Published : 27 Jul 2023, 04:30 PM
পাল্টাপাল্টি অবস্থান নিয়ে রাজপথে থাকা বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের তিন সহযোগী সংগঠনকে একই দিনে তাদের পছন্দের জায়গায় সমাবেশ করার অনুমতি দিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ।
সমাবেশ ঘিরে উত্তেজনা যেন সংঘাতের দিকে না গড়ায়, সেজন্য পুলিশ দুই পক্ষকেই ২৩টি শর্ত বেঁধে দিয়েছে।
সরকার পতনের এক দফা আন্দোলনে থাকা বিএনপি শুক্রবার বেলা ২টা থেকে নয়া পল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে মহাসমাবেশ করার অনুমতি চেয়েছিল।
আর আওয়ামী লীগের তিন সহযোগী সংগঠন যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও ছাত্রলীগ শুক্রবার বেলা ৩টা থেকে বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে শান্তি সমাবেশ করার অনুমতি চেয়েছিল।
ঢাকার পুলিশ কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুক বৃহস্পতিবার বিকালে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে এসে জানান, দুই পক্ষকেই তারা অনুমতি দিয়েছেন।
তিনি বলেন, “আশুরার নিরাপত্তায় পুলিশের ব্যস্ততা রয়েছে, প্রতিদিন তাজিয়া মিছিল হচ্ছে। তারপরও বিএনপি ও যুবলীগকে তাদের পছন্দের জায়গায় ২৩টি শর্তে সমাবেশ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।”
দুই দলকেই তাদের চৌহদ্দী নির্ধারণ করে দেওয়ার কথা জানিয়ে পুলিশ কমিশনার বলেন, বিএনপির ক্ষেত্রে বলা হয়েছে নাইটিঙ্গেল মোড় থেকে পুলিশ হাসপাতালের মোড় (ফকিরাপুল) পর্যন্ত এলাকার মধ্যে তাদের মিছিল-সমাবেশ এবং মাইক ব্যবহার সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। আর আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনগুলোকে মহানগর নাট্যমঞ্চ থেকে মুক্তাঙ্গনের মধ্যে তাদের সমাবেশ এবং মাইক ব্যবহার সীমাবদ্ধ রাখতে বলা হয়েছে।
বড় দুই দলকে একই দিনে সমাবেশের অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে ঝুঁকিগুলো পর্যালোচনা করা হয়েছে, নাকি ‘সহানুভূতিশীল হয়েই’ তাদের অনুমতি দেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে খন্দকার গোলাম ফারুক বলেন, “আমাদের কাছে এই মুহূর্তে বড় কোনো থ্রেট নেই। যেহেতু বড় দুটি দলের বড় সমাবেশ তাই যে কোনো কুচক্রী মহল বা যে কেউ এই সমাবেশের সুযোগ নিয়ে আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটাতে পারে।
“এজন্য আমরা পর্যাপ্ত পুলিশ রাখব, আনসার থাকবে, আর্মড পুলিশ (এপিবিএন) থাকবে, র্যাব থাকবে, আমাদের বিজিবি স্ট্যান্ডবাই থাকবে। আমরা আমাদের সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় থাকবো।”
সমাবেশ: দুই দলের শর্ত হবে একই, জানালেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
সিদ্ধান্ত বদল, বায়তুল মোকাররমেই সমাবেশ করবে আওয়ামী লীগের ৩ সংগঠন
নয়া পল্টনে বিএনপিকর্মীদের জটলা, সতর্ক পুলিশ
বিএনপির মহাসমাবেশ হওয়ার কথা ছিল বৃহস্পতিবার। সেজন্য নয়া পল্টন অথবা সোহরাওয়ার্দী উদ্যান চেয়েছিল দলটি। এর পাল্টায় আওয়ামী লীগের তিন সহযোগী সংগঠন যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও ছাত্রলীগ বৃহস্পতিবার বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটেই শান্তি সমাবেশ করার ঘোষণা দিয়েছিল।
কিন্তু বৃহস্পতিবার কার্যদিবস হওয়ায় ঢাকা মহানগর পুলিশ কোনো দলকেই অনুমতি দিচ্ছিল না। বিএনপিকে সমাবেশের জন্য গোলাপবাগ মাঠ ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছিল পুলিশের তরফ থেকে।
