Published : 04 Nov 2025, 05:27 PM
রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলায় কোল সম্প্রদায়ের পাঁচ পরিবারের ঘরবাড়ি ভেঙে দেওয়ার পর তাদের ঠাঁই হয়েছে বাঁশঝাড়ে।
আদালতের নির্দেশে গত সোমবার উপজেলার মোহনপুর ইউনিয়নের বাবু ডাইং গ্রামে তাদের বসতভিটা থেকে উচ্ছেদ করা হয়। এখন তারা খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
প্রায় ৭৭ শতক জমিতে এই পরিবারগুলো দুই যুগের বেশি সময় বসবাস করছিলেন। এক্সক্যাভেটর দিয়ে তাদের বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর তারা ঘরের সামান্য কিছু মালামাল রক্ষা করতে পেরেছেন এবং সেগুলো নিয়ে তারা পাশের একটি বাঁশঝাড়ে আশ্রয় নেন।

এ অবস্থায় তাদের অস্থায়ী থাকার ব্যবস্থা এবং পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন গোদাগাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফয়সাল আহম্মেদ।
তিনি বলেন, “বিষয়টি আদালতের রায়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। তবে মানবিক কারণে আমি নিজে গিয়ে দেখেছি। পরিবারগুলো খোলা আকাশের নিচে রয়েছে।
“স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে তাদের অস্থায়ী থাকার ব্যবস্থা করতে বলেছি এবং পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।”

স্থানীয়রা বলছে, ২০২০ সালে নজরুল ইসলাম আলমগীর নামের এক ব্যক্তি এবং তার আত্মীয়-স্বজনেরা জমিটি নিজেদের দাবি করে আদালতে মামলা করেন। বিবাদী করা হয় ওই পরিবারের সদস্য সনাতন সরেনকে। সম্প্রতি সহকারী জজ আদালত বাদীর পক্ষে রায় দেয়।
রায়ের পর জেলা জজ আদালতের নাজির বিশ্বজিৎ ঘোষ, আইনজীবী নাসির উদ্দিন এবং গোদাগাড়ী থানার এসআই আবুল কালামের নেতৃত্বে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয় এবং এক্সক্যাভেটর দিয়ে পাঁচটি বাড়ি ভেঙে ফেলা হয়।

উচ্ছেদ হওয়া রুমালী হাসদা বলেন, ১৯৯৮ সাল থেকে তারা ওই জায়গায় বসবাস করছিলেন। তাদের ধারণা ছিল, জমিটি সরকারি খাসজমি।
পরে তারা জানতে পারেন, ৭৭ শতাংশ জমি তাদের সম্প্রদায়ের তিন জন তিলক মাঝি, দিনু মাঝি ও ভাদু মাঝির নামে রেকর্ডভুক্ত ছিল; যারা এখন আর ওই এলাকায় থাকেন না।

রুমালী অভিযোগ করেন, এই জমির আসল মালিকদের ‘হিন্দু’ দেখিয়ে স্থানীয় মকবুল হোসেন পরে জমিটি নিজের নামে নিবন্ধন করেন। মকবুল মারা যাওয়ার পর তার উত্তরাধিকারী চাঁপাইনবাবগঞ্জের আলমগীর কবির ও আরও কয়েকজন জমির মালিকানা দাবি করে আদালতে মামলা করেন।
এই নারীর দাবি, উচ্ছেদের বিষয়ে তাদের কোনো নোটিস দেওয়া হয়নি; ঘরের জিনিসপত্র ও খাবার মাটির নিচে চাপা পড়ে নষ্ট হয়েছে।
এ ঘটনার পর জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক সুভাষ চন্দ্র হেমব্রম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বলেন, “জাল দলিলের মাধ্যমে আদিবাসী পরিবারগুলোকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। ৪০ বছর ধরে বসবাস করা মানুষদের একদিনে উচ্ছেদ করা অমানবিক।”

প্রতিবাদে মানববন্ধন
কোল সম্প্রদায়ের পাঁচটি পরিবারকে উচ্ছেদের প্রতিবাদে মঙ্গলবার সকালে নগরীর সাহেববাজার জিরোপয়েন্টে ‘জাতীয় আদিবাসী পরিষদের ব্যানারে’ মানববন্ধন হয়।
মানববন্ধনে বক্তারা অবিলম্বে উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর পুনর্বাসন, জমির মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়া এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানান।
জাতীয় আদিবাসী পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি গণেশ মার্ডির সভাপতিত্বে মানববন্ধনে ব্ক্তব্য দেন কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক বিমল চন্দ্র রাজোয়ার, বরেন্দ্র উন্নয়ন প্রচেষ্টার পরিচালক ফয়জুল্লাহ্ চৌধুরী, হাবিবুর রহমান হাসিবুল ও জাতীয় আদিবাসী পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি রাজকুমার শাও।
ভুক্তভোগী রুমালী হাসদা মানববন্ধনেও উপস্থিত ছিলেন। সেখানে তিনি বলেন, আদালতের কোনো নোটিস ছাড়াই তাদের ঘরবাড়ি ভেঙে দেওয়া হয়। ফলে তারা খাট, চেয়ার, টেবিলসহ কোনো আসবাবপত্রই বের করতে পারেননি।