Published : 17 Jan 2026, 11:14 PM
নির্বাচন সামনে রেখে নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ‘নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশন (এনপিএ)’ আত্মপ্রকাশ করেছে।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর গড়ে ওঠা কয়েক ডজন নতুন রাজনেতিক দল ও সংগঠনের তালিকায় যোগ হওয়া এই প্ল্যাটফর্মটি নির্বাচনে কী করবে? সে কৌতুহল রয়েছে।
এনপিএর সংগঠকরা বলছেন, এনপিএর কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের সদস্যদের মধ্যে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতা, সাংস্কৃতিক কর্মী রয়েছেন, তাদের কেউ আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছেন না।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটগ্রহণের দিন রেখে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থী চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন। সে দিন একই সঙ্গে রাষ্ট্র সংস্কার প্রশ্নে গণভোট হবে।
গণতন্ত্র, সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার, প্রাণ-প্রকৃতি ও পরিবেশ সুরক্ষা- এই পাঁচ মূলনীতি সামনে রেখে শুক্রবার ঢাকার শহীদ মিনারে সমাবেশ করে এনপিএ আত্মপ্রকাশ করে।
সংগঠকরা প্ল্যাটফর্মটিকে রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন।

নতুন এই উদ্যোগে বামপন্থি সংগঠনের নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণ যেমন রয়েছেন, তেমনি আছেন এনসিপি ছেড়ে আসা নেতাও। সব মিলিয়ে ১০১ সদস্যের একটি কেন্দ্রীয় পরিষদ গঠন করেছে।
তবে কেন্দ্রীয় পরিষদের কয়েকজন সদস্য বলেছেন, রাজনৈতিক বিশ্বস্ততা ও জনসম্পৃক্ততার ওপর ভিত্তি করে কয়েকজন যোগ্য প্রার্থীকে তারা সমর্থন দিতে পারেন। এক্ষেত্রে এনসিপি থেকে পদত্যাগ করা তাসনিম জারাকে সমর্থন দেওয়ার সম্ভাবনার কথা বলেছেন এনপিএর একাধিক সদস্য।
প্ল্যাটফর্মটির কেন্দ্রীয় পরিষদ সদস্য রাফসান আর আহমেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টি ফোর ডটকম বলেন, “প্ল্যাটফর্ম হিসেবে এনপিএ আগামী নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় অংশ নিচ্ছে না। তবে, রাজনৈতিক বিশ্বস্ততা, লড়াই এবং জনসম্পৃক্ততার উপর ভিত্তি করে বেশ কয়েকজন যোগ্য প্রার্থীকে আমরা ব্যক্তি হিসেবে সমর্থন দিতে পারি।”
তিনি বলছেন, তাদের লক্ষ্য বাংলাদেশের জনগণের জন্য এমন একটি রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলা, যা দেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের প্রক্রিয়াকে তার যৌক্তিক পরিণতির দিকে এগিয়ে নেবে। একইসঙ্গে এই শক্তি সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটার পর অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উদ্যোগে প্রথম জাতীয় নাগরিক কমিটি এবং পরে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি গঠিত হয়।
এনপিএর সংগঠকদের একজন অলিক মৃ, যিনি এনসিপির উত্তরাঞ্চলের যুগ্ম মূখ্য সংগঠকের দায়িত্বে ছিলেন।
তিনি এনসিপি ছেড়ে নতুন প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হয়েছেন। কেন যুক্ত হয়েছেন?
