Published : 06 Jul 2025, 01:36 AM
চাঁদপুরের দেলোয়ার হোসেন পাটোয়ারী পাঁচ বছর কাটিয়েছেন সৌদি আরবে। দেশে ফিরে মুদি দোকান দিয়ে সুবিধা করতে না পেরে চলতি বছর মে মাসের শেষ দিকে পাড়ি জমান কুয়েতে।
কিন্তু কুয়েত যেতে যে পয়সা খরচ হওয়ার কথা, তার চেয়ে অনেক বেশি, প্রায় সাত লাখ টাকা গুনতে হয় তাকে।
একই ধরনের অভিজ্ঞতা শোনালেন জুন মাসে কুয়েতে পা রাখা কুমিল্লার ইকবাল হোসেন।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “দালালের মাধ্যমে প্রায় সাড়ে ছয় লাখ টাকা খরচ করে আসতে হয়েছে। টাকা জোগাড় করতে স্থানীয় একটি সমবায় সমিতি থেকে দুই লাখ টাকা ঋণও নিয়েছি।
“কাজ পেয়েছি, কিন্তু এখানে এসে দেখি, যে টাকা খরচ করে এসেছি, সেটা প্রকৃত খরচের কয়েক গুণ।”
মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কুয়েতে ভিসা পাওয়ার প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরে বেশ জটিল ছিল। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যানুযায়ী, ২০০৭ সালে কুয়েতের ভিসা দেওয়া প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।
সে বছর বাংলাদেশ থেকে মাত্র চার হাজার ২১২ জন কুয়েতে পাড়ি জমান। এরপর ২০০৮ সালে ৩১৯ জন, ২০০৯ সালে ১০ জন, ২০১০ সালে ৪৮ জন, ২০১১ সালে ২৯ জন, ২০১২ সালে দুজন এবং ২০১৩ সালে ছয়জন কুয়েতে যান।
এরপর দেশটিতে ভিসা কার্যক্রম কিছুটা শিথিল হলে ধীরে ধীরে অল্পবিস্তর বাংলাদেশি সেখানে যাওয়া শুরু করেন। আর এ জটিলতা ঘিরেই সেদেশে ভিসা দালালরা খরচ কয়েক গুণ বাড়িয়ে নেন।

সবশেষ ২০২৪ সালে ৩৩ হাজার ৩১ জন বাংলাদেশ থেকে কুয়েতে যান। আর এ বছর ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পাড়ি দিয়েছেন ৪ হাজার ৯৬২ জন।
কুয়েত প্রবাসী ব্যবসায়ী ও কমিউনিটি নেতা শফিকুল ইসলাম বাবুল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “২০০৭ সাল থেকে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশিদের জন্য কুয়েতের ভিসা পাওয়া যাচ্ছিল না। সেক্ষেত্রে বিশেষ অনুমোদন নিয়ে ভিসা পেতে হত বাংলাদেশি নাগরিকদের। ভিসা বিক্রেতারা এ অজুহাতে দাম কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়।”
তিনি বলেন, “এরপর এক যুগের বেশি সময় ধরে বিশেষ অনুমোদন নিয়েই বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা পাওয়া যাচ্ছিল। যদিও এটি ছিল সীমিত ক্যাটাগরির ভিসা। সেসময় ‘আহলি শোন’ নামের ভিসা একেবারেই পাওয়া যায়নি।”
আহলি ভিসা কুয়েতের সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধাযুক্ত কাজের ভিসা।
আরেক কুয়েত প্রবাসী ব্যবসায়ী ও কমিউনিটি নেতা মোহাম্মদ বিলাল হোসেন বলেন, “মূলত কুয়েতের শ্রমিক ভিসার নির্দিষ্ট মূল্য নেই। যদি কোনো কোম্পানি তাদের নিজস্ব প্রয়োজনে ভিসা দেয়; সেক্ষেত্রে ওই কোম্পানির ভিসা ও টিকেটসহ অন্যান্য খরচ বহন করার নিয়ম রয়েছে।”
জয়পুরহাট জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মোশাররফ হোসেন জানান, পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো, যেমন সৌদি আরব, কাতার, ওমান, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েত— এ ছয় দেশে শ্রমিক ভিসায় যাওয়ার জন্য সর্বোচ্চ খরচ নির্ধারণ করা হয়েছে এক লাখ ১৫ হাজার থেকে এক লাখ ২০ হাজার টাকা।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডের (বোয়েসেল) মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি বিদেশে পাঠানোর খরচ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর নির্ভর করে।
