Published : 15 Jul 2024, 11:13 AM
উৎসব-পার্বণ, জন্মদিন, বিয়েসহ যেকোনো অনুষ্ঠানে আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীদের মিষ্টিমুখ করানো বাঙালির প্রথা। যে কারণে হরেক খাবারের ভিড়েও মিষ্টির কদর এখনও আগের মতোই রয়েছে।
শত বছর আগে থেকে রাজবাড়ীতে চমচম, রসগোল্লা, সন্দেশসহ বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি তৈরি হয়ে থাকে। ময়রাদের ‘বিশেষ পারদর্শিতা’র কারণে এসব মিষ্টির মধ্যে স্বাদের দিক থেকে ‘বিশেষ’ জায়গা করে নিয়েছে ক্ষীরের চমচম।
গরুর খাঁটি দুধের তৈরি ক্ষীর আর চিনির মিশ্রণ থাকায় অন্য মিষ্টি থেকে স্বাদে কিছুটা আলাদা ক্ষীরের চমচম রাজবাড়ীর মানুষের কাছে অত্যন্ত প্রিয়।
শুধু জেলাতে নয়, এর সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে দেশ-বিদেশে। তাই ক্ষীর চমচমের প্রসার বাড়াতে জিআই পণ্য হিসাবে স্বীকৃতির জন্য কার্যক্রম শুরু করেছে জেলা প্রশাসন।

রাজবাড়ী শহরের কয়েকটি মিষ্টির কারখানা ঘুরে দেখা যায়, ব্যবসায়ীরা খামারিদের কাছ থেকে দুধ সংগ্রহ করে আনেন। পরে ওই দুধ ছাকনির সাহায্যে পরিষ্কার করে বিভিন্ন পাত্রে ঢেলে রাখা হয়। এরপর বড় বড় কড়াইয়ে ঢেলে কাঠের চুলায় দীর্ঘ সময় ধরে জ্বালিয়ে দুধ থেকে তৈরি করা হয় ছানা। পরে হাতের সাহায্যে মিষ্টির বল তৈরি করেন ময়রারা।
এরপর মিষ্টির বল চুলায় জ্বালিয়ে রসে বেশ কিছুক্ষণ চুবিয়ে রাখা হয়। পরে দুধের তৈরি শক্ত মাওয়া ভেঙে ক্ষীর বানিয়ে চমচমের ওপর প্রলেপ দিয়ে তৈরি হয় সুস্বাদু ক্ষীর চমচম।
ক্ষীর চমচম ছাড়াও রাজবাড়ীতে হাপসি, কাপসি, বরফি, ক্ষীর সন্দেশ, কাঁচা ছানা, কালোজাম, প্যারা সন্দেশ, কাটারি ভোগ, পাপরি সন্দেশসহ ১০০ ধরনের মিষ্টি তৈরি করা হয়।
রাজবাড়ী জেলা শহরে বহু মিষ্টির দোকান থাকলেও হাতেগোনা কয়েকটি দোকানের চমচম বেশি জনপ্রিয়। সেখানে কথা হয় সৌমিত্র শীল নামের এক ক্রেতার সঙ্গে।

তিনি বলেন, “রাজবাড়ীর মিষ্টি বিশেষ করে ক্ষীর চমচমের সুনাম দীর্ঘদিন ধরেই আছে। এই মিষ্টি রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলার রপ্তানি হয়। এমনকি বিদেশেও রপ্তানি হয়।
“আমরা আশা করবো, রাজবাড়ীর মিষ্টির যে সুনাম রয়েছে, তার ধারাবাহিকতা থাকবে এবং এর মাধ্যমে জেলার নাম সারাদেশে ছড়িয়ে পড়বে।”
সিনান আহম্মেদ নামের আরেক ক্রেতা বলেন, “রাজবাড়ীর মিষ্টি সম্পর্কে বলতে গেলে খুব কমই বলা হবে। আমি এই মাত্র দুই কেজি মিষ্টি নিলাম। বাড়িতে আত্মীয় এসেছে। তাদের কথা মাছ-মাংস চাই না। রাজবাড়ীর মিষ্টি চাই।”
তিনি বলেন, “আমাদের জেলার মিষ্টির এত চাহিদা যে, দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মিষ্টি নেওয়ার জন্য লোকজন রাজবাড়ীতে আসে। দোকানগুলোতে ভিড় লেগেই থাকে। অনেক সময় বাইরের ক্রেতাদের ভিড়ের চাপে আমরা কেনার সিরিয়াল পাই না।”

ক্রেতা সঞ্জয় ভৌমিক বলেছেন, “রাজবাড়ীর মিষ্টির প্রচুর চাহিদা রয়েছে। তবে সব দোকানের মিষ্টি না। শহরে অনেক মিষ্টির দোকান থাকলেও দুই থেকে তিনটি দোকানের মিষ্টির খুব চাহিদা। প্রতিদিন ওই কয়েকটি দোকানে ক্রেতাদের ভিড় লেগেই থাকে।
“যদি কোনো আত্মীয়-স্বজন জানতে পারে তাদের বাড়িতে বেড়াতে যাবো, সাথে সাথে ফোন দিয়ে রাজবাড়ীর মিষ্টি নিয়ে যেতে বলবে।”
শহরের মিষ্টি ব্যবসায়ী পরিমল সাহা বলেন, “রাজবাড়ীর মিষ্টি খাঁটি দুধ দিয়ে তৈরি হয়। এই মিষ্টি যে ভালো, সেটা মুখে নিয়েই বলে দেওয়া যাবে। আমরা অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছি। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এসে রাজবাড়ীর মিষ্টি নিয়ে যায়।
“প্রবাসী যারা আছে তারাও এই মিষ্টি নিয়ে যায় বিভিন্ন দেশে। সেখানেও আমরা সুনাম কুড়িয়েছি। ক্ষীর চমচমের জন্য রাজবাড়ী বিখ্যাত।”

পরিমল বলেন, “রাজবাড়ীর মিষ্টির সুনাম ছড়িয়ে পড়তে থাকে ১৯৯২ সাল থেকে। ৩০ বছরে সারাদেশে এই মিষ্টির সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে। আমাদের দাবি, রাজবাড়ীর মিষ্টি যেন জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পায়। তাহলে আমাদের ব্যবসার আরও প্রসার ঘটবে।”
ব্যবসায়ী যোগেশ ঘোষ গৌর বলছিলেন, “রাজবাড়ীর মিষ্টির উপরে মানুষের আকর্ষণ বেশি। বিশেষ করে রাজবাড়ীর ক্ষীর চমচম। এই চমচমের জন্যই রাজবাড়ী বিখ্যাত। এর বাইরেও একশ ধরনের মিষ্টি তৈরি করা হয়।
“এখানকার মিষ্টি খাঁটি গরুর দুধ দিয়ে তৈরি হওয়ায় মানুষের চাহিদা বেশি। এ ছাড়া ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় রাজবাড়ীর মিষ্টি যায়। অনেকেই আবার বিদেশেও নিয়ে যায় এই মিষ্টি।”
রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসক আবু কায়সার খান বলেন, “রাজবাড়ী মিষ্টির জন্য বিখ্যাত। বিশেষ করে ক্ষীর চমচম ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। অন্য চমচম থেকে রাজবাড়ীর ক্ষীর চমচমের পার্থক্য হলো- এই চমচমের ওপরে ক্ষীরের আবরণ থাকে যে কারণে চমচমটা খুব সুস্বাদু হয়।
“সারাদেশে এই মিষ্টির প্রচলন ও প্রসার ঘটানোর জন্য আমরা চেষ্টা করছি।”
তিনি বলেন, “এ লক্ষ্যে জেলা প্রশাসন রাজবাড়ীর ক্ষীর চমচম জিআই পণ্য হিসাবে স্বীকৃতির জন্য কার্যক্রম শুরু করেছে। আশা করছি, খুব দ্রুত রাজবাড়ীর চমচমকে আমরা জিআই পণ্যের তালিকাভুক্ত করতে পারবো।”