Published : 20 Mar 2026, 12:04 PM
টানা দশ বছর ধরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবি ছিল বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ শহর। সেই শহরের আকাশে এখন তীব্র শব্দে ধেয়ে চলছে ফাইটার জেট, ছুটে যাচ্ছে ব্যালিস্টিক মিসাইল, ড্রোন।
আমিরাতের এয়ার ডিফেন্স ব্যবস্থা তারস্বরে সাইরেন বাজিয়ে বাসিন্দাদের সতর্ক করে চলেছে। আতঙ্কের এই পরিবেশেই এসেছে ঈদুল ফিতর।
শুক্রবার ঈদ পালন করছেন আমিরাত প্রবাসী বাংলাদেশিরাও। তবে ঈদের আনন্দ তাদের মনে নেই। কেবল প্রার্থনা, এই যুদ্ধ যেন দ্রুত শেষ হয়।
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যুদ্ধ গড়িয়েছে ২১তম দিনে। মার্কিন সামরিক উপস্থিতির থাকায় আমিরাতের মত উপসাগরীয় দেশগুলোকেও এ যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলেছে ইরান।

যুদ্ধে আমিরাতের ক্ষয়ক্ষতির পাল্লা যদিও এখনো ততটা ভারী হয়নি, তারপরও এ যুদ্ধ প্রলম্বিত হলে তার প্রভাব অর্থনীতির ওপর পড়বে, মাশুল দিতে হবে সেখানে খেটে খাওয়া প্রবাসী বাংলাদেশিদেরও।
নিরাপত্তার কারণে এবার আমিরাতে ঈদগাহে বা উন্মুক্ত স্থানে ঈদের জামাত হচ্ছে না। ঈদ উদযাপনের চিরাচরিত জৌলুসও থাকবে না।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে বৈধভাবে বসবাসরত বাংলাদেশি সংখ্যা সাড়ে আট লাখের মত। তবে প্রকৃত সংখ্যা ১২ লাখের কাছাকাছি।
এই হিসেবে আমিরাতের মোট জনসংখ্যার ৭ শতাংশের বেশি বাংলাদেশি। প্রবাসী জনগোষ্ঠীর সংখ্যার দিক থেকে ভারত ও পাকিস্তানের পরেই বাংলাদেশিদের অবস্থান।

প্রায় ৪০ বছর ধরে আমিরাতে বসবাসরত ইফতেখার হোসেন বাবুল এমন ঈদ আর কখনো দেখেননি।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত একটি শান্তি এবং উন্নয়নকামী দেশ। পেট্রো প্রাচুর্যে ভরপুর আবুধাবি এবং আন্তর্জাতিক ট্যুরিজম ও বিজনেস হাব দুবাই শান্তিপূর্ণ জনপদ।
“আমিরাত কখনো যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে পড়বে, সেটা আমার ধারণারও বাইরে ছিল। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এদেশের নাগরিকদের মত আমরা প্রবাসীরাও উদ্বিগ্ন। তবে সরকার এখনো আমাদের নিরাপদ রাখতে পেরেছে।”
চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার সন্তান বাবুল থাকেন আবুধাবিতে, পেশায় তিনি একজন ব্যবসায়ী, কমিউনিটি নেতা হিসেবেও তার পরিচিতি আছে।
তিনি বলেন, “শঙ্কা আর উদ্বেগের মধ্যেই আমাদের ঈদ কাটবে। তারপরও আমরা চেষ্টা করব যতটুকু সম্ভব আমাদের কমিউনিটির সদস্যদের নিয়ে ঈদকে যদি কিছুটা হলেও আনন্দময় করা যায়, যাতে আমরা এই উৎকণ্ঠার মধ্যে খানিক স্বস্তি পেতে পারি। আমরা আশা করি, আন্তর্জাতিক কূটনীতির মাধ্যমে সংকটের দ্রুত উত্তরণ ঘটবে।”

মোহাম্মদ নওশের আলী একজন প্রকৌশলী, কাজ করেন দুবাইয়ের আরবান রিডার্স নামের একটি কোম্পানিতে।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এবারের ঈদ নানা কারণে স্মৃতিতে থেকে যাবে। প্রথমত এবারের রমজান ধরতে গেলে শীতকালেই হয়েছে। চমৎকার আবহাওয়ায় এমন রমজান কখন পেয়েছি মনে করতে পারছি না। তার মধ্যেই শুরু হয়ে গেছে যুদ্ধ।”
৩৬ বছর ধরে আমিরাতে বসবাসরত নওশেরের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। বাসিন্দাদের নিরাপদ রাখতে আমিরাত সরকারের আন্তরিকতার জন্য ধন্যবাদ জানান তিনি।
নওশের বলেন, “এবারের ঈদে রমরমা উৎসব হয়ত নেই, কিন্তু কমিউনিটি ফিলিং ও ভ্রাতৃত্ববোধের অভাব নেই। এই বিশেষ অবস্থায় নিরাপদ থেকে ঘরোয়াভাবে ঈদ আনন্দ উপভোগ করার আয়োজন চলছে, ঈদ মোবারক।”

