Published : 23 Sep 2025, 06:04 PM
পিআর বা সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে ভোটের দাবিতে জামায়াতে ইসলামীর সরব হওয়া আদতে বিএনপির ওপর ‘চাপ সৃষ্টির কৌশল’ বলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের যে ভাষ্য প্রকাশ পেয়েছে, তার প্রতিবাদ জানিয়েছে ইসলামী দলটি।
সম্প্রতি কলকাতার দৈনিক ‘এই সময়’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিএনপি মহাসচিব বলেন, তাদের কাছে ‘৩০টি আসন’ চেয়েছিল জামায়াত। এর জবাবে ‘অনেক কম’ সংখ্যার কথা বলেছে বিএনপি, যা তাদের ‘মনঃপূত হয়নি’।
“জামায়াতকে আর আমরা মাথায় উঠতে দেব না। তারা যত বড় না শক্তি, আমরা অকারণে তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছি।”
এর প্রতিক্রিয়ায় জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে বলেন, “এ ধরনের সম্পূর্ণ অসত্য, অমর্যাদাকর ও প্রতিহিংসাপরায়ণ বক্তব্য মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মত প্রবীণ রাজনীতিবিদ দিয়েছেন তা বিশ্বাস করতে আমাদের কষ্ট হয়। এই বক্তব্যের সাথে সত্য ও শিষ্টাচারের কোনো মিল নেই।
“যদি এ বক্তব্য তার হয়ে থাকে, তবে বাধ্য হয়ে আমরা তার প্রতিবাদ ও নিন্দা জ্ঞাপন করছি। পাশাপাশি এই বক্তব্য যদি তার হয়ে থাকে–তাহলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী কার কাছে এই আসনগুলো দাবি করেছে–তার প্রমাণ জাতির কাছে উপস্থাপন করার জন্য দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে আহবান জানাচ্ছি।”
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ‘স্বাভাবিকভাবে’ তার মূল নেতৃত্বের অধীনে পরিচালিত হয় মন্তব্য করে গোলাম পরওয়ার বলেন, “কারো কাছে আসন চাওয়ার রাজনীতির সাথে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান সময়ে দূরতম কোনো সম্পর্ক নেই।
“তিনি যদি তার বক্তব্যের পক্ষে প্রমাণ উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হন, তাহলে আমরা আহ্বান জানাব সত্যকে মেনে নিয়ে তিনি তার বক্তব্যের জন্য ন্যূনতম পক্ষে জনগণের সামনে দুঃখ প্রকাশ করবেন।”
সাক্ষাৎকারে ফখরুল বলেন, “পিআর-টিআর সবই বিএনপির উপরে চাপ সৃষ্টির কৌশল। জামায়াত কিন্তু নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিভিন্ন জায়গায় প্রার্থীর নাম ঘোষণা করছে।”
ফখরুলের কাছে ‘এই সময়’র প্রশ্ন ছিল, প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস বলছেন, ফেব্রুয়ারিতে ভারতের প্রভাব ছাড়া নির্বাচন ও সরকার গঠন হবে। সত্যিই কি বাংলাদেশে ভারতের কোনো প্রভাব আর অবশিষ্ট নেই?
জবাবে বিএনপি মহাসচিব বলেন, “ভারত মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী। সেই সময়ে এক কোটি মানুষকে আশ্রয় দিয়েছে ভারত। ভৌগোলিকভাবেও বাংলাদেশের তিন দিকে ভারত, একদিকে সাগর। সুতরাং ভারতের প্রভাব বাংলাদেশে থাকবেই। সমস্যা হল, বাংলাদেশ বলতে শুধু আওয়ামী লীগকে বুঝেছে ভারতের শাসকেরা।
“আওয়ামী লীগের ভাষ্য মেনে বিএনপি আর জামায়াতকে একই বন্ধনীতে ফেলেছে। জামায়াত আর বিএনপির রাজনীতি তো এক নয়। আমরা অসাম্প্রদায়িক, মধ্যপন্থী একটি গণতান্ত্রিক দল। মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত সংবিধান রক্ষায় আজও আমরা স্বাধীনতাবিরোধীদের সঙ্গে লড়াই করছি। বামেরা আমাদের সঙ্গে রয়েছে।”
এর প্রতিবাদে জামায়াতের বিবৃতিতে গোলাম পরওয়ার বলেন, “বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি এবং সংগঠনের মর্যাদা সম্পর্কে তিনি যে তাচ্ছিল্যের ভাষায় কথা বলেছেন, তার বিচারের ভার জনগণের আদালতের উপর ছেড়ে দিলাম। প্রিয় জনগণের উপর আমাদের যথেষ্ট আস্থা রয়েছে।
