Published : 24 May 2026, 12:54 AM
ঈদুল আজহার আর মাত্র কয়েকদিন বাকি। এরই মধ্যে বাহরাইনের পশুর হাটগুলোতে কেনাকাটার ধুম পড়েছে। মরুর তপ্ত আবহাওয়ার মাঝেও ব্যস্ত নগরজীবনের সব ক্লান্তি ভুলে ঈদের আমেজ এখন তুঙ্গে।
বিশেষ করে হামেলা, জিদাফস ও মানামাসহ বিভিন্ন এলাকার কোরবানির পশুর বাজারগুলোতে দেখা যাচ্ছে প্রবাসীদের সরব উপস্থিতি। বাংলাদেশিদের ভিড়ে এ হাটগুলো যেন ক্ষণিকের জন্য বিদেশের মাটি নয়, বরং দেশের কোনো চিরচেনা হাটের রূপ পাচ্ছে।
সকাল থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত প্রতিটি হাটেই এখন সাজ সাজ রব। পশু পছন্দ করা, দামাদামি আর শেষমেশ দর মিললে কিনে ঘরে ফেরার এক ব্যস্ত সময় পার করছেন ক্রেতা-বিক্রেতারা। স্থানীয় বাহরাইনিদের পাশাপাশি এ বাজারগুলোর সবচেয়ে বড় ক্রেতা এখন বাংলাদেশি প্রবাসীরাই।
কেউ হয়তো দেশে থাকা পরিবার-পরিজনের জন্য রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন, আবার কেউ পরবাসের এই মাটিতেই বন্ধু-বান্ধব ও সহকর্মীদের সঙ্গে মিলে কোরবানির আয়োজন করছেন।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, এবার বাহরাইনের স্থানীয় খামারে পালিত পশুর চেয়েও সৌদি আরব, ওমান ও সোমালিয়া থেকে আমদানি করা গরু, দুম্বা ও ছাগলের কদর অনেক বেশি। বিশেষ করে সোমালিয়ান ছাগল আর নধরকান্তি আরবি দুম্বা কিনতে ক্রেতাদের বেশ আগ্রহ দেখা যাচ্ছে।

তবে বাজারে পশুর পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকলেও সাধারণ ক্রেতাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে অতিরিক্ত দাম। ব্যবসায়ীরা সাফ জানাচ্ছেন, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা আর পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়েছে পশুর দামে। গত বছরের তুলনায় এবারের দাম বেশ চড়া।
বাহরাইনের ব্যবসায়ী প্রবাসী আল আমীন এ দামের পার্থক্যটা বুঝিয়ে বললেন বেশ পরিষ্কারভাবেই। তিনি জানান, গত বছর যে মাঝারি মানের গরু ৪৫০ দিনারে কেনা সম্ভব হতো, এবার সেই গরু কিনতে গুনতে হচ্ছে প্রায় ৬৫০ দিনার। সোমালিয়ান ছাগলের ক্ষেত্রেও চিত্রটা একই। গত বছর যেগুলো ৬০ থেকে ৭০ দিনারে বিক্রি হয়েছে, এবার সেগুলোর দাম হাঁকানো হচ্ছে ৮০ থেকে ৯০ দিনার বা তারও বেশি।
দামের এই ঊর্ধ্বগতি প্রসঙ্গে আল আমীন বলেন, “দাম বাড়লে কী হবে, কোরবানি তো আর থেমে নেই। কারণ এটা তো শুধু একটা আনুষ্ঠানিকতা নয়, এর সঙ্গে মিশে আছে আমাদের ধর্মীয় আবেগ আর ত্যাগের মহিমা।”
