রানিকে যেমন দেখেছিলেন বৈরাগীরচালার রোকেয়া-সালেহা

চার দশক আগে গাজীপুরের গ্রামটিতে গিয়েছিলেন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ; অনেকের মনে এখনও উজ্জ্বল সেই স্মৃতি।

আবুল হোসেনগাজীপুর প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 10 Sept 2022, 08:18 AM
Updated : 10 Sept 2022, 08:18 AM

রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের সঙ্গে বসে গল্প করেছিলেন গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বৈরাগীরচালা গ্রামের রোকেয়া বেগম; ভাষা না বুঝলেও রানির সারল্যে মন ছুঁয়েছিল তার।

আর রানি যেন বৈরাগীরচালায় বার বার আসতে পারেন, প্রতীকী হিসেবে তাকে রুপার চাবি উপহার দেওয়ার গল্প বললেন একই গ্রামের সালেহা আক্তার।

ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ গত বৃহস্পতিবার মারা গেলে আবার আলোচনায় উঠে আসে বৈরাগীরচালা; চার দশক আগে বাংলাদেশে এসে যে গ্রামটি ঘুরে দেখেছিলেন তিনি।

রানিকে নিয়ে স্মৃতিচারণে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে রোকেয়া বলেন, “রানিকে আমরা দেখেছি; তার সঙ্গে বসে গল্প করেছি। তার কথা আমরা বুঝিনি, তবে তার সঙ্গে থাকা লোকজন আমাদের বুঝিয়ে দিতেন। আমাদের ভাগ্য, আমরা ব্রিটেনের রানিকে খুব কাছ থেকে দেখতে পেয়েছি। রানি পুকুর ঘুরে দেখেন, পুকুরের পাশে স্থাপিত কুঁড়েঘর তিনি বসেছিলেন।

“পুকুরের পাড়ে ছিল কুটির শিল্প, তাঁতশিল্প, পোল্ট্রি ফার্ম। সেখানে ধান থেকে ঢেঁকি দিয়ে চিড়া ও চাল তৈরি কার্যক্রম দেখেছেন রানি। তিনি পুকুরে মাছ অবমুক্ত এবং মাছ ধরা দেখেছেন। সেদিন জেলেরা মাছ ধরার এক পর্যায়ে একটি বড় কাতল মাছও পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা রানির পায়ের কাছে লাফিয়ে পড়ে।”

মাছ লাফিয়ে ওঠার দৃশ্যসহ সেদিন হাতে ভাজা মুড়ি বানানো, গ্রামীণ শিল্পের নানা ধরনের উপকরণ তৈরির নমুনা দেখে রানি ‘অভিভূত’ হয়েছিলেন বলে জানান ৬০ বছরের এ গৃহিনী।

বৈরাগীরচালা গ্রামের গৃহিনী ৭০ বছর বয়সী সালেহা আক্তার বলেন, “গ্রামের কাঁঠাল বাগানে বসে স্থানীয় নারীদের সঙ্গে গল্প করেন রানি। এ গ্রামের পক্ষ থেকে প্রতীকী হিসেবে রানির হাতে একটি রুপার চাবি তুলে দেওয়া হয়েছিল। এর অর্থ হচ্ছে, যে কোনো সময় রানি বৈরাগীরচালা গ্রামে আসতে পারবেন। তার জন্য গ্রামের সব দরজা সর্বদা খোলা।”

১৯৮৩ সনের ১৬ নভেম্বর গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বৈরাগীরচালা গ্রামে স্বনির্ভর গ্রামের চিত্র দেখতে এসেছিলেন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ। সে সময় তার আগমন উপলক্ষে গ্রামটিতে বিদ্যুৎ আসে, নির্মাণ হয় নতুন ভবন এবং অবকাঠামো।

রানি ঢাকা থেকে বলাকা কমিউটার ট্রেনে শ্রীপুর নামেন। পরে সেখান থেকে গাড়িতে করে তিন কিলোমিটার দূরে বৈরাগীরচালা গ্রামে আসেন। সেখানে লাল গালিচা ও ফুলেল সংবর্ধনা দেন গ্রামবাসী।

সেদিন থেকে রানিকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণে রাখা এ গ্রামের মানুষ তার মৃত্যুতে শোকাহত হয়েছেন। রানি না থাকলেও, রানির স্মৃতি এখনও বেঁচে আছে তাদের মনে।

রানির আগমনের পর বৈরাগীরচালা গ্রামটির আলোচিত হওয়ার কথা বলেন ওই গ্রামের বাসিন্দা ও শ্রীপুর পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. শফিকুল ইসলাম।

তিনি বলেন, “রানি এলিজাবেথের আগমন উপলক্ষে শ্রীপুরের বৈরাগীরচালা গ্রামে বিদ্যুতের ছোঁয়া লাগে। শ্রীপুর থেকে বৈরাগীরচালা সড়কটি পাকা করা হয়। শ্রীপুর রেলস্টেশন প্ল্যাটফরমটি পাকা করা হয়। উপজেলা পরিষদ ও হাসপাতালের নতুন ভবন এবং অবকাঠামো নির্মিত হয়। বৈরাগীরচালা স্কুলের পাশে থাকা পুকুরটিতে মাছ ছাড়া হয়। পুকুরের পাড়ে নির্মাণ করা হয় পোল্ট্রি ফার্ম, গবাদিপশু প্রজনন কেন্দ্র, হস্ত ও কারুশিল্প তৈরির প্রতিষ্ঠান, একটি ব্যাংক, পোস্ট অফিস ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র। তাছাড়া ঢেঁকিতে চাল-চিড়া তৈরির ব্যবস্থা ও মুড়ি ভাজাসহ আত্মকর্মসংস্থানের আয়োজন করা হয়।