জবাবে অলিক মৃ বিডিনিউজ টায়েন্টি ফোর ডটকমকে বলেন, “এই প্ল্যাটফর্মে আমরা বেশিরভাগ তরুণ আশা করি, আমরা দ্রুত দেশের সকল প্রান্তের মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারবো।
“জনগণের পরামর্শ নিয়ে দ্রুত একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে আবির্ভাব ঘটবে বলে আমার আত্মবিশ্বাস রয়েছে। এনপিএর নেতৃত্বে যারা আছেন প্রায় বেশিরভাগ ব্যক্তি সাংগঠনিক এবং বিভিন্ন অ্যাক্টিভিজমের সাথে যুক্ত ছিলেন, সেহেতু দেশের জনগণের এবং রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আমি মনে করি।”
পুরনো রাজনীতির বাইরে এসে নতুন কিছু করার জন্য এনসিপিতে যোগ দিয়েছিলেন বাংলাদেশ আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সাবেক সভাপতি অলিক মৃ।
এনসিপি নেতারা ‘নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত ও সেকেন্ড রিপাবলিক’ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ধরে দল গঠন করেছিলেন। কিন্তু নির্বাচন সামনে রেখে যোগ দিয়েছেন জামায়াত ইসলামীর জোটে।
তার আগেই গত সেপ্টেম্বরে খাগড়াছড়িতে স্কুলশিক্ষার্থীকে ‘সংঘবদ্ধ ধর্ষণের’ অভিযোগকে ঘিরে সহিংসতা ও তিনজন নিহতের ঘটনায় দলের নীরব ভূমিকার কারণে এনসিপি থেকে পদত্যাগ করেন অলিক।
“এনসিপি ত্যাগ করার কারণ ছিল খাগড়াছড়ির ঘটনা এবং তার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হওয়া,” বলেন তিনি।
অলিক মৃ ছাড়াও এনসিপি থেকে পদত্যাগ করা অনিক রায়, তুহিন খানও এনপিএর অন্যতম সংগঠক। এই উদ্যোগে রয়েছেন ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি ছাত্র ইউনিয়নের একাংশের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি মেঘমল্লার বসু, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক ও ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক নেতা নাজিফা জান্নাত, অধিকারকর্মী ও লেখক ফেরদৌস আরা রুমি এবং তাসলিমা মিজি।
প্ল্যাটফর্মের মুখপাত্র ফেরদৌস আরা রুমী, তুহিন খান ও নাজিফা জান্নাত।
এনপিএর কেন্দ্রীয় পরিষদে ছাত্রনেতা, শিক্ষকসহ বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধি রয়েছেন।
রাফসান আহমেদ বলেন, “ছাত্রসংগঠনের নেতৃবৃন্দরা খুব দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাদের স্ব স্ব সংগঠনের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ছাত্র রাজনীতির ইতি টানবেন।”
অনিক রায় বলছেন, তারা কেউ জাতীয় রাজনীতিতে জড়িত নন।
“আমরা একেবারেই ‘ফ্লুইড’ অবস্থায় আছি। এখনও যেহেতু আমরা সংগঠন হিসেবে গড়ে উঠি নাই, তাই আমরা চাইছি সমাজের সব অংশের মানুষের অংশগ্রহণ ও আলোচনার মধ্য দিয়ে একটা ভালো অব্স্থান তৈরি করা।”
আত্মপ্রকাশের আগে থেকে এনপিএ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এনসিপির এ প্ল্যাটফর্মটির সম্পর্ক রয়েছে কি না, এমন প্রশ্নও তুলছেন কেউ কেউ।
প্ল্যাটফর্মের কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের সদস্য পারভেজ আলম তার ফেইসবুকে দেওয়া পোস্টে বলেছেন, “এনপিএ নামটির সাথে যারা এনসিপির সম্পর্ক খুঁজছেন, তাদের বলি, এই নামটির উৎপত্তি ঘটেছে আজ থেকে প্রায় বছর খানেক আগে। হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের নাম হিসেবে। এটা ছিল একটা ব্যবহারিক নাম।”
তার আগে আসছে ‘বাংলাদেশপন্থি বামধারার’ নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম, এমন খবর সংবাদমাধ্যমে আসে।
এই বাংলাদেশপন্থি বামধারা আসলে কী, এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ।
এ বিষয়ে প্ল্যাটফর্মের অন্যতম সংসঠক ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক অনিক রায় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা খুবই দ্রুত একটি সংবাদ সম্মেলন করবো। আমাদের ব্যাপারে অনেক প্রশ্ন তো, এসব প্রশ্নের উত্তর দেব। আমরা বড় ‘সেলিব্রেটি’, বা বড় কিছু না। আমরা সবাই সংগঠক, আমরা একটা রাজনীতি বিকশিত করতে চাই। দ্রুতই সংবাদ সম্মেলন করবো, কয়েকদিনের মধ্যেই।”
নির্বাচনে কী করবেন, কাউকে সমর্থন দেবেন কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আগামী নির্বাচন আমাদের গুরুত্বের মধ্যে আছে। গণভোটের এজেন্ডা আছে, আমাদের নিজস্ব বক্তব্য আছে। জুলাই সনদের অধিকাংশ সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে কিছু বিষয়ে আমাদের দ্বিমত, অবস্থান থাকলেও, আমরা মনে করি এটা জরুরি।
“নির্বাচনকে আমরা সিরিয়াস পয়েন্টে দেখবো, তবে কোনো প্রার্থীকে সমর্থন দেব কি না, এখনো সিদ্ধান্ত নিই নাই। নির্বাচন নিয়ে আমাদের বক্তব্য থাকবে।”
তরুণদের বিষয়ে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবির সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
বর্তমানে সিপিবির সভাপতিমণ্ডলীর এই সদস্য বিডিনিউজ টোয়েন্টি ফোর ডটকমকে বলেন, “আগে তাদের কাজকর্ম দেখতে হবে, তারপর বলার সুযোগ হবে।”