এ পরিস্থিতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে কর্মসূচি এক দিন পেছানোর সিদ্ধান্ত হয়। বুধবার রাতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঘোষণা দেন, বৃহস্পতিবার নয়, তারা মহাসমাবেশ করবেন শুক্রবার বেলা ২টায়। আর সেটা নয়া পল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনেই হবে।
তখন যুবলীগও জানায়, তাদের তিন সংগঠনের শান্তি সমাবেশ একদিন পিছিয়ে শুক্রবার বিকাল ৩টায় নেওয়া হয়েছে। শেরেবাংলা নগরে পুরাতন বাণিজ্য মেলা মাঠে সেই কর্মসূচি হবে।
তবে বৃহস্পতিবার আবারও সেই সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আনে যুবলীগ। দলটির সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান জানান, শুক্রবার বায়তুল মোকাররম মসজিদের দক্ষিণ গেইটে শান্তি সমাবেশ করার জন্য আবারও অনুমতি চেয়েছেন তারা। বিকাল ৩টায় সেখানে সমাবেশ হবে।
কর্মদিবসে সমাবেশ না করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় ঢাকা মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে দুই দলকেই ধন্যবাদ জানান পুলিশ কমিশনার।
তিনি বলেন, “দুই দলের ক্ষেত্রেই আমাদের তরফ থেকে নির্দেশ ও অনুরোধ থাকবে তারা কোনো লাঠিসোঁটা কোনভাবেই সমাবেশে আনতে পারবেন না। কোন ব্যাগ বহন করতে পারবেন না। রাষ্ট্রদ্রোহী কোনো বক্তব্য কেউ দিতে পারেবন না। নির্ধারিত চৌহদ্দীর বাইরে মাইক ব্যবহার করতে পারবেন না।
“জনদুর্ভোগ এড়াতে প্রত্যেক দলই নিজস্ব ভলান্টিয়ার রাখবেন। শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রত্যেক দলই তাদের স্বেচ্ছাসেবক বা শৃঙ্খলার জন্য লোক রাখবে, যারা পুলিশকে সার্বিকভাবে সহায়তা করবে। কোনো দলই আইন-শৃঙ্খলার অবনতি হওয়ার মত কোনো কাজ করবেন না। যদি আমরা কোনো দলের পক্ষ থেকে এরকম দেখি, তাহলে আমরা কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করব।”
রাতের বেলায় রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে বলে যে অভিযোগ বিএনপি করছে, সে প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে কমিশনার বলেন, “দিন-রাতের ২৪ ঘণ্টা আমাদের চেকপোস্ট আছে। ২০১৫ সালে তাজিয়া মিছিলে বোমা হামলা হয়। আমরা সেই জঙ্গি হামলার কথা ভুলে যাইনি। আপনারা জানেন আশুরা শুরু হয়েছে। প্রতিদিনই তাজিয়া মিছিল হচ্ছে। এর মধ্যে এখানে দুইটা বড় রাজনৈতিক দলের সমাবেশ।
“এখানে যেহেতু বাইরে থেকে এসে কোনো কুচক্রী মহল দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে। সার্বিক নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে এখানে চেকপোস্টসহ সার্বিক নিরাপত্তা কার্যক্রম চলছে এবং নিয়মিত মামলা ও ওয়ারেন্টের আসামিদের গ্রেপ্তার করতে হয়। এটা আমাদের নিয়মিত অভিযানের পার্ট। আমরা এই কাজ অতীতেও করেছি, এখনো করব।”
বিভিন্ন আবাসিক হোটেলে গিয়ে সেখানে অবস্থানরতদের পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করছে, তারা যে বিএনপির সমাবেশে যোগ দিতে আসেননি এমন তথ্য-প্রমাণ দিতে হচ্ছে বলেও অভিযোগ আসছে। আবাসিক হোটেল থেকে অনেককে আটক করা হচ্ছে। বিএনপির সমাবেশ ‘ঠেকানোর জন্য’ এসব করা হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্ন করেন একজন সাংবাদিক।
জবাবে ডিএমপি কমিশনার বলেন, “জি না, এমন কোনো কিছু করা হচ্ছে না। তবুও আমার কোনো অফিসারের বিরুদ্ধে এরকম অভিযোগ পাওয়া গেলে আমরা সেটা তদন্ত করে দেখব। আমরা কোনো রাজনৈতিক দল বা কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযানে নামিনি।”
সমাবেশের সময় মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দেওয়া হয়– বিএনপির এমন অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কমিশনার বলেন, “আমি বিটিআরসি বা এনটিএমসির মেম্বার না। তবে আমার জানা মতে কোনো মোবাইল ফোনই কোনোখানে অফ করা হয় না। তবে একটা টাওয়ারের ধারণ ক্ষমতা কত? একটা টাওয়ারের ধারণ ক্ষমতা যদি ১০ হাজার হয় আর সেখানে যদি ১০ লাখ লোক থাকে, তাহলে তো সমস্যা হবেই।”
২৩ শর্ত
এই অনুমতিপত্র স্থান ব্যবহারের অনুমতি নয়, স্থান ব্যবহারের জন্য অবশ্যই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অনুমোদন নিতে হবে।
স্থান ব্যবহারের অনুমতিপত্রে উল্লেখিত শর্তাবলী যথাযথভাবে পালন করতে হবে।
বিএনপিকে পুলিশ হাসপাতালের ক্রসিং থেকে নাইটিঙ্গেল মোড়ের মধ্যবর্তী এলাকায় এবং আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনগুলোকে মহানগর নাট্যমঞ্চ, সার্জেন্ট আহাদ পুলিশ বক্স, ফুলবাড়িয়া ক্রসিং এবং মুক্তাঙ্গনের মাঝের এলাকা ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। অনুমোদিত স্থানেই সমাবেশের যাবতীয় কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখতে হবে।
কোনো অবস্থাতেই অনুমোদিত স্থানের বাইরে কোনো ধরনের জনসমাগম করা যাবে না।
নিরাপত্তার জন্য নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পর্যাপ্ত সংখ্যক স্বেচ্ছাসেবক (দৃশ্যমান আইডি কার্ডসহ) নিয়োগ করতে হবে।
স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের নির্দেশনা অনুযায়ী নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সমাবেশস্থলের ভেতরে চারদিকে উন্নত রেজ্যুলেশনযুক্ত সিসি ক্যামেরা স্থাপন করতে হবে।
নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সমাবেশে আগতদের হ্যান্ড হেন্ড মেটাল ডিটেক্টরের মাধ্যমে (ভদ্রোচিতভাবে) চেকিং এর ব্যবস্থা করতে হবে।
নিজস্ব ব্যবস্থাপনার সমাবেশস্থলে অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা রাখতে হবে।
শব্দ দূষণ প্রতিরোধে সীমিত আকারে মাইক- শব্দযন্ত্র ব্যবহার করতে হবে, কোনক্রমেই অনুমোদিত স্থানের বাইরে মাইক- শব্দযন্ত্র ব্যবহার করা যাবে না।
অনুমোদিত স্থানের বাইরে প্রজেক্টর স্থাপন করা যাবে না।
আজান, নামাজ ও অন্যান্য ধর্মীয় সংবেদনশীল সময় মাইক- শব্দযন্ত্র ব্যবহার করা যাবে না।
ধর্মীয় অনুভূতির উপর আঘাত আসতে পারে এমন কোন বিষয়ে ব্যঙ্গচিত্র প্রদর্শন, বক্তব্য প্রদান, বা প্রচার করা যাবে না।
সমাবেশের কার্যক্রম ব্যতিত মঞ্চকে অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা যাবে না।
সমাবেশ শুরুর দুই ঘণ্টা আগে লোকজন সমবেত হওয়ার জন্য আসতে পারবে।
অনুমোদিত (২টা থেকে ৫টা) সময়ের মধ্যে সমাবেশের সার্বিক কার্যক্রম শেষ করতে হবে।
কোনো অবস্থাতেই মূল সড়কে যানবাহন চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা যাবে না ।
আইন-শৃঙ্খলা পরিপন্থি ও জননিরাপত্তা বিঘ্নিত হয় এমন কার্যকলাপ করা যাবে না।
রাষ্ট্রবিরোধী কোনো কার্যকলাপ ও বক্তব্য প্রদান করা যাবে না।
উসকানিমূলক কোনো বক্তব্য প্রদান বা প্রচারপত্র বিলি করা যাবে না।
কোনো ধরনের লাঠি-সোঁটা বা ব্যানার-ফেস্টুন বহনের আড়ালে লাঠি, রড ব্যবহার করা যাবে না।
আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ও কোনো বিরুপ পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে আয়োজনকারী কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে।
উল্লেখিত শর্তাবলী যথাযথভাবে পালন না করলে তাৎক্ষণিকভাবে এই অনুমতির আদেশ বাতিল বলে গণ্য হবে।
জনস্বার্থে কর্তৃপক্ষ কোনো কারণ দর্শানো ব্যতিরেকে এই অনুমতি আদেশ বাতিল করার ক্ষমতা সংরক্ষণ করেন।