Published : 16 Jul 2026, 12:38 PM
বিশ্বের বহু দেশে এখন চীনকে বেশি ইতিবাচকভাবে দেখা হয় বলে পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক গবেষণায় উঠে এসেছে।
বিবিসি লিখেছে, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অরাজনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির এবারই প্রথম এমন ফল পেয়েছে।
জরিপের ফল বলছে, অনেক দেশেই চীনের প্রতি ইতিবাচক বা ভালো ধারণা পোষণের হার রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে; অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি মানুষের ধারণা আগের চেয়ে আরও খারাপ হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের প্রতি মানুষের আস্থা কমেছে। তবে দুজনের মধ্যে তুলনা করলে, ট্রাম্পের চেয়ে শি জিনপিংয়ের ওপর মানুষের আস্থা কিছুটা বেশি।
মানুষ মনে করে, ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র এখনো চীনের চাইতে বেশি সম্মান দেখায়; আবার অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানোর ক্ষেত্রেও চীনের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে আছে।
পিউ গত ফেব্রুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ৩৬টি দেশে ৪২ হাজার মানুষের ওপর এ জরিপ পরিচালনা করে।

জরিপে অংশগ্রহণকারীদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, এই দুই পরাশক্তি দেশের প্রতি তাদের মনোভাব কেমন? খুব ইতিবাচক, কিছুটা ইতিবাচক, কিছুটা নেতিবাচক, নাকি খুব নেতিবাচক?
গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি দেখতে পেয়েছে, যে ৩৬টি দেশে জরিপ করা হয়েছে, তার মধ্যে ২৫টি দেশেই যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে চীনের প্রতি বেশি মানুষের ইতিবাচক বা ভালো ধারণা রয়েছে।
এ গবেষণার অন্যতম গবেষক জোনাথন শুলম্যান বলেন, পরাশক্তিদের প্রতি মানুষের মনোভাব ২০০২ সাল থেকে পর্যবেক্ষণ করে আসছে পিউ। তবে এবারই প্রথম এত বেশি দেশে চীনের পক্ষে এমন ফল দেখা গেল।
বিবিসি লিখেছে, পিউ রিসার্চ সেন্টার এর আগেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি মানুষের ইতিবাচক ধারণা প্রশ্নে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখেছিল। যেমন ২০০৮ সালে জর্জ বুশের প্রশাসনের শেষ সময়ে এবং ২০১৭ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের শুরুতে।
তবে সেই সময়েও চীন নিয়ে ইতিবাচক ধারণা পোষণকারীর হার যুক্তরাষ্ট্রের সমান কিংবা কিছুটা নিচেই ছিল বলে জানিয়েছেন গবেষক শুলম্যান।
চীনকে বেশি পছন্দ করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দেখা গেছে স্পেন, ইন্দোনেশিয়া, ইতালি, গ্রিস ও কানাডায়।
মাত্র ছয়টি দেশ এখনো যুক্তরাষ্ট্রকে বেশি পছন্দ করে, যার বেশিরভাগই যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র— পোল্যান্ড, ফিলিপিন্স, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, জাপান ও ইসরায়েল।
গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি আলাদাভাবে দেখতে পেয়েছে, গড় হিসাবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ২০টি দেশে—যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব ধারাবাহিকভাবে কমেছে; অন্যদিকে চীনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব দিন দিন বাড়ছে।

যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের উপাত্তের ওপর ভিত্তি করে গবেষকরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জরিপ করা এক-তৃতীয়াংশের বেশি দেশে চীনের প্রতি ইতিবাচক ধারণা পোষণকারীর সংখ্যা বেড়েছে।
বিবিসি লিখেছে, এ বছর জরিপ করা বেশ কিছু দেশে চীনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে; যার মধ্যে ইতালি, স্পেন, কলম্বিয়া, মেক্সিকো, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া ও তুরস্ক অন্যতম।
গবেষকরা সার্বিকভাবে দেখতে পেয়েছেন, চীনের প্রতি যেখানে মধ্য আয়ের দেশগুলোর মানুষের ইতিবাচক মনোভাব রয়েছে, সেখানে ধনী দেশগুলোর মানুষের মধ্যে রয়েছে নেতিবাচক মনোভাব।
এর মধ্যে ব্যতিক্রম দেখা গেছে সিঙ্গাপুরে, জরিপ করা দেশগুলোর মধ্যে সেখানে মাথপিছু জিডিপি সর্বোচ্চ হলেও দেশটির মানুষের মধ্যে চীনের প্রতি উচ্চমাত্রার ইতিবাচক মনোভাব দেখা গেছে।
বিবিসি লিখেছে, জরিপে চীনের প্রতি সবচেয়ে বেশি ইতিবাচক এবং সবচেয়ে বেশি নেতিবাচক—উভয় ধরনের মতামতই এসেছে এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে। যেমন পাকিস্তানের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ চীনকে পছন্দ করে, আর জাপানিদের ক্ষেত্রে এই হার মোটে ১১ শতাংশ।
শি ও ট্রাম্প