হামেলা হাটে এসেছেন চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার বটতলী এলাকার মো. হেলাল, পেশায় তিনি বাহরাইন ন্যাশনাল গার্ডের সদস্য। তিনি বললেন তার অনুভূতির কথা, “একসময় দেশে থাকতে পরিবারের সবাইকে নিয়ে হাটে যেতাম, সেই দিনগুলোর কথা খুব মনে পড়ে। প্রবাসে সেই অভাবটা তো আর পূরণ হওয়ার নয়। তবুও আলহামদুলিল্লাহ, প্রবাসীদের সঙ্গে মিলে এখানে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করার চেষ্টা করি।”
একই হাটে দেখা মিলল কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার জিকুর সঙ্গে। তিনি রাজধানী মোরগান সাপ্লাই কোম্পানিতে কর্মরত। বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে হাটে এসেছেন উল্লেখ করে তিনি জানান, তার ইচ্ছে একটা ভালো দেখে দুম্বা কেনা। দরদামে মিলে গেলে আজই কিনে ফিরবেন।
চট্টগ্রামের আনোয়ারার আরেক বাসিন্দা জালাল উদ্দিন, কাজ করেন আরাদ এলাকার হামিদ আব্বাস টায়ার শপে। তিনি এসেছেন পুরো দোকানের কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে। জালালের ভাষায়, “আমরা সবাই মিলে গরু, ভেড়া বা দুম্বা- যেটা ভালো লাগবে সেটাই নেব। প্রবাসের মাটিতে এত বড় হাট দেখে দেশের কথা খুব মনে পড়ে যাচ্ছে।”
নবাবগঞ্জ-দোহারের ফয়সাল খান, যিনি এলএমআর ফ্লেক্সি ভিসায় স্প্রে পেইন্টার হিসেবে বিভিন্ন কোম্পানিতে কাজ করেন, তিনি জানালেন তার প্রস্তুতির কথা। চারজন বন্ধু মিলে একটি খাসি নেওয়ার জন্য হাটে এসেছেন তারা। প্রবাসের ব্যস্ততার মাঝেও এমন হাটে ঘুরতে পেরে তিনি বেশ আনন্দিত।
আবার কুমিল্লার শরিফুল ইসলামের কাছে এই হাট যেন একাকীত্ব দূর করার দাওয়াই। তিনি বলেন, “ঈদের সময় পরিবার ছাড়া থাকাটা খুব কষ্টের। কিন্তু যখন বন্ধুদের নিয়ে হাটে আসি, তখন মনে হয় দেশের কোনো গ্রামবাংলার হাটেই আছি। সবাই একসঙ্গে হলে প্রবাস জীবনের কষ্টটা অনেকটাই ভুলে থাকা যায়।”
ব্যয়বহুল হওয়ায় অনেক প্রবাসীই এবার একা কোরবানি না দিয়ে কয়েকজনে মিলে ‘ভাগে’ কোরবানি দিচ্ছেন। এতে যেমন খরচের চাপ কমছে, তেমনি নিজেদের মধ্যে হৃদ্যতাও বাড়ছে। কেবল কেনাবেচাই নয়, পশু কেনার ফাঁকে ফাঁকে চলছে ঈদের দিনের রান্নাবান্না, নামাজের সময়সূচি আর বন্ধুদের আড্ডার পরিকল্পনা। ফলে এই পশুর হাটগুলো এখন আর শুধু ব্যবসার কেন্দ্র নেই, তা হয়ে উঠেছে প্রবাসীদের এক মিলনমেলা।
কঠোর পরিশ্রম আর যান্ত্রিক জীবনের মাঝেও ঈদুল আজহা যেন প্রবাসীদের মনে বইয়ে দিচ্ছে প্রশান্তির হাওয়া। বাহরাইনের পশুর হাটে বাংলাদেশিদের এ উপচে পড়া ভিড় যেন বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে, দূরত্ব যতই হোক না কেন, বাঙালির শেকড়ের টান আর উৎসবের আনন্দ কোনো সীমানাই মানে না।
বাস্তবতার রুক্ষতা আর বাড়তি খরচের দুশ্চিন্তা ছাপিয়ে প্রবাসীরা ঠিকই খুঁজে নিচ্ছেন ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত আনন্দের উপলক্ষ্য।