Published : 07 May 2026, 04:58 PM
তুষারশুভ্র আল্পসের দেশ জার্মানিতে এখন প্রতি রোববার সকালে প্রতিধ্বনিত হয়—‘অ-আ-ক-খ’। যান্ত্রিক প্রবাস জীবনে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের হৃদয়ে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির বীজ বুনে দিচ্ছে ‘কচিকাঁচার বর্ণমালা অনলাইন স্কুল’।
পাঁচ বন্ধুর হাত ধরে শুরু হওয়া এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগটি এখন জার্মানিপ্রবাসী বাংলাদেশি ও বাংলাভাষীদের কাছে হয়ে উঠেছে এক টুকরো বাংলাদেশ।
২০২১ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি। বিশ্ব যখন করোনাভাইরাস মহামারীর প্রভাবে স্থবির, প্রযুক্তিই তখন হয়ে ওঠে যোগাযোগের একমাত্র ভরসা। সেই ক্রান্তিকালেই জার্মানির স্টুটগার্টের ৫ প্রবাসী বন্ধু—মিনহাজ উদ্দিন দীপন, এবিএম বায়েজীদ, মো. মনিরুজ্জামান, ফায়সাল ইমাম এবং রেজা কামরান চৌধুরী অনুভব করেন, বিদেশের মাটিতে বড় হওয়া সন্তানদের শেকড়বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।
সেই ভাবনা থেকেই গুগল মিটের মাধ্যমে মাত্র ৫ জন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করে এই অনলাইন স্কুল। আজ সেই সংখ্যা ৯০ ছাড়িয়েছে।
এ আয়োজনের অন্যতম উদ্যোক্তা মিনহাজ উদ্দিন দীপন বলেন, “শুরুতে ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও বর্তমানে স্কুলটিতে প্রাথমিক পর্যায়ের ১০টি ব্যাচ সক্রিয় রয়েছে। বাংলাদেশ শিক্ষাবোর্ড অনুমোদিত ‘আমার বাংলা বই’ অনুসরণে চলে পাঠদান। ৪ থেকে ৬ বছর বয়সিদের জন্য প্রাক-প্রাথমিক এবং ১১ থেকে ১৬ বছর বয়সিদের জন্য রয়েছে কিশোর ব্যাচ।”
স্কুলের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে বাংলাদেশি শিশুদের পাশাপাশি ভারতীয় বাংলাভাষী শিশুরাও এখানে নিয়মিত অংশ নিচ্ছে। ২০২৬ সালের মার্চে প্রথম ১০ জন শিক্ষার্থীর ৫ বছর মেয়াদি প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার লক্ষ্য নিয়ে স্কুলটি এক অনন্য মাইলফলক স্পর্শ করতে যাচ্ছে।
স্কুলটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এর পরিচালনা পদ্ধতি। এখানে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর অভিভাবকই একজন শিক্ষক। পর্যায়ক্রমে ক্লাসের দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে এটি একটি সুসংগঠিত কমিউনিটিতে রূপ নিয়েছে। বর্তমানে ৭২ জন অভিভাবক-শিক্ষক এবং ২০ জন স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষক নিয়মিত পাঠদান করছেন। শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়াতে আয়োজন করা হয় প্রশিক্ষণ কর্মশালার।

আরেক উদ্যোক্তা এবিএম বায়েজীদ বলেন, “বর্ণমালা শেখার পাশাপাশি এই স্কুলে গুরুত্ব দেওয়া হয় সাংস্কৃতিক জাগরণে। ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে জাতীয় সংগীত, কবিতা, নাচ, গান ও বাংলাদেশের গৌরবময় ইতিহাস—সবই শিখছে এই নতুন প্রজন্ম।”
শুধু ভার্চুয়াল জগৎ নয়, স্টুটগার্টে আয়োজিত সরাসরি ‘মিলনমেলা’য় শিক্ষার্থীরা নিজেদের প্রতিভা প্রদর্শন করছে। ২০২৫ সালের সর্বশেষ মিলনমেলায় দুই শতাধিক মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি প্রমাণ করে এই উদ্যোগের গভীরতা।
প্রথম তিন বছর সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পরিচালিত হওয়ার পর, কার্যক্রমের পরিধি বাড়ায় ২০২৪ সালের এপ্রিল থেকে নামমাত্র ফি (সেমিস্টার প্রতি ১৫ ইউরো) নির্ধারণ করা হয়েছে। এই অর্থ ব্যয় হয় প্রযুক্তিগত রক্ষণাবেক্ষণ, সনদ প্রদান ও স্বেচ্ছাসেবীদের সম্মাননা দেওয়ার কাজে।
মিনহাজ উদ্দিন দীপন বলেন, “অলাভজনক এই প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য কোনো বাণিজ্যিক মুনাফা নয়, বরং নতুন প্রজন্মের মুখে বাংলা ভাষার বুলি ফুটিয়ে তোলা।”
উদ্যোক্তাদের মতে, বিদেশের মাটিতে বড় হওয়া একটি শিশুর নিজের ভাষায় কথা বলতে, লিখতে বা পড়তে পারাটাই তাদের সবচেয়ে বড় অর্জন। ‘কচিকাঁচার বর্ণমালা’ কেবল একটি স্কুল নয়, এটি প্রবাসে বাংলা সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখার এক শক্তিশালী দেয়াল।
ডিজিটাল এই আঙিনা থেকে আগামীর কিশোর-কিশোরীরা নিজেদের বাঙালি পরিচয়ে গর্বিত হয়ে উঠবে—এমনই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।