জরিপে অংশ নেওয়া মানুষদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, বৈশ্বিক রাজনীতির ক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রশ্নে শি জিনপিং ও ডনাল্ড ট্রাম্পের ওপর তাদের আস্থা আছে কি না।
সার্বিকভাবে দুই নেতার প্রতিই মানুষের আস্থার হার বেশ কম দেখা গেছে; বেশিরভাগ দেশেই এ হার ৫০ শতাংশের নিচে। তবে জরিপ করা অনেক দেশেই ট্রাম্পের চেয়ে শি জিনপিংয়ের প্রতি মানুষের আস্থা বেশি দেখা গেছে।
জরিপে শি জিনপিংয়ের সবচেয়ে বেশি এবং সবচেয়ে কম রেটিং এসেছে পাকিস্তান ও জাপান থেকে; পাকিস্তানে এ হার যেখানে ৮৩ শতাংশ, সেখানে জাপানে মাত্র ৭ শতাংশ মানুষ শির ওপর আস্থা রাখেন।
অন্যদিকে ট্রাম্প সর্বোচ্চ রেটিং পেয়েছেন ফিলিপিন্সে, ৬৮ শতাংশ; সবচেয়ে কম রেটিং পেয়েছেন পূর্ব জেরুজালেমে, মাত্র ৪ শতাংশ।
গবেষক শুলম্যান বলেন, তাদের জরিপে দেখা গেছে, সাধারণত অন্য নেতাদের মত শি জিনপিংয়ের ব্যাপারে মানুষের প্রতিক্রিয়া অতটা তীব্র (ইতিবাচক বা নেতিবাচক) নয়।
অন্যদিকে ট্রাম্পের ক্ষেত্রে মানুষ মতামত দিতে বেশ আগ্রহী ছিল এবং তাদের মতামতগুলো ছিল চরম পর্যায়ের অর্থাৎ, হয় তাকে খুব বেশি পছন্দ করেন অথবা তীব্র ঘৃণা করেন।
জরিপে উঠে এসেছে, চীনের তুলনায় মার্কিন সরকার মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে বেশি শ্রদ্ধা করে বলেএখনো বিশ্বাস করে বেশিরভাগ মানুষ। তবে আগের তুলনায় ব্যবধান কমে এসেছে।
পরাশক্তিগুলোর পররাষ্ট্র নীতি নিয়ে মনোভাব জানতে পিউ মধ্য আয়ের কয়েকটি দেশে অতিরিক্ত প্রশ্ন রেখেছিল।
গড়ে ৭৫ শতাংশ মানুষ মনে করে, যুক্তরাষ্ট্র অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ‘প্রচণ্ড’ বা ‘বেশ ভালো রকমের’ হস্তক্ষেপ করে; যেখানে চীনের ক্ষেত্রে এই হার ৪৫ শতাংশ।
‘যুক্তরাষ্ট্রের খামখেয়ালি নীতিতে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ’
বিবিসি লিখেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অন্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোও একই ধরনের গবেষণা করেছে।
জরিপকারী প্রতিষ্ঠান গ্যালপ দেখেছে, গত বছর বৈশ্বিক জনপ্রিয়তার রেটিংয়ে চীন যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে গেছে এবং ২০ বছরের মধ্যে চীনের পক্ষে সবচেয়ে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা প্রতিষ্ঠান এশিয়া সোসাইটির বার্ষিক জরিপ বলছে, কোভিডের সময়ে চীনের ভাবমূর্তি যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, মহামারী শেষে তা খুব সামান্যই পুনরুদ্ধার হয়েছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘কার্নেগি চায়না’র অনাবাসিক স্কলার চং জা ইয়ান বলেন, পিউ রিসার্চের এই সাম্প্রতিক ফল ‘মোটেও আশ্চর্যজনক নয়’।
তিনি বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের নীতি বা সিদ্ধান্তের যে হুটহাট পরিবর্তন, যার মধ্যে সামরিক শক্তি প্রয়োগ এবং এর কারণে হওয়া অর্থনৈতিক ক্ষতি বিশ্বের বহু দেশের মানুষকে চরম দুশ্চিন্তা ও আশঙ্কার মধ্যে ফেলে দিয়েছে।”
বিবিসি লিখেছে, পিউ রিসার্চের এ জরিপটি এমন এক সময়ে শুরু হয়েছিল, যার কিছুদিন আগেই ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত করার ব্যাপারে কড়া বক্তব্য দিয়েছিলেন এবং যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে বন্দি করেছিল। জরিপ চলাকালেই ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র।
ড. চং বলেন, “চীন সামগ্রিকভাবে কতটা জনপ্রিয় তা নিয়ে প্রশ্ন থাকতেই পারে, তবে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে চীনকে অনেক বেশি স্থিতিশীল মনে হচ্ছে। তাছাড়া বেইজিং বিশ্বজুড়ে, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে নিজের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার জন্য কাজ করছে।”
চীনের প্রতি উচ্চ ইতিবাচক মনোভাব থাকার পরও শি জিনপিংয়ের প্রতি মানুষের আস্থা কেন কম—এর ব্যাখ্যায় ড. চং বলেন, চীনকে হয়ত কিছুটা স্থিতিশীল মনে হওয়ায় মানুষ স্বস্তি পাচ্ছে, কিন্তু এই সত্য তো আর মুছে ফেলা যাবে না যে শি জিনপিং একজন বড় স্বৈরশাসক।
‘কার্নেগি চায়না’র এ গবেষক বলেন, শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বে চীন এখন আরও বেশি আক্রমণাত্মক ও আগ্রাসী। এর অন্যতম নমুনা হল—বাকি বিশ্বকেও চীনের বিশ্বভাবনার সঙ্গে একমত হতে বাধ্য করা। তাছাড়া সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীর প্রতি তাদের আচরণ নিয়ে এখনো বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে।
ড. চং বলেন, “আমার মনে হয়, চীনের সবধরনের জোরজুলুম এবং অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিকর নীতিগুলোর জন্য ব্যক্তিগতভাবে শি জিনপিংকে দায়ী করে মানুষ; আর চীনের যত ইতিবাচক দিক রয়েছে, যেমন তাদের প্রযুক্তিগত উন্নতি—সেগুলোকে সামগ্রিকভাবে দেশটির সাফল্য হিসেবে দেখে।”