রিমা ফারুক দুবাই প্রবাসী লেখক ও সংগঠক। এবারের ঈদ তার কাছেও অন্যরকম।
“চারপাশে যুদ্ধের খবর, মানুষের মধ্যে আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা। আনন্দের সাথে এক ধরনের নীরব কষ্টও মিশে আছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে অনেক মানুষের জীবনকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিয়েছে।
“এর সবকিছুই আমাদের মনকে ভারী করে তোলে। তবুও ঈদের আসল শিক্ষা আমাদের ভুলে গেলে চলবে না। সহানুভূতি আর ভালোবাসা নিয়ে একে অপরের পাশে থাকতে হবে।”
হবিগঞ্জের মেয়ে রিমা প্রবাসে আছেন ১৬ বছর ধরে। তার মতে, এই যুদ্ধের মধ্যে প্রবাসে যারা এখনো নিরাপদে আছেন, তাদের দায়িত্ব আরও বেশি।
“এই ঈদে শুধু নিজের আনন্দে সীমাবদ্ধ না থেকে, যুদ্ধাহত মানুষদের জন্য দোয়া করি, তাদের কষ্ট অনুভব করি, আর যতটুকু সম্ভব সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিই।
“ঈদ মানে শুধু উৎসব নয়, ঈদ মানে হৃদয়ের সংযোগ! অন্ধকার সময়েও আলো খোঁজা! তাই, আমরা আশা হারাব না। কারণ, প্রতিটি কঠিন সময়ের পরেই আসে স্বস্তি।”

প্রকৌশলী মুহম্মদ মঈনুল ইসলাম দুবাই ইলেকট্রিসিটি অ্যান্ড ওয়াটার অথরিটিতে চাকরি করেন। থাকেন দুবাইয়ের মুহাইসনা এলাকায়।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “প্রায় দুই দশক ধরে এই নিরাপদ দেশটিতে পরিবার নিয়ে বসবাস করছি। কিন্তু এবারের ঈদের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। দেশ থেকে আমাদের নিয়ে সবার উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার খবর আসছে প্রতিনিয়ত।
“এমন এক বৈরী এবং সংঘাতময় পরিস্থিতির মধ্যে আমরা ঈদ উদযাপন করছি। এমন যে ঘটতে পরে, গত ২০ বছরে কখনও অনুভব করিনি।”
মঈনুলের বাড়ি খুলনা জেলায়। তিনি বলেন, “ভবিষ্যতের একটি সংঘাতহীন ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশের আশা বুকে নিয়ে এবার আমরা একরকম নীরবে-নিভৃতে ঈদ পালন করব। সবার মঙ্গল কামনা করছি এবং সবার জন্য একটি নিরাপদ ও শংকাহীন সমাজ-সভ্যতার প্রত্যাশা রইল।”

গিয়াস উদ্দিন আবুধাবি প্রবাসী উদ্যোক্তা। তার বাড়ি নোয়াখালীর কোম্পানিগঞ্জের বসুর হাটে। প্রবাসে আছেন ১৬ বছর ধরে। সেখানে কয়েকজন ভারতীয় উদ্যোক্তার সঙ্গে মিলে যৌথভাবে ব্যবসা করেন।
তিনি বলেন, “এবারের ঈদটা আমাদের জন্য কিছুটা ভয়, কিছুটা আতঙ্কের। ইরানের ছোড়া মিসাইলে ইতোমধ্যে কয়েকজন প্রাণ দিয়েছে। সরকারিভাবে এবারের ঈদে ঘুরাঘুরি করা আড্ডা দেওয়া থেকে বিরত থাকতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
“দেশের প্রিয়জনরা আমাদের নিয়ে দুশ্চিন্তা করছেন। দেশে ফিরে আসার জন্য তাগাদা দিচ্ছেন। সব মিলিয়ে এবারের ঈদটা আগের ঈদের চেয়ে কিছুটা মলিন হলেও আমরা প্রবাসীরা চেষ্টা করব এরই মধ্যে নিজেদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে।”

একই ধরনের কথা বললেন আবুধাবি প্রবাসী লেখক সংগঠক ও ব্যবসায়ী আবু তৈয়ব চৌধুরী। তার বাড়ি চট্টগ্রামের রাউজান, প্রবাসে আছেন তিন দশক ধরে।
তৈয়ব বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, করোনাভাইরাস মহামারীর পর এবার ভিন্ন এক পরিবেশে ঈদ করছেন তারা।
“সুন্দর নিরাপদ পরিপাটি একটা দেশে আমরা থাকি। তারপরও এসব বিশেষ দিনে মনের মধ্যে স্বজন প্রিয়জনদের জন্য একটা শূন্যতা থাকে। এবার যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সেই শূন্যতা আরো বেশি অনুভব করছি।
“আল্লাহ প্রিয়জনদের সবাইকে ভালো রাখুন। সবাইকে ঈদ মোবারক।”