
মনিরুজ্জামান বলেন, “আমরা নিষেধাজ্ঞার আগের সাত দিন, নিষিদ্ধকালীন ২২ দিন এবং এর পরবর্তী সাত দিন বিভিন্ন নদী-নদীতে গবেষণা চালিয়ে প্রচুর পরিমাণে ইলিশের লার্ভা ও জাটকা পেয়েছি। তাছাড়া আমাদের জালে ধরা পড়া অধিকাংশ ইলিশের পেটে ডিম দেখতে পাইনি।”
পানিতে পর্যাপ্ত পরিমাণ ইলিশের খাদ্য উপাদান রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আগামীতে জাটকাকে সুরক্ষা দিতে পারলে ইলিশ উৎপাদন সকল রেকর্ড ছাড়াবে।”
চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলার চরভৈরবী এলাকার জেলে হাবু ছৈয়াল বলেন, “এবার নদীতে প্রচুর মা ইলিশ ডিম ছেড়েছে। আশা করি, সামনে নদীতে বেশি করে ইলিশের দেখা পাওয়া যাবে।”
আরেক জেলে আবুল কাশেম বলেন, “এবার মা ইলিশ রক্ষায় নিষেধাজ্ঞার সময় অনেক অসাধু জেলে মাছ ধরেছে। আগামীতে এ ব্যাপারে সতর্ক থাকলে অনেক মা ইলিশ রক্ষা পাবে।”
ইলিশ গবেষক আশরাফুল আলম জানান, সঠিক সময়ে অভয়াশ্রম পালিত হওয়ার পাশাপাশি ঝড়, বৃষ্টিপাত এবং নদীতে প্রশাসনের কড়া নজরদারির কারণে ডিম ছাড়ায় এ রেকর্ড হয়েছে।
তিনি জানান, এ বছর ৮ লাখ ৫,৫১৫ কেজি ডিম ছেড়েছে মা ইলিশ। এই ডিমের যদি ৫০ শতাংশ ফোটে এবং ১০ ভাগ টিকানো যায়, আগামী মৌসুমে নতুন করে অন্তত ৪০ হাজার ২৭৬ কোটি জাটকা ইলিশে পরিণত হবে। তবে সারা বছরই কম-বেশি ডিম ছাড়ায় কিছু ইলিশের পেটে এখনও ডিম পাওয়া যাচ্ছে।
তিনি জানান, নদীতে ছাড়া ডিম ফুটে দুই থেকে আড়াই মাসের মধ্যে জাটকায় পরিণত হবে। এই সময়টাতে পোনা প্রতি মাসে দুই থেকে আড়াই সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পায়।
“মার্চ-এপ্রিল জাটকা মৌসুমে সঠিকভাবে সুরক্ষা দিতে পারলে আগামীতে ইলিশের উৎপাদন প্রায় ৬ লাখ মেট্রিক হবে বলে আশাকরি। এর জন্য জেলেদের নদী থেকে জাটকা ধরা থেকে বিরত রাখতে হবে।”
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের চাঁদপুর নদী কেন্দেল দেওয়া তথ্য মতে, ২০১৬ সালে ৪৩.৪৫ শতাংশ, ২০১৭ সালে ৪৬.৪৭ শতাংশ, ২০১৮ সালে ৪৭.৭৫ শতাংশ, ২০১৯ সালে ৪৮.৯২ শতাংশ, ২০২০ সালে ৫১.২ শতাংশ এবং ২০২১ সালে ৫১.৭ শতাংশ মা ইলিশ ডিম ছাড়ার সুযোগ পেয়েছে। চলতি বছর ডিম ছেড়েছে ৫২ শতাংশ, যা গত বছরের তুলনায় দশমিক ৩ শতাংশ বেশি।
মৎস্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য মতে, দেশে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৩.৮৮ লাখ মেট্রিক টন, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৩.৯৫ লাখ মেট্রিক টন, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৪.৯৭ লাখ মেট্রিক টন, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৫.১৭ লাখ মেট্রিক টন, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৫.৩৩ লাখ মেট্রিক টন, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৫.৫ লাখ মেট্রিক টন ইলিশ উৎপাদিত হয়েছে। গত ২০২০-২১ অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছে ৫.৬৫ লাখ মেট্রিক টন।
চাঁদপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. গোলাম মেহেদী হাসান বলেন, অভয়াশ্রমের সময়টাতে চাঁদপুরের ৪৪ হাজার ৩৫ জন জেলেকে ২৫ কেজি করে চাল সহায়তা দেওয়া হয়েছে। নিষেধাজ্ঞার ২২ দিনে মোট ৩৮৯টি অভিযানে ৬১৫ জন জেলেকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ সময় ৪৪ লাখ ৮৬ হাজার মিটার কারেন্ট জাল ও আড়াই টনের অধিক ইলিশ জব্দ করা হয়।
তিনি আরও বলেন, এ বছর অভিযান সফল হওয়ায় রেকর্ড সংখ্যক মা ইলিশ ডিম ছেড়েছে নদীতে। আগামীতে জাটকা সংরক্ষণে কার্যকর সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। একই সঙ্গে জেলেদের প্রতি আহ্বান থাকবে জাটকা মাছ না ধরার জন্য। এতে করে তারা বড় বড় সাইজের ইলিশ ধরে বেশি পরিমাণে লাভবান হওয়ার সুযোগ পাবে।