‘কোথায় মেসি, তার দলকে হারিয়েছি’

অবিশ্বাস্য ঘোরলাগা তৃপ্তি নিয়ে স্টেডিয়ামের আঙিনা ছাড়লেন সৌদি আরবের সমর্থকরা।

মোহাম্মদ জুবায়েরমোহাম্মদ জুবায়েরদোহা থেকেবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 23 Nov 2022, 07:02 AM
Updated : 23 Nov 2022, 07:02 AM

এ ক’দিন দুপুরে দোহার রাস্তায়, পথে-ঘাটে কারো দেখা নেই! সবাই যেন কোথাও লুকিয়ে ছিলেন। যেই না লিওনেল মেসি নামের এক হ্যামিলিওনের বাঁশিওয়ালার সুর বেজে ওঠার ক্ষণ এলো, হুড়মুড় করে সবাই বেরিয়ে এলেন পথে। ক্যাবে, মেট্রোতে চেপে ছুটলেন লুসাইল স্টেডিয়ামে!

কিন্তু যে আশা, প্রত্যাশা নিয়ে আর্জেন্টাইন সমর্থকদের এই স্টেডিয়ামে আসা, তা পূরণ হয়নি। আর্জেন্টিনা যে ২-১ গোলে হেরে গেছে সৌদি আরবের কাছে। তাই আর্জেন্টাইনদের জন্য এই চিত্রনাট্যের পর্ব দুটি। প্রথম পর্বে সীমাহীন উচ্ছ্বাসে ভেসে যাওয়া, দ্বিতীয় পর্বে হতাশার অথৈ সাগরে খাবি খাওয়া।

বলার অপেক্ষা রাখে না, হাতে-গোনা সৌদি আরবের সমর্থকদের পয়সা উসুল ষোলোআনা; অবিশ্বাস্য ঘোরলাগা তৃপ্তি নিয়ে স্টেডিয়ামের আঙিনা ছাড়লেন তারা। শুরুতে যদিও তারা এসেছিল চুপিচুপি, নিঃশব্দে, কিন্তু বেরিয়ে গেল উল্লাস করতে-করতে। অথচ মঙ্গলবার দুপুরে লুসাইলের আবহ ছিল একেবারেই ভিন্নরকম।

মরুভূমির দুপুর বড্ড বিরক্তিকর। গরমে যদিও ঘাম ছোটে না, কিন্তু গা জ্বলে। চিটচিট করে। চারদিকে সবুজের ছিটেফোঁটা নেই বলে চোখের প্রশান্তিও মিলে না। সুশীতল ছায়া তো দূর অস্ত, কোনো গাছতলায় দাঁড়িয়ে একটু জিরিয়ে নেওয়ার সুযোগও নেই।

লুসাইল স্টেডিয়ামের অন্দর-বাহিরের পরিবেশ অবশ্য দুই রকম। ভেতরে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বসানো, গরম অনুভবের সুযোগ নেই, সারাক্ষণ ঠাণ্ডা হিমেল হাওয়া বয়ে যায় ভেতরে, অন্যদিকে বাইরে খাঁ খাঁ রোদ। মাঠে ঢুকতে না পারা সমর্থকদের কেউ ছোট-ছোট বিলবোর্ডের ধারে, কেউ কেউ তো ময়লা ফেলার ড্রামের পাশে একটু ছায়ার সন্ধানে জায়গা খুঁজে নিতে ব্যস্ত! সেখানে বসেই মোবাইলে দেখেন ম্যাচ।

এমন ভর দুপুরেও রোদ-গরম উপেক্ষা করে লুসাইলের পথে জনস্রোত। হৈ-হুল্লোড় করতে করতে দলে দলে ছুটে আসেন ফুটবলপ্রেমীরা এবং তাদের সিংহভাগই আর্জেন্টিনার সমর্থক। কারো গায়ে মেসির জার্সি, কারো লাউতারো মার্তিনেসের, কেউবা নিজের নাম লিখেছেন জার্সির পিঠে। হাসতে-হাসতে, নাচতে-নাচতে, পতাকা উড়িয়ে গান গাইতে-গাইতে ঢুকছেন স্টেডিয়ামে।

