Published : 08 Jul 2025, 09:52 PM
ফেনীতে দুদিন ধরে টানা বর্ষণ হচ্ছে। এতে চলতি মৌসুমে জেলায় সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের রেকর্ড করা হয়েছে। জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে শহরের বিভিন্ন এলাকায়।
ভারী বৃষ্টির সঙ্গে পাহাড়ি ঢলে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে মুহুরি নদীর পানি, ভেঙে গেছে পাড়। পানির তোড়ে ভেঙেছে মুহুরি-সিলোনিয়া নদীর বাঁধ।
ফেনী আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মজিবুর রহমান জানিয়েছেন, মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ৪৪০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে।
ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. আবুল কাশেম বলেন, বৃষ্টি-পাহাড়ি ঢলে সীমান্তবর্তী মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর পানি বিপৎসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টায় মুহুরী নদীতে পানি বিপৎসীমার ১১৩ সেন্টিমিটার উপরে প্রবাহিত হয়েছে।
প্রবল পানি তোড়ে পরশুরাম উপজেলার সিলোনিয়া নদীর পশ্চিম গদানগর এলাকায় ভেঙে গেছে বেড়িবাঁধের অন্তত ১০ মিটার । একই উপজেলার মুহুরী নদীর বল্লামুখা বেড়িবাঁধের সংস্কারকৃত অংশ নতুনভাবে ভেঙে প্লাবিত হয়েছে।

ভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা সতর্ক অবস্থানে আছে জানিয়ে প্রকৌশলী আবুল কাশেম আরও বলেন, উজানে ভারী বৃষ্টি হলে নদীর পানি বাড়বে।
এদিকে ফুলগাজী উপজেলার সদর ইউনিয়নের শ্রীপুর রোড এলাকায় মুহুরী নদীর পাড় সংলগ্ন সড়ক ভেঙে দুইটি দোকান নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।
এ বিষয়ে ফুলগাজী সদর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব আবুল হোসেন বলেন, সোমবার রাত থেকে অতিবৃষ্টিতে মুহুরী নদী সংলগ্ন সড়কের একপাশ ধসে পড়ে। এতে দুটি দোকানও ভেঙে নদীতে পড়ে যায় ।
তিনি বলেন, এর আগে ওই স্থান দিয়ে ২০২৩ সালে নদী থেকে বালু উত্তোলনের কারণে বাঁধের নিচে গভীর গর্ত তৈরি হয়। এতে তৎকালীন সময়েও একইস্থানে তিনটি দোকান নদীতে পড়ে গিয়েছিল।
এছাড়া ফুলগাজী-রাজেষপুর আঞ্চলিক সড়কটি ঝুঁকিপূর্ণ থাকায় মঙ্গলবার সকাল থেকে যানচলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

শহরের কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমর পরিমাণ পানি
এদিকে টানা ভারী বর্ষণে ফেনী শহরের বিভিন্ন এলাকা ও প্রধান প্রধান সড়ক পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। জলাবদ্ধ হয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন বাসিন্দারা। বৃষ্টির কারণে শহরের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘসময় বিদ্যুৎও ছিল না। তাতে দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।
মঙ্গলবার সকাল থেকেই শহরের শহীদ শহীদুল্লা কায়সার সড়ক, একাডেমি, রামপুর, পাঠানবাড়ি, মিজান রোড, নাজির রোড, কলেজ রোড, হাসপাতাল মোড়, শাহীন একাডেমি, স্টেশান রোড, ডাক্তার পাড়াসহ বিভিন্ন এলাকা পানিতে ডুবে চরম জলাবদ্ধতা দেখা দেয়।
এসব সড়কের কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমর পরিমাণ পানিতে ডুবেছিল। দিনভর অফিসগামী কর্মজীবী ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা চলাচলে দুর্ভোগে পড়ে।
শহরের কলাবাগানে এলাকার বাসিন্দা জোহরা হক বলেন, “টানা বৃষ্টির কারণে সকাল থেকে এলাকায় বিদ্যুৎ নাই। এতে মোবাইলে চার্জ দেওয়া ও মোটর দিয়ে পানি তোলা যাচ্ছে না। এতে দুর্ভোগে পড়েছে ভবনের ১২টি ফ্ল্যাটের বাসিন্দা।”
শহীদ শহীদুল্লাহ কায়সার সড়কে চলাচল করা আতিয়ার হাওলাদার বলেন, “ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ ফাঁড়ির সামনে কোমর পরিমাণ পানিতে তলিয়ে আছে। পৌরসভার পক্ষ থেকে নিয়মিত ড্রেন ও নালা পরিষ্কার না করায় এই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।”

শহরের রামপুর এলাকার বাসিন্দা ইয়াসিন আরাফাত রুবেল বলেন, “টানা বর্ষণে রামপুর এলাকা হাঁটু পরিমাণ পানিতে নিমজ্জিত রয়েছে। শহরের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত খাল ও নালাগুলো পরিষ্কার না করায় বৃষ্টি হলেই এমন জলাবদ্ধতা তৈরি হয়।”
তবে ফেনী পৌরসভার প্রশাসক ও স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক গোলাম মোহাম্মদ বাতেন বলেন, “ডুবে যাওয়া সড়কগুলো থেকে পানি নিষ্কাশনে পৌরসভার কর্মীরা নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছেন। বিগত কয়েক মাস ধরে নালা ও খালগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করা হয়েছে। ”
ফেনী জেলা প্রশাসক সাইফুল ইসলাম বলেন, মঙ্গলবার নদীতে পানি বেড়ে বাঁধ ভাঙার তথ্য পেয়ে বিকালে তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।
জেলা প্রশাসন থেকে প্রতিনিয়ত বৃষ্টি ও নদীর পানি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, এর মধ্যে জেলা প্রশাসন থেকে বন্যা মোকাবেলায় সব প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে।
এর আগে ২০২৪ সালের অগাস্টে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় ফেনীতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। ওই সময়ে জেলার ছয় উপজেলায় ২৯ জনের প্রাণহানি হয়েছিল। ১০ লাখেরও বেশি মানুষ পানিবন্দি ছিলেন।
ভয়াবহ সেই বন্যায় জেলার সড়ক যোগাযোগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যানবাহন, ঘরবাড়ি ও ব্যবসা-বাণিজ্যসহ প্রায় সবখাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জেলা প্রশাসনের সরকারি হিসাবে বন্যায় প্রায় ২ হাজার ৬৮৬ কোটি ২০ লাখ ৫০০ টাকার ক্ষতি হয়েছিল।