Published : 16 Jul 2026, 11:59 AM
এনসিপির পদযাত্রাকে ঘিরে গোপালগঞ্জে হামলা-সংঘর্ষে পাঁচজন নিহত হওয়ার বর্ষপূর্তিতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে জেলায় সতর্ক অবস্থায় আছে আইনশৃংখলা রক্ষাবাহিনী। তবে মানুষের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক আছে।
এর মধ্যে বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৯টায় শহরের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম সংলগ্ন পুনঃনির্মাণাধীন ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে’ জুলাই শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে প্রশাসন।
এ সময় গোপালগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য ডা. কে এম বাবর, জেলা প্রশাসক মো. আরিফ-উজ-জামান, পুলিশ সুপার মো. হাবীবুল্লাহ, জেলা পরিষদের প্রশাসক শরীফ রফিকুজ্জামানসহ প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
গোপালগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. হাবীবুল্লাহ বলেন, গোপালগঞ্জকে অন্য জেলার থেকে আলাদাভাবে দেখা হচ্ছে না। গোপালগঞ্জের মানুষ শান্তিপ্রিয়, তাই ১৬ জুলাইও জেলার আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে।
২০২৫ সালের এই দিনে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ‘মার্চ টু গোপালগঞ্জ’ কর্মসূচি ঘোষণা করে। এ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে গোপালগঞ্জে আইনশৃংখলা রক্ষা বাহিনীর সাথে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও সহযোগি সংগঠনের নেতাকর্মীদের দফায়-দফায় সংঘর্ষে ৫ জন নিহত হয়।
এ দিন এনসিপির সমাবেশ স্থল, জেলা প্রশাসকের বাসভবন, পুলিশ সুপারের কার্যালয়, জেলা কারাগারে হামলা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এছাড়া সমাবেশ স্থলে অগ্নিসংযোগ করা হয়। ভাঙচুর করা হয় শহরের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম সংলগ্ন জুলাই স্মৃতি স্তম্ভ। পরিস্থিতি সামাল দিতে জেলা প্রশাসন ১৪৪ ধারার পাশাপাশি কারফিউ জারি করে।
উদ্ভুত পরিস্থিতিতে এনসিপি নেতৃবৃন্দ পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আশ্রয় নেন। পরে সেনা বাহিনীর এপিসিতে করে কঠোর নিরাপত্তর মধ্যে তারা ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। এরপর সন্ধ্যা ৬ টার দিকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করে।

এসব ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে গোপালগঞ্জ, কোটালীপাড়া, কাশিয়ানী ও টুঙ্গিপাড়া থানায় পৃথক ১৫টি মামলা করে। এসব মামলায় এজাহারনামীয় ১ হাজার ১৫ জন আওয়ামী লীগ এবং সহযোগি সংগঠনের নেতা কর্মীকে আসামি করা হয়েছে। এছাড়া অজ্ঞাত আসামি রয়েছেন ১৪ হাজার ৭৬০ জন ।
এ পর্যন্ত পুলিশ ৪৪১ জনকে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে জেলা কারাগারের পাঠিয়েছে।
এক বছর পর দিনটিকে কেন্দ্র করে গোপালগঞ্জের সাধারণ মানুষের মধ্যে চাপা আতঙ্ক থাকলেও জনজীবন স্বাভাবিক আছে।
শহরের ভ্যান চালক জমির উদ্দিন (৫৫) বলেন, “আমরা দিন আনি দিন খাই। গত বছরের গণ্ডগোলের পর অনেক দিন ভ্যান চালাতি পারি নেই। সংসার চালাতি কষ্ট হইছে। ইবার আবার ১৬ জুলাই পুলিশ, বিজিজি দেখতিছি। আবার কিছু হবে নাকি? ভয় করে।”
দিনমজুর এনাম শেখ বলেন, “১৬ জুলাইর মতন অবস্থা আমরা চাইনে। ভয়ে ১৫/২০ দিন বাড়ি ঘুমাতি পারি নেই। এহন আবার ১৬ জুলাই আইছে। ফেসবুকে মিছিল দেখতিছি। কি হয় জানিনে। তয় আমরা অশান্তি চাইনে।”
বাস শ্রমিক দেলদার হোসেন বলেন, “নিরাপত্তা দিতি বিজিবি আইছে। পুলিশ কাজ করতিছে। আমাগে গাড়ি চালানোর কাজ আমরা চালায় যাতি চাই। এ জুন্নি সরকারের কাছে নিরাপত্তা চাচ্ছি। নাশকতা না হলি ভাল হয়। তারপরও অজানা আতংকের মধ্যি আছি।”

এদিকে, ১৬ জুলাইকে ‘গণহত্যা দিবস’ আখ্যা দিয়ে এবং আহত-নিহতদের স্মরণে মঙ্গলবার ঢাকা-খুলনা মহা সড়কের গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার তিলছাড়া বিক্ষোভ মিছিল করে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা।
এ সময় মিছিল প্রতিহত করতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা। রাতইল ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মো. নান্নান খাকীর মোটরসাইকেল ভাঙচুর ও আগুন দেয় বিক্ষোভকারীরা।
পরে এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
এ ব্যাপারে কাশিয়ানী থানার ওসি মুহাম্মদ মাহফুজুর রহমান বলেন, “মহাসড়কে বিশৃঙ্খলা ও হামলার ঘটনায় এর মধ্যেই ছাত্রলীগের ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। অন্যদের গ্রেপ্তারে পুলিশী অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”
দিনটিকে ঘিরে জেলার নিরাপত্তা জোরদার করেছে আইনশৃংখলা বাহিনী। বুধবার থেকে গোপালগঞ্জে ৫ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। বিজিবির সদস্যরা টহল শুরু করেছেন। তাদের সঙ্গে র্যাব ও পুলিশ যৌথভাবে টহল দিচ্ছে।
শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে বসানো হয়েছে চেকপোস্ট। পাশাপাশি সাদা পোশাকেও দায়িত্ব পালন করছেন বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা।

গোপালগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. আরিফ-উজ-জামান বলেন, “১৬ জুলাই ও ১৫ অগাস্টকে কেন্দ্র করে জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিজিবি মোতায়েনের জন্য অনুরোধ করে চিঠি দেওয়া হয়। সেই চিঠির প্রেক্ষিতেই গোপালগঞ্জে ৫ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক আরও বলেন, “শুধু ১৬ জুলাই বা ১৫ আগস্ট নয় জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিরতি দিয়ে দিয়ে বিজিবি মোতায়ন করা হবে সেটি আইনশৃঙ্খলা ও মনিটরিং কমিটিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এটি আমাদের রুটিন কাজেরই অংশ। ”
গোপালগঞ্জের পুলিশ সুপার হাবীবুল্লাহ বলেন, গত বছরের ১৬ জুলাইয়ের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ১৫টি মামলা হয়েছে। তদন্ত শেষে এ ঘটনায় যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হবে। নির্দোষ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে না।
আরও পড়ুন-
সেই ১৬ জুলাইয়ের আগে গোপালগঞ্জে নামল ৫ প্লাটুন বিজিবি
সুরতহাল, ময়নাতদন্ত ছাড়াই গোপালগঞ্জে নিহতদের দাফন-সৎকার
সাঁজোয়া যানে করে পুলিশ সুপারের কার্যালয় ছাড়লেন এনসিপি নেতারা
এনসিপির সমাবেশ ঘিরে হামলা-সংঘর্ষে গোপালগঞ্জ রণক্ষেত্র, ১৪৪ ধারা