“আমাদের কার্যক্রম দেশ ও জনগণের জন্য। মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনই আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য। আমাদের ভরসার মূল জায়গা মহান রবের করুণা ও সাহায্য। ভবিষ্যতে এ ধরনের অসত্য ও বিভ্রান্তিকর বক্তব্য প্রদান থেকে বিরত থাকার জন্য আহ্বান জানাচ্ছি।”
ভোটের সমীকরণ
জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বিএনপির বন্ধুত্ব দীর্ঘদিনের হলেও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দল দুটির দূরত্ব স্পষ্ট হয়েছে।
বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে সমঝোতায় ভোটের রাজনীতিতে কতটা প্রভাব পড়ে, সেটি প্রথম ফুটে ওঠে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে।
ওই নির্বাচন নিয়ে জামায়াত নেতা মুজিবুর রহমানের লেখা একটি বইয়ের তথ্য বলছে, পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে জামায়াতকে অঘোষিতভাবে ৩৫ আসনে সমর্থন দেয় বিএনপি। আর বিএনপিকে শতাধিক আসনে ভোট দেয় দলটি। সেই নির্বাচনে বিএনপি আসন পায় ১৪০টি, জামায়াত পায় ১৮টি। আর আওয়ামী লীগ পায় ৮৮ আসন। ওই নির্বাচনে দুই প্রধান দলের ভোট ছিল একেবারেই কাছাকাছি।
এরপর ২০০১ সালের অষ্টম সংসদ নির্বাচনে ফের জোট বাঁধে বিএনপি ও জামায়াত। শুরুতে সঙ্গে ছিলেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদও। জাতীয় পার্টি সেই জোট থেকে বের হয়ে গেলে তার দলের একটি অংশ এবং কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক দলগুলোর মোর্চা ইসলামী ঐক্যজোট মিলে লড়াই করে আওয়ামী লীগের সঙ্গে।
সেই নির্বাচনে বিএনপি একাই পায় ১৯৩টি আসন। জামায়াত পায় ১৭টি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি বা বিজেপি চারটি, ইসলামী ঐক্যজোট পায় দুটি আসন।
ওই বছর আওয়ামী লীগ আসন পায় ৬২টি। এর মধ্যে উপনির্বাচনে দলটি আরও চারটি আসন হারিয়ে ফেলে। শেষ পর্যন্ত আসন দাঁড়ায় ৫৮তে।
সেই নির্বাচনে বিএনপি ভোট পায় ৪১ দশমিক ৪০ শতাংশ। আর আওয়ামী লীগ পায় ৪০ দশমিক ০২ শতাংশ। জামায়াতের ভোট ছিল ৪ দশমিক ২৮ শতাংশ।
২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে তৈরি হয় নতুন সমীকরণ। ওই বছর আওয়ামী লীগও ভোটে নামে জোটের শক্তি নিয়ে। জাতীয় পার্টির একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোট যোগ হওয়ার পর বিএনপির জোট আর পাত্তা পায়নি।
সেই নবম সংসদ নির্বাচনে ৪৮ দশমিক ০৪ শতাংশ ভোট পেয়ে আওয়ামী লীগ আসন পায় ২৩০টি। এই ভোটের মধ্যে জাতীয় পার্টি ও অন্য শরিকদের সমর্থকদের অংশগ্রহণও ছিল।
আর বিএনপির ধানের শীষে ভোট পড়ে ৩২ দশমিক ৫০ শতাংশ। আসন হয় ৩০টি।
জোটের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে জাতীয় পার্টিও পায় ২৭টি আসন। আওয়ামী লীগের ভোটাররাও লাঙ্গলে সিল দেয়ার পর দলটির ভোট দাঁড়ায় ৭ দশমিক ০৪ শতাংশ, যা ছিল আগের নির্বাচনের চেয়ে বেশি।
ওই নির্বাচনে জামায়াতের দাঁড়িপাল্লায় ভোট পড়ে ৪ দশমিক ৭০ শতাংশ, যা আগের নির্বাচনের চেয়ে বেশি, তবে আসন কমে হয় দুটি।
২০১৩ সালে নিবন্ধন বাতিল হওয়ায় এরপর আর দলীয়ভাবে নির্বাচন করতে পারেনি জামায়াত।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জামায়াত নিবন্ধন ফিরে পেয়েছে, অন্যদিকে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর মধ্যে পিআর পদ্ধতির ভোটে সরব হয়েছে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ কয়েকটি দল। অন্যদিকে বিএনপি এ পদ্ধতির প্রবল বিরোধিতা করে আসছে।