Published : 27 Jul 2025, 03:04 PM
নিম্নচাপ ও অমাবস্যার প্রভাবে প্রচণ্ড উত্তাল রয়েছে সাগর। পাশাপাশি জোয়ারের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে ১ থেকে ৩ ফুট বেশি উচ্চতায় প্রবাহিত হচ্ছে।
এ অবস্থায় কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার সেন্ট মাটিন ও শাহ পরীর দ্বীপের বিভিন্ন অংশের গাছপালা ভেঙে লোকালয়ে জোয়ারের লবণাক্ত পানি প্রবেশ করে প্লাবিত হয়েছে দুইশর বেশি ঘরবাড়ি।
পানি বাড়ার কারণে শঙ্কার মধ্যে দিন কাটচ্ছেন এসব এলাকার বাসিন্দার।
এদিকে বৈরী আবহাওয়ার কারণে টেকনাফ-সেন্ট মার্টিন নৌপথে সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে চারদিন ধরে। এতে খাবারসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের সংকট দেখা দিয়েছে।
সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের (ভারপ্রাপ্ত) চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, “অম্যাবাসর জোয়ারের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে ১-৩ ফুট অধিক উচ্চতায় প্রবাহিত হয়ে দ্বীপের বিভিন্ন অংশের গাছপালা ভেঙে লোকালয়ে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করছে। এতে করে শতাধিক বসতঘর প্লাবিত হয়েছে।
“জোয়ারের ঢেউয়ের আঘাতে ভাঙন দেখা দিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। দ্বীপের চারিদিকে জিও ব্যাগ বা ব্লক ফেলানো না হলে মানচিত্র থেকে সেন্ট মাটিন দ্বীপ হারিয়ে যাবে।”
সেন্টমার্টিনের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ছৈয়দ আলম বলেন, “জোয়ারে দ্বীপের চারিদিকে ভাঙন ধরেছে। বিভিন্ন অংশ দিয়ে জোয়ারের লবণাক্ত পানি লোকায়লে ঢুকে পড়েছে। জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে সেন্টমাটিন রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।”

বৈরী আবহাওয়ার কারণে গত বৃহস্পতিবার থেকে টানা চারদিন ধরে টেকনাফ-সেন্ট মার্টিন নৌপথে যাত্রীবাহী ও মালবাহী ট্রলার চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। দ্বীপে ঝোড়ো হাওয়ার সঙ্গে মাঝারি থেকে ভারি বৃষ্টি হচ্ছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কয়েকটি নৌকা। দুর্ঘটনা এড়াতে মাছ ধরার ট্রলারগুলো জেটির আশপাশে নোঙ্গর করে রাখা হয়েছে।
সেন্ট মার্টিন দ্বীপের বাসিন্দা ও পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মী মোহাম্মদ আজিজ বলেন, “দ্বীপের মাঝরপাড়া, ডেইলপাড়া ও দক্ষিণপাড়া দিয়ে সাগরের উচ্চ জোয়ারের পানি উঠে বিস্তীর্ণ এলাকার গাছপালা ও ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
“এছাড়া দ্বীপের বীজতলা ও চাষাবাদে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়েছে সাগর তীরের কয়েকটি রিসোর্টও। পানির তোড়ে দ্বীপের মাটি ও বালু ক্ষয়ে পড়েছে সাগরে।”
সেন্ট মার্টিন বাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক ইউপি সদস্য হাবিবুর রহমান বলেন, “প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে দ্বীপের মানুষ খাদ্য ও নিত্য প্রযোজনীয় দ্রব্য সংকটে ভুগে আসছিল। এখন নৌযান বন্ধ থাকায় বাজারে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য ফুরিয়ে এসেছে।
“আরও কয়েকদিন এভাবে থাকলে খাদ্যপণ্য এবং টেকনাফ থেকে কোনো খাদ্য পণ্য না পৌঁছালে খাদ্য সংকট দেখা দিবে। এখানকার মানুষের কথা বিবেচনা করে জরুরি ভিত্তিতে সি ট্রাক ও সি অ্যাম্বুলেন্স চালু করার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানাই।”
সেন্ট মার্টিন ট্রলার মালিক সমবায় সমিতির লাইনম্যান আব্দুল করিম বলেন, ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত থাকার কারণে গত বৃহস্পতিবার থেকে রোববার দুপুর পর্যন্ত এ নৌরুটে যাত্রীবাহী ট্রলার চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। আবহাওয়ার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ট্রলার চলাচল শুরু করবে।
সবশেষ গত বুধবার টেকনাফ থেকে নিত্যপণ্য ও যাত্রী নিয়ে তিনটি সার্ভিস ট্রলার সেন্ট মাটিন গেছে বলে টেকনাফ-সেন্ট মার্টিন নৌরুটের সার্ভিস ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি রশিদ আহমদ জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, “দুর্ঘটনার আশঙ্কায় বৃহস্পতিবার থেকে তিনদিন ধরে নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে। ফলে মালামাল আনা-নেওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। দ্বীপবাসী কর্মহীন অবস্থায় আরও দুর্বিষহ সময় পার করছেন।”
সেন্ট মার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের (ভারপ্রাপ্ত) চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, “চারদিন ধরে নৌযান চলাচল বন্ধ। বাজারে খাবারের সংকট দেখা দিয়েছে। সেন্টমার্টিন থেকে পারিবারিক কাজে টেকনাফ ও কক্সবাজার শহরে গিয়ে আটকা পড়েছেন দুই শতাধিক মানুষ।”
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শেখ এহসান উদ্দিন বলেন, “বৈরী আবহাওয়ার কারণে সবধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার নৌযান চালু হবে।”
টেকনাফ উপজেলার সাবরাং ইউনিয়নের শাহপরীর দ্বীপে ৭ নম্বর, ৮ নম্বর ও ৯ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে একটি এলাকা। এই এলাকায় প্রায় ৪০ হাজার মানুষের বসবাস। চারপাশে বঙ্গোপসাগর ও নাফ নদী ঘেরা।
সাগর তীরবর্তী শাহপরীর দ্বীপের গোলাপাড়া, পশ্চিম পাড়া, দক্ষিণপাড়া, ডাঙ্গর পাড়া, মিস্ত্রিপাড়া, বাজারপাড়া ও জালিয়াপাড়া এলাকায় মানুষগুলো বেশি আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন। বাঁধ ভেঙে গেলে পুরো দ্বীপের মানুষ বসতি হারাবে।
শাহপরীর দ্বীপ ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মোহাম্মদ ইসমাইল বলেন, ১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে দ্বীপে পশ্চিম পাশে ১ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ভেঙে গিয়েছিল। সেই ১ কিলোমিটার ভাঙা বাঁধ নির্মাণে ১০ বছরে ৩০০ কোটি টাকা খরচ করে পাউবো। দুর্নীতির কারণে বেড়িবাঁধ হয়ে ওঠেনি।
তিনি বলেন, ওই সময়ের জলোচ্ছ্বাসে শাহপরীর দ্বীপের প্রায় ১০ হাজার একরের চিংড়ির ঘের ও ফসলি জমি সাগর গর্ভে তলিয়ে গেছে। বিলীন হয়েছে মসজিদ-মাদ্রাসাসহ অন্তত চার হাজার ঘরবাড়ি। প্রায় তিন বছর আগে ১৫১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বেড়িবাঁধটির সিসি ব্লক ধসে পড়ার ঘটনায় দ্বীপের লোকজন আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন।
গত তিনদিন ধরে বেড়িবাঁধ টপকে পানি গ্রামে প্রবেশ করাই এলাকার মানুষ আরও আতঙ্কে রয়েছেন বলে জানান তিনি।

শাহপরীর দ্বীপ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কলিম উল্লাহ বলেন, “সাগর তীরবর্তী এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) তত্ত্বাবধানে ২০২২ সালের জুন মাসে ১৫১ কোটি টাকার খরচ করে শাহপরীর দ্বীপের পশ্চিম ও দক্ষিণ পাশে প্রায় ৩ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়।
“নির্মাণের কিছু দিনের মধ্যেই বাধের সিসি ব্লকগুলো ধসে পড়ে। এতে দ্বীপের মানুষ আতঙ্কে রয়েছে রয়েছে। দ্রুত সংস্কার ও টেকসই বেড়িবাঁধ পুনঃনির্মাণের জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানাই।”
সাবরাং ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আবদুল মান্নান বলেন, “দক্ষিণপাড়া অংশে যেখানে সাগরের আগ্রাসন বেশি, সেখানে এসে তাড়াহুড়া করে কাজ শেষ করায় বাঁধের কাঠামো দুর্বল হয়েছে। যে কারণে কিছু দিনের মাথায় ব্লকগুলো ধসে পড়ছে।
“আর এখন বর্ষা মৌসুমে বাঁধের উপর দিয়ে জোয়ারের পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ার পাশাপাশি বাঁধটি বিলীন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পুরো এলাকার মানুষ আতঙ্কে রয়েছে।”
টেকনাফ উপজেলা জ্যৈষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা ও সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, “দ্বীপের পশ্চিম ও দক্ষিণ পাশের বেড়িবাঁধের উপর দিয়ে দুই একদিন ধরে জোয়ারের পানি বেড়িবাঁধ টপকে লোকালয়ে প্রবেশ করায় এলাকার মানুষের আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। সাগরের লবণাক্ত পানিতে কিছু ফসলি জমিন নষ্ট হয়ে গেছে। অন্তত একশ বাড়িঘরে পানি প্রবেশ করেছে।”
পানি উ্ন্নয়ন বোর্ড পাউবো টেকনাফের উপসহকারী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান বলেন, জোযারের পানি বেড়ে বাঁধ টপকে লোকালয়ে প্রবেশের বিষয়টি ঊর্ধতন কর্তপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। শাহপরীর দ্বীপের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় অল্প দিনের মধ্যে সংস্কারের কাজ শুরু হবে।