“মোট কথা রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের আগমন উপলক্ষে তখন শ্রীপুরকে তথা বৈরাগীরচালা গ্রামকে নতুন করে সাজানো হয়। বৈরাগীরচালা গ্রামটি আদর্শ গ্রাম হিসেবে দেশে বিদেশের বিভিন্ন মিডিয়ায়ও স্থান পায়; আলোচনায় আসে।”

শফিকুল বলেন, বৈরাগীরচালা গ্রামের মানুষের কাছে রানির পরিচিতি ছিল একটু ভিন্নভাবে। রানির আগমন উপলক্ষে ১৯৮৩ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের শাসনামলে বৈরাগীরচালা গ্রামটি স্বনির্ভর গ্রাম হয়ে উঠে। ওই বছরের ১৬ নভেম্বর থেকে গ্রামবাসী স্বনির্ভর গ্রাম হিসেবে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করতেন এবং এখনও তা করেন।

রানির মৃত্যুর সংবাদ শুনে তার স্মৃতিবিজড়িত বৈরাগীরচালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও বৈরাগীরচালা উচ্চ বিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ শুক্রবার বিকালে কালো পতাকা উত্তোলন করে শোক প্রকাশ করেছে বলে জানান এ শিক্ষক।

ওই সময়ের স্মৃতিচারণে শফিকুল বলেন, রানি যখন এসেছিলেন, তিনি তখন শ্রীপুর সরকারি পাইলট হাইস্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। রানির আগমনের দিন তাদের স্কুলসহ আশেপাশের অন্য স্কুল থেকে ছাত্রছাত্রীদের একই ড্রেসে শ্রীপুর রেলওয়ে স্টেশনের পাশে রানিকে স্বাগত জানানোর জন্য নেওয়া হয়। তিনি সেখানে বাকি ছাত্রদের সঙ্গে দুই হাতে বাংলাদেশ ও ব্রিটেনের পতাকা হাতে দাঁড়িয়েছিলেন। আর ছাত্রীরা লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলো, রানিকে ফুল নিয়ে বরণ করার জন্য।

বৈরাগীরচালা গ্রামের বাসিন্দা এ কে এম মো. সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, ১৯৮৩ সালে গ্রামটি ছিল স্বনির্ভর গ্রাম। সে সময় তার বাবা মিজানুর রহমান খান শ্রীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। তৎকালীন মেজর জেনারেল আব্দুর রহমান খান তার বাবাকে জানিয়েছিলেন, ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ বৈরাগীরচালা স্বনির্ভর গ্রামটি পরিদর্শনে আসবেন। রানি আসার চার মাস আগে মেজর রহমানও গ্রামটি দেখে গেছেন।

তখন গ্রামের মানুষের গোয়ালভরা গরু-ছাগল, খামার ভরা মোরগ-মুরগি, পুকুর ভর্তি মাছ, ফসলি জমি, শাকসবজি, তরকারি সবকিছু ছিলো। কোনো কিছুর অভাব ছিল না এ গ্রামের মানুষের মধ্যে। তারা বাইরে থেকে কিছু আমদানি করতেন না।

“মূলত এ দৃশ্য দেখতে রানি এলিজাবেথ গ্রামটিতে আসেন। বাড়ির চারপাশ ঘুরে দেখে স্বনির্ভর গ্রামের পরিচয় গ্রহণ করেন ব্রিটেনের রানি। গ্রামবাসীর পক্ষ থেকে রানিকে একটি রুপার চাবি উপহার দেওয়া হয়।” বলেন তিনি।

শ্রীপুর পৌরসভার মেয়র মো. আনিছুর রহমান বলেন, “ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের শ্রীপুরে আগমন বিশ্ববাসীর কাছে আমাদেরকে গৌরবান্বিত করেছিল। তার পদচারণায় শ্রীপুরের উন্নয়নের সূচনা হয়। আমরা রানির স্মৃতিকে কখনো ভুলবো না। ব্রিটেনের রানির প্রয়াণে আমরা গভীরভাবে শোকাহত।”

বৈরাগীরচালা সরকারি প্রামিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষক আব্দুর রহিম জানান, তখন তার স্কুলটি টিনশেডের ছাপড়া ঘর ছিল। আর পাশের বৈরাগীরচালা হাইস্কুলটি ছিল সেমিপাকা টিনশেড। এখন সেই স্কুল দুইটি পাকা ও বহুতল ভবন বিশিষ্ট।

তবে রানি এলিজাবেথ বৈরাগীরচালা গ্রামে এসে যে পুকুরে মাছ অবমুক্ত করেছিলেন, সে পুকুরটি এখন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে পানিশূন্য হয়ে পড়েছে। পুকুরের পাড়ও ভেঙে যাচ্ছে বলে জানান তিনি।

বৈরাগীরচালা রেড ক্রিসেন্টের মাতৃসদনের তত্ত্বাবধায়ক আঞ্জুমান আরা শিউলী বলেন, “একই এলাকায় তখনকার সময়ে গড়ে ওঠা তার মাতৃসদন, পোস্ট অফিস এখনও চালু আছে। কিন্তু অগ্রণী ব্যাংকের বৈরাগীরচালা শাখাটি আর সেখানে নেই। রানি ওই সময় এ মাতৃসদনটিও দেখে গেছেন। আজ রানি নেই। তার জন্য আমরা শোকাহত।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক