Published : 16 Nov 2024, 05:45 PM
যতদূর চোখ যায় শুধুই লাল শাপলার চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্য। থালার মতো বিছিয়ে থাকা গোলাকার বেগুনি পাতার ফাঁকে উঁকি দিয়ে থাকা শাপলাগুলো নিজের মোহনীয় রুপ প্রকৃতিতে যেন উজাড় করে দিয়েছে।
তবে অপরূপ এই দৃশ্য কোনো বিল বা গভীর জলাশয়ের নয়; কুমিল্লার একটি গ্রামের ফসলের মাঠেই দেখা মিলেছে মনমাতানো এই সৌন্দর্যের।
কুমিল্লার লাকসাম উপজেলার বাকই দক্ষিণ ইউনিয়নের তারাপুর নামের গ্রামটির বিস্তীর্ণ মাঠে এখন কোনো ফসল নেই।
কুমিল্লা-চাঁদপুর আঞ্চলিক মহাসড়ক লাগোয়া মাঠটির কোথাও হাঁটু পানি আবার কোথাও সামান্য পানি- এর মধ্যেই মাঠজুড়ে ফুটেছে লাল শাপলা।
কুমিল্লা নগর থেকে তারাপুর গ্রামটির দূরত্ব প্রায় ২৭ কিলোমিটার। বৃহস্পতিবার সকাল ৭টার দিকে গ্রামটিতে প্রবেশের সময়ই চোখে পড়লো লাল শাপলার সৌন্দর্য উপভোগ করতে ভিড় করেছেন একদল তরুণ। তাদের বেশিরভাগই পাশের বরুড়া উপজেলার।
তাদের কেউ গ্রামীণ রাস্তার মধ্যে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। আবার কেউ কাদা মাড়িয়ে নেমে পড়ছেন মাঠে। পানিতে দাঁড়িয়ে কেউ ছবি তুলছেন, কেউ ভিডিও করছেন। আবার কেউ লাল শাপলা ফুল ছিঁড়েও বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছেন।
ওই তরুণদের একজন বরুড়া উপজেলার ভাউকসার ইউনিয়নের ছোট লক্ষ্মীপুর গ্রামের হৃদয় রাজ। তিনি বলেন, “সূর্যোদয়ের পর মাঠজুড়ে ফুটে থাকা এই শাপলার নয়নাভিরাম সৌন্দর্য যে কারো নজর কাড়ে। সেজন্য আমি একটি বিনোদনমূলক ফেইসবুক পেজের জন্য ভিডিও করতে এসেছি। ”
“সকালের প্রকৃতিতে লাল শাপলা ফুল মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে। যার সৌন্দর্য উপভোগ করতে ভোর থেকেই বিভিন্ন মানুষ এখানে আসতে দেখেছি।”
একটু পরেই চোখে পড়লো আরও বেশ কয়েকজন তরুণ-তরুণী এসেছেন।
তাদের মধ্যে থাকা লিমন হোসেন বলেন, “পানি ও কাদাপানির উপর অনেকটা থালার মতো বিছিয়ে থাকা গোলাকার বেগুনি পাতার ফাঁকে উঁকি দিয়ে থাকা শাপলাগুলোর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হচ্ছেন সবাই। মহাসড়ক দিয়ে চলাচলের সময়ও যে কারোই চোখ পড়ে এই মাঠটির দিকে।”
তারাপুরের পাশের গাজীপুর গ্রাম থেকে আসা আরেক তরুণ শাহরিয়ার রিফাত বলেন, “আমি প্রায় দিনই সকালে লাল শাপলাগুলো দেখতে আসি। যাওয়ার সময় কয়েকটি ছিঁড়ে নিয়ে যাই বাড়িতে বসেও সৌন্দর্য দেখবো বলে। শাপলা ফুলগুলো ভোরবেলা ফোটে আর দিনের আলো বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাপড়িগুলো বুজে যায়।”
শাহনাজ পারভীন নামে এক তরুণী বলেন, “অসংখ্য পাপড়ির বিন্যাসে প্রতিটি শাপলা ফুল যে কারোই মন কেড়ে নেয়। লাল শাপলা ফুলের স্পর্শ নিতে এখানে এসেছি। লাল শাপলার সৌন্দর্যে আমি মুগ্ধ। ”

স্থানীয়দের ভাষ্য, বিগত সময়ে কখনোই গ্রামটির মাঠে এভাবে লাল শাপলা দেখেনটি তারা। লাল শাপলার পাশাপাশি এই মাঠে অল্প পরিমাণে সাদা শাপলাও রয়েছে। তবে লাল শাপলার মোহনীয় রূপ তারাপুরের ফসলের মাঠকে দিয়েছে নতুন ভিন্ন এক পরিচিতি।
এই গ্রামের বাসিন্দা চল্লিশোর্ধ্ব দুলাল দাস বলেন, “প্রায় ৩০ একর জায়গা জুড়ে এই শাপলা জন্মেছে। আমি ছোটবেলা থেকেই গ্রামে বাস করি। কখনোই ধানের জমিতে এই লাল শাপলা দেখিনি।
“এ বছর বন্যার কারণে জমিতে ফসল নেই। বন্যার পানি কমার কিছুদিন পরই এই লাল শাপলা জন্মেছে। বর্তমানে ভোর থেকেই বিভিন্ন স্থানের মানুষ এই শাপলা দেখতে আসছেন।”
গ্রামের কৃষক মনোয়ার হোসেন বলেন, “এই লাল হাপলা (শাপলা) আংগো (আমাদের) খেতো কেমনে আইছে জানি না। তবে হাপলাগুলা দেখতে অনেক সুন্দর লাগে। কত মানুষ আঁইয়ে ছবি তোলনের লাই। মাইনসে খুশি, আনরাও খুশি।”
লাকসামের বিজরা রহমানিয়া চিরসবুজ উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আবুল খায়ের বলেন, “লাল শাপলা গ্রামবাংলার প্রকৃতির জন্য এক অনবদ্য সৌন্দর্যের প্রতীক। তবে অতীতে কখনো এই এলাকায় বিস্তীর্ণ মাঠ জুড়ে এভাবে লাল শাপলার হাতছানি দেখা যায়নি।

“তারাপুর গ্রামে ফুটে থাকা এসব শাপলার রং প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যেন একাকার হয়ে গেছে। আমি নিজেও ঘুরে দেখে এসেছি। ভোর বেলায় শাপলা ফুলের পাঁপড়িতে হালকা শিশিরের ছোঁয়া এদের সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে তোলে। বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ আসছেন সৌন্দর্য উপভোগ করতে।”
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, কুমিল্লার উপ-পরিচালক আইউব মাহমুদ বলেন, “বন্যার কারণে এই লাল শাপলা লাকসামের পাশাপাশি মনোহরগঞ্জের বিভিন্ন এলাকার কৃষি জমিতেও জন্মেছে। মূলত লাল শাপলা প্রকৃতির সৌন্দর্য বাড়ায়। ভ্রমণপিপাসু ও প্রকৃতিপ্রেমী মানুষরা এতে বেশি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন।
“তবে কিছুদিন পরেই এসব জমিতে বোরো আবাদ হবে। তখন এই শাপলার পাতা, কাণ্ড পচে গেলে মাটিতে জৈব সার হিসেবে কাজ করবে।”