Published : 26 May 2026, 07:24 PM
ইতালি যাওয়ার উদ্দেশে একটি মানবপাচারকারী চক্রের হাতে পড়ে লিবিয়ায় গিয়ে চরম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এক ব্যক্তি, যিনি পরে মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়া পেয়ে অবশেষে দেশে ফিরেছেন।
মাদারীপুরের মো. সোহেল নামের ওই ব্যক্তি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) উদ্যোগে কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তায় সোমবার দেশে ফিরে এসেছেন। তিনি ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর ইতালি যাওয়ার স্বপ্নে দালাল চক্রের খপ্পরে পড়েন।
মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁও কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে পিবিআই এসব তথ্য তুলে ধরে। পুলিশের বিশেষ এ ইউনিটের অতিরিক্ত উপ মহাপুলিশ পরিদর্শক (অতিরিক্ত ডিআইজি) এনায়েত হোসেন মান্নান এ ঘটনায় এ চক্রের তিনজনকে গ্রেপ্তারের কথা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, এই ঘটনায় রাজধানীর তুরাগ থানায় দায়ের করা মামলার তদন্ত করতে গিয়ে চক্রের একনারীসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করার পর লিবিয়ায় সোহেলকে অপহরণকারীরা ছেড়ে দেন।
গ্রেপ্তার তিনজন হচ্ছেন- টিটু ঢালী ওরফে ম্যানেজার টিটু ওরফে টিটু মীর (২৫), রহিমা বেগম (৫০) ও ইসমাইল দেওয়ান (৪৯)।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইর এসআই জাকারিয়া আলম বলেন, দালাল চক্রের মাধ্যমে ইতালি যাওয়ার উদ্দেশে ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর দেশ ছেড়ে যায় সোহেল। তাকে চক্রটি বিভিন্ন জায়গা ঘুরিয়ে লিবিয়ার ত্রিপলিতে নিয়ে অপর একটি চক্রের কাছে দিয়ে দেয়। পরে এ বছর ১৫ ফেব্রুয়ারি পরিবারের কাছে মুক্তিপণ চাওয়া হলে জানা যায় সোহেল অপহরণের শিকার হয়েছেন।
“তার হাতের পায়ের নখ তুলে ফেলা হয়। হাত পা বেঁধে উলঙ্গ করে স্টিলের পাইপ দিয়ে পিটিয়ে এবং জানালার ভাঙা কাঁচ ও চাকু দিয়ে পিঠ কেটে রক্তাক্ত করার ভিডিও তার পরিবারের কাছে পাঠিয়ে মুক্তিপণ চাইতেন অপহরণকারীরা।”
সংবাদ সম্মেলনে সোহেল বলেন, তাকে ত্রিপলিতে বদ্ধ ঘরে রেখে নির্যাতন করা হত। যারা নির্যাতন করতেন তারা সবাই বাঙালি।
ইতালী প্রবাসী রিয়াজুল মাতবরের সঙ্গে ২০২৫ সালে এক আত্মীয়ের মাধ্যমে পরিচয় হয় সোহেলের। বৈধ ভিসায় তাকে ইতালি নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয় এবং স্থানীয় কথিত এজেন্ট টিটুর সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়।
অতিরিক্ত ডিআইজি এনায়েত লেন, “২৪ লাখ টাকার চুক্তিতে তাকে ইতালি নেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হলে প্রথম দফায় ৪ লাখ টাকা দেওয়ার পর বাকি টাকা ইতালি গিয়ে দেওয়া হবে বলে সোহেল জানিয়ে দেন।"
পরে বিভিন্ন ধাপে মোট ২৪ লাখ টাকা দেওয়ার পর ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষের দিকে বাংলাদেশ ছাড়েন সোহেল।
সোহেল বলেন, “প্রথমে চিন্নাই বিমানবন্দরে নামি সেখান থেকে শ্রীলঙ্কা নেওয়া হয়। সেখানে ২ দিন থাকার পর দুবাই যাই। দুবাই বিমানবন্দরে ৫ ঘণ্টা মত থেকে মিশরের আলেকজান্দ্রিয়া বিমানবন্দরে নামি। সেখানে প্রায় ২৫ মিনিট অবস্থানের পর আরেকটি ফ্লাইটে লিবিয়া বেনগাজি নেওয়া হয়। সেখানে ১৩ দিন রাখা হয়। সেখান থেকে আরেক জায়গা হয়ে ত্রিপলিতে নেওয়া হয়।"
পিবিআই কর্মকর্তাদের ভাষ্য যে চক্রটি তাকে ইতালি নেওয়ার জন্য ২৪ লাখ টাকা নেয় সেটি আরেকটি গ্রুপের কাছে সোহেলকে দেয়। সেই গ্রুপটি তার ওপর নির্যাতন চালিয়ে মুক্তিপণ দাবি করে।
নির্যাতনের ছবি ভিডিও পাঠিয়ে এই গ্রুপটি ২০ লাখ টাকা পরিবারের কাছে দাবি করে। পরে ১৯ লাখ টাকা দেওয়া হয়। তাছাড়া আরো ২০ লাখ টাকাসহ মোট ৬৩ লাখ টাকা সোহেলের পেছনে পরিবারের খরচ হয় বলে জানান পিবিআই কর্মকর্তা এনায়েত হোসেন।
তিনি বলেন, মুক্তিপণ চাওয়াসহ মানবপাচারের অভিযোগে মামলা করার পর ২১ এপ্রিল এ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হলে অপহরণকারীদের টনক নড়ে। এক পর্যায়ে অপহরণকারীরা তাকে ত্রিপলির বিমানবন্দর এলাকায় ফেলে রেখে চলে যান।
পরে লিবিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করে সোহেলকে নিরাপদে দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা করার কথা বলেন এই পিবিআই কর্মকর্তা।
তাদের সহায়তায় সোহেল দেশে ফিরে ঘটনার বর্ণনা দিয়ে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন।
বাংলাদেশের প্রভাবশালী কেউ এসব চক্রের সঙ্গে জড়িত আছে কি না জানতে চাইলে পিবিআই কর্মকর্তা এনায়েত বলেন, “এখানে রাঘব বোয়ালদের জড়িত থাকার তথ্য এসেছে। নিশ্চয়ই জড়িত; কেননা গ্রেপ্তারদের জামিনের চেষ্টা দেখে তাই মনে হচ্ছে।”