সাধারণত এটি রিক্রুটিং এজেন্সির ফি, ভিসা প্রসেসিং ফি, স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও উড়োজাহাজ ভাড়ার মত বিষয়গুলোর ওপর নির্ভর করে।
কুয়েত প্রবাসী সোশাল অ্যাক্টিভিস্ট আব্দুস সালেহ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, কুয়েতের ভিসা পেতে ‘প্রসেস খরচ’ হচ্ছে স্থানীয় মুদ্রায় তিন দিনার এবং দূতাবাসে সত্যায়নে খরচ হচ্ছে তিন দিনার। অর্থাৎ কুয়েতের শ্রমিক ভিসা হাতে আসা পর্যন্ত মোট খরচ হচ্ছে ছয় কুয়েতি দিনার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় আড়াই হাজার টাকারও কম।
তবে শ্রমিক ভিসায় বিদেশে আসার পর নিয়োগকর্তা আড়াইশ দিনারের মত আরও খরচ করে থাকেন ওয়ার্ক পারমিট বা কাজের অনুমতিপত্রের জন্য।
সালেহর ভাষ্য, “এই ছয় দিনারের ভিসা দালালদের হাত বদলের মাধ্যমে দুই হাজার দিনারে গিয়েও ঠেকে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় আট লাখ টাকা।”

বাংলাদেশ প্রেস ক্লাব কুয়েতের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ হেবজু মিয়া বলেন, “কুয়েতে নিযুক্ত বাংলাদেশের বর্তমান রাষ্ট্রদূত প্রবাসীদের কল্যাণে বেশ কিছু কাজ করেছেন। তিনি বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করতেও কাজ করেছেন।”
প্রবাসী এ সংবাদকর্মী বলেন, “দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশিদের অভিবাসন খরচ অনেক বেশি। এর জন্য দায়ী কুয়েতে বাংলাদেশি ভিসা দালালদের একটি চক্র। এরাই নিয়ন্ত্রণ করছে কুয়েতে ভিসা ব্যবসা।”
কুয়েতে বাংলাদেশ দূতাবাসের মিনিস্টার (শ্রম) মোহাম্মদ আবুল হোসেন বলেন, বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪৫০টি ভিসা সত্যায়িত করার আবেদন পাচ্ছে বাংলাদেশ দূতাবাস।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বর্তমানে এক তৃতীয়াংশ দক্ষ কর্মীর ভিসা সত্যায়ন করে দিচ্ছেন তারা; যদিও এর আগে সাধারণ শ্রমিক ভিসায় সত্যায়নের আবেদনের বেশি আসত।
“বর্তমানে ভিসা সত্যায়নের জন্য নিয়োগকর্তাকে কিংবা তার নিবন্ধিত প্রতিনিধিকে দূতাবাসে আসতে হচ্ছে।
“ভিসা সত্যায়ন করেই আমাদের দায়িত্ব শেষ মনে করছি না। ভবিষ্যতে কোনো বাংলাদেশি এখানে এসে যেন সমস্যায় না পড়েন, সে বিষয়টিও আমরা দেখছি।”
দালাল চক্রের বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং ও এনফোর্সমেন্ট অনুবিভাগের যুগ্মসচিব এ জেড এম নুরুল হক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা সাধারণভাবে জানি, আমাদের যেটা নির্ধারিত আছে অভিবাসন খরচ, সেটা বিভিন্ন দেশের জন্য বিভিন্ন রকম। সাধারণত আমরা যেটা অভিযোগ পাই যে, বেশি নিয়েছে।
“আমরা তো এসব নিয়ে প্রচার চালাই জনসচেতনতা তৈরির জন্য। আর আমরা নির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নিই।”
তিনি বলেন, “সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে আমাকে জানালে আমি ব্যবস্থা নিতে পারব আশা করি। কে নিয়েছে, কার কাছ থেকে নিয়েছে, কখন নিয়েছে, কত টাকা নিয়েছে এসব তথ্য পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বা প্রতিকার মিলবে।”
এ বিষয়ে কথা বলতে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ নজরুলকে একাধিকবার ফোন করা হলেও সাড়া দেননি।
আরও পড়ুন
ভিসা যাচাই করে কুয়েতে আসার পরামর্শ রাষ্ট্রদূতের
কুয়েতে সংকটে ৮০ বাংলাদেশি শ্রমিক, দূতাবাসের উদ্যোগে সমাধানের চেষ্টা