এই জনস্রোতে রীতিমতো ‘কোণঠাসা’ সৌদি আরবের সমর্থকরা। প্রতিবেশী দেশ থেকে কাতারে আসা হাতে গোনা সমর্থকদের দেখা মিলল, কিন্তু তাদের কণ্ঠে উচ্ছ্বাস নেই। গায়ে জাতীয় দলের জার্সি জড়িয়ে, কেউবা মাফলার, পতাকা নিয়ে কিছুটা যেন সংগোপনে স্টেডিয়ামে এসেছে তারা। এভাবে আসবেই না কেন? প্রতিপক্ষ যে আর্জেন্টিনা। এবারের বিশ্বকাপের দাবিদারদের ছোট্ট তালিকায় যাদের নাম এক-দুয়ের ভেতরে। সেখানে সৌদি আরব বৈশ্বিক ফুটবলে পরাশক্তির কাতারে নেই কোনোভাবে, স্রেফ পেছনের বেঞ্চের ছাত্র।

ম্যাচ গড়াল মাঠে। সমর্থকদের গর্জনে কেঁপে উঠল লুসাইল স্টেডিয়ামের চারিধার। দশম মিনিটে গোল করলেন মেসি, সমর্থকদের চিৎকার তখন গগনবিদারী। এরপর তিনটি গোল যখন অফসাইডের খাঁড়ায় কাটা পড়ল, আর্জেন্টিনার সমর্থকদের দীর্ঘশ্বাসে ভারি হয়ে উঠল চারপাশ। দ্বিতীয়ার্ধের চিত্রনাট্যে ভোজবাজির মতো বদলে গেল সবকিছু!

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে, ৪৮তম মিনিটে সালেহ আল শেহরির অসাধারণ গোলে সমতায় ফিরে সৌদি আরব। গুটি কয়েক দর্শকের উল্লাসের চিৎকার কানে পৌঁছানো দায়, এরচেয়ে বরং ৮০ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতা সম্পন্ন লুসাইল স্টেডিয়ামের ‘দখল’ নেওয়া আর্জেন্টিনার সমর্থকদের দীর্ঘশ্বাসের শব্দ আরও বেশি।

পাঁচ মিনিটের পর যখন ডি-বক্সের মাথায় আলগা বল পাওয়া সেলিম আল দাওয়াসারি আর্জেন্টিনার তিন জনকে কাটিয়ে বুলেট গতির শটে সৌদি আরবকে এগিয়ে নেন, তখন সৌদি আরব সমর্থকদের বাধঁনহারা উল্লাস পৌঁছায় কানে। এই গোলে শ্মশানের নিস্তব্ধতা নেমে আসে আর্জেন্টাইন সমর্থকদের তাবুতে।

তারপরও বাকিটা সময় মেসি, মার্তিনেসরা যখনই আক্রমণে উঠেছেন, লুসাইলের আঙিনা গর্জে উঠেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যক্ষের ধনের মতো দাওয়াসারির গোলটি আগলে রেখে, আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপের প্রথম দেখায় হারের হতাশায় ডুবিয়ে, অনির্বচনীয় জয়ের উচ্ছ্বাসে মেতে মাঠ ছেড়েছে সৌদি আরব, ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে যাদের অবস্থান ৫১তম, আর্জেন্টিনা তৃতীয়!

‘পঁচা শামুকে’ পা কাঁটল আর্জেন্টিনার। দলটির সমর্থকদেরও। তারা মাঠ ছাড়লেন যেন খোঁড়াতে খোঁড়াতে, পা আর এগোয় না। বিষন্ন বদন, চোখের কোনো চিকচিক করছে অশ্রু। প্রাণান্ত চেষ্টায় কেউ কান্না লুকাতে ব্যস্ত! মেট্রো ধরার লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষমান অনেকে বসে পড়লেন রাস্তায়, একে অন্যের কাঁধ রেখে কাঁদলেনও।

সৌদি আরবের সমর্থকদের উচ্ছ্বাস হলো তাদের মতোই। পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আজিজ বিন খালিদ নামের একজন উচ্ছ্বাসভরা কণ্ঠে ‘উন্মুক্ত বিহঙ্গের’ মতো লাগছে। নাম না জানা কেউ একজনের কণ্ঠে কয়েকবার প্রতিধ্বনিত হলো, ‘কোথায় মেসি? তার দলকে হারিয়েছি।’ এশিয়ার দেশটির এমন দম্ভ দেখানোরই দিন ছিল লুসাইল স্টেডিয়ামে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক