Published : 25 Jun 2026, 08:52 PM
আলোচিত বসুন্ধরা গ্রুপের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলার অগ্রগতি জাতীয় সংসদে জানতে চেয়েছেন কুমিল্লা-৪ আসনের জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ।
বসুন্ধরার সঙ্গে সরকারের কোনো ‘আন্ডারটেবিল সমঝোতা’ হয়েছে কি না, সে প্রশ্নও করেছেন তিনি।
যাদের বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থ পাচার, মানুষের সম্পদ দখল এবং গণমাধ্যম ব্যবহার করে ‘গুম-খুন-হত্যাকে বৈধতা’ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জানান জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক দলের এই নেতা।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, “অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় দুর্নীতি দমন কমিশন বসুন্ধরার বিরুদ্ধে মামলা করেছে। এই মামলার কী অগ্রগতি হয়েছে, সেটা আমরা জানতে চাই।”
তিনি বলেন, “আমরা জানতে চাই, আন্ডারটেবিল কোনো ধরনের সমঝোতা হয়েছে কি না। যদি সমঝোতা না হয়ে থাকে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে বাধাটা কোথায়, সেটা বাংলাদেশের মানুষের সামনে প্রকাশ করতে হবে।”
‘তাদের খুঁটির জোর কোথায়’
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রকাশিত অর্থনীতির শ্বেতপত্রের প্রসঙ্গ টেনে বিরোধী জোটের এমপি হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, সেখানে ২৮ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচারের কথা বলা হয়েছে।
তিনি বলেন, “যারা টাকা পাচার করেছে, তারা সদর্পে এখন গুলশান, বনানী ও ধানমণ্ডি, এই দেশে এখন বুক ফুলিয়ে চলাফেরা করছে।”
বসুন্ধরা গ্রুপের কথা তুলে ধরে এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত বলেন, “অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় বসুন্ধরার পুত্র (বসুন্ধরা চেয়ারম্যান) সোবহান দেশে ঢাকার সাহস পায় নাই। আমরা দেখেছি আনভীর দেশে ঢোকার সাহস পায় নাই। কিন্তু এই সরকার নির্বাচিত হয়ে আসার পরে আমরা দেখেছি সদর্পে এই সোবহানের পুত্র, এই ‘ধর্ষক’ দেশে ঢুকেছে।”
তিনি বলেন, “এই বসুন্ধরা গ্রুপ, যারা বিদেশে টাকা পাচার করেছে, মানুষের সম্পদ দখল করেছে এবং মিডিয়ার মধ্য দিয়ে যারা আওয়ামী লীগের গুম, খুন, হত্যার বৈধতা দিয়েছে, তাদের খুঁটির জোর কোথায়, সেটা আমরা জানতে চাই।”
‘সরকার দলের কেউ কেউ বসুন্ধরার এডভাইজর’
হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, “আমরা শুনে পাই, বললে অনেকে রাগ করে।”
এ পর্যায়ে অধিবেশনের সভাপতি ডেপুটি স্পিকার বলেন, “মাননীয় সদস্য আপনার সময় শেষ গেছে, তারপরও চিফ হুইপ মহোদয় অনুরোধ করেছেন, আরো তিন মিনিট বাড়ানো হল।”
সভাপতিকে ধন্যবাদ দিয়ে এনসিপির এই সদস্য বলেন, “আমরা শুনতে পেয়েছি, বা দেখতে পাই এবং সরকার দলের অনেকেই মাঝে মাঝে আমাদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন যে, ‘আসলে আমরা জেল খেটেছি, আমরা কষ্ট করেছি, আমাদের সন্তানদের সঙ্গে আমরা থাকতে পারি নাই; কিন্তু আমাদের দলেরই কিছু কিছু মানুষ বসুন্ধরার অ্যাডভাইজর হিসেবে কাজ করে’।
“তাদের মিডিয়ার অ্যাডভাইজর হিসেবে কাজ করে।”
বসুন্ধরার গণমাধ্যম নিয়ে অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, “যে মিডিয়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ‘দেশদ্রোহী’ হিসেবে ‘ফ্রেমিং’ করেছে, সেই মিডিয়ার অ্যাডভাইজর হিসেবে আজকে বসুন্ধরা গ্রুপে, আজকে সরকারদলীয় সংসদ সদস্যদের অনেকেই তারা সেখানে যুক্ত।”
“এটা আমাদের জন্য না, বরং তাদের সহকর্মীদের জন্য এটি তাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়, সেটি আমরা জানি।”
‘মিডিয়া লেলিয়ে দেওয়া হয়’
বসুন্ধরার মালিকাধীন সংবাদমাধ্যমের অপব্যবহারের কথা তুলে ধরে কুমিল্লা-৪ আসনের এই সংসদ সদস্য বলেন, “এই বসুন্ধরার বিরুদ্ধে যারা কথা বলে, তাদের বিরুদ্ধে মিডিয়া লেলিয়ে দেওয়া হয়।”
ঋণখেলাপি, ব্যাংক দখল, গণতন্ত্রের পথ রুদ্ধ করা এবং গুম-খুনের বৈধতা তৈরির অভিযোগ যাদের বিরুদ্ধে রয়েছে বিরুদ্ধে বিএনপির তরফে কঠোর ব্যবস্থা দেখতে চান হাসনাত আব্দুল্লাহ।
‘প্রতিশোধ নয়, সুবিচার চাই’
অতীতের ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী প্রতিশোধপরায়ণ হন তুলে ধরে এনসিপির এই নেতা তাকে স্বাগত জানান। তবে তিনি বলেন, “প্রতিশোধপরায়ণ না হওয়া আর সুবিচার নিশ্চিত না করা, দুইটা এক নয়।
“তিনি ব্যক্তিগত রাগ-ক্ষোভের উর্ধ্বে উনি উঠতে পেরেছেন। কিন্তু আমরা এটা ওনার কাছ থেকে শুনতে চাই, ওনার দলের কাছ থেকে শুনতে চাই, গুম-খুনের, হত্যার উনি সুবিচার নিশ্চিত করবেন। উনি আইনের শাসন নিশ্চিত করবেন এবং এতদিন ধরে যারা মিডিয়াকে, যারা নিয়ন্ত্রিত মিডিয়ার মাধ্যমে এই ‘ফ্যাসিবাদের’ পক্ষে যারা বয়ান উৎপাদন করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে উনি সুবিচার নিশ্চিত করবেন।
“আমাদের প্রতিহিংসার কথা বলছি না, প্রতিশোধপরায়নতার কথা বলছি না।”
সম্পাদকের বিরুদ্ধে মামলা নিয়ে প্রশ্ন
রাজনৈতিক প্রতিহিংসার রাজনীতি আবার শুরু হচ্ছে কি না, তা নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করেন হাসনাত।
তিনি বলেন, “একজন সরকারদলীয়, একজন প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কথা বলায় মিডিয়ার একজন সম্পাদকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে মাননীয় স্পিকার। এটা খুবই দুঃখজনক। ওনাকে জেলে নেওয়া হয়েছে একজন প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কথা বলায়।”
এ প্রসঙ্গে স্পিকারের কাছে সুরক্ষা চেয়ে হাসনাত বলেন, “আমি আপনার প্রটেকশন দাবি করছি। কারণ আমরাও বলতে ভয় পাই। কারণ আমরা যদি সরকারের সমালোচনা করি, কোনো প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কথা বলি, মন্ত্রীর বিরুদ্ধে কথা বলি, আমার এলাকার বাজেট বন্ধ করে দিবে না, সেটার কিন্তু নিশ্চয়তা নাই।”
“সে কারণে আমাদের মধ্যে অনেকেই কথা বলার সময় আওয়াজটা একটু কম করে বলেন।”
তিনি বলেন, “আমার জন্য আমার এলাকার মানুষকে যেন বঞ্চিত করা না হয়।”
বাজেট নিয়ে সমালোচনা
বাজেটের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা, বিনিয়োগে করের চাপ, মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, ঋণখেলাপি ও পাচার হওয়া টাকা ফেরত আনার নীতি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন হাসনাত আব্দুল্লাহ।
তিনি বলেন, বাজেটকে কেউ ‘ওভার অ্যাম্বিশাস’, কেউ ‘বাস্তবায়ন অযোগ্য’, আবার কেউ ‘সাহসী’ বলছেন; তিনি এসব বিশেষণের ঊর্ধ্বে উঠে বাজেটের অসঙ্গতি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে চান।
রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে হাসনাত বলেন, গত অর্থবছরে রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। ১১ মাসে আদায় হয়েছে ৪ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকার মতো। শেষ মাসের আদায় যোগ করলেও নতুন বাজেটে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবসম্মত কি না, তা প্রশ্নের বিষয়।
এনবিআরের সক্ষমতা বিবেচনায় রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন তিনি।
বর্তমান মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৪ শতাংশ এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১২ শতাংশের বেশি, এ কথা তুলে ধরে হাসনাত বলেন, বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামানোর লক্ষ্য ধরা হয়েছে।
তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি কমানোর স্বীকৃত উপায় দুটি, সুদহার বাড়ানো অথবা সরকারি ব্যয় কমানো। কিন্তু বড় ব্যয় ও ঋণনির্ভর অর্থনীতি রেখে মূল্যস্ফীতি কীভাবে কমবে, তা স্পষ্ট নয়।
হাসনাত বলেন, “আপনি একই সাথে বলছেন, আপনি মাছ মুচমুচে করে ভাজবেন। আবার একই সাথে বলছেন, আপনি তেলটা কম দিবেন। এই যে স্ববিরোধী অবস্থানটা, এটা আমাদের সাধারণ মানুষের কাছে স্পষ্ট হতে হবে।”
নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম কমানোর কথা বলার পাশাপাশি কাপড়, রড, সিমেন্টসহ ১৬টি পণ্যে কর বসানোর প্রস্তাবকে সাংঘর্ষিক বলেন তিনি।
বিক্রেতা শেষ পর্যন্ত করের বোঝা ক্রেতার ওপর চাপাবে, ফলে নিত্যপণ্যের দাম কমবে না বলে মনে করেন এনসিপির এই সংসদ সদস্য।
চার মাসে ৬ লাখ কর্মসংস্থানের হিসাব চান
নির্বাচনের আগে পাঁচ বছরে এক কোটির বেশি কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতির প্রসঙ্গ তুলে হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, সে হিসাবে মাসে দেড় লাখের বেশি কর্মসংস্থান হওয়ার কথা।
তিনি বলেন, চার মাসে ৬ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হওয়ার কথা ছিল। বাস্তবে কত কর্মসংস্থান হয়েছে, তা অর্থমন্ত্রীর কাছে জানতে চান তিনি।
ঋণখেলাপিদের সদস্যপদ বাতিলের আইন চান
ঋণখেলাপিদের নিয়ে কড়া সমালোচনা করে হাসনাত বলেন, ‘ঋণ করো, ঘি খাও’ প্রবাদকে সরকারি দলের কিছু সদস্য যেন ‘ঋণ করো, ঋণখেলাপি হও, তাও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করো’ হিসেবে নিয়েছেন।
তিনি অভিযোগ করেন, নির্বাচনের আগে ঋণখেলাপিরা আদালতে গিয়ে স্থগিতাদেশ নেন, পরে ২ শতাংশ দিয়ে ঋণ পুনঃতফসিল করেন, নির্বাচনে অংশ নেন; এরপর পাঁচ বছর আর খোঁজ থাকে না।
হাসনাত বলেন, “জনগণের টাকা নিয়ে এই বিলাসিতা বন্ধ করতে হবে এবং ঋণখেলাপিদেরকে ঋণখেলাপি বলতে হবে।”
তিনি বলেন, “আমরা লজ্জা পাই একই সংসদ একসাথে শেয়ার করার জন্য। কারণ তারা জনগণের টাকা মেরে, ব্যাংক থেকে তুলে নিয়ে ঋণখেলাপী হয়ে আবার জনগণের প্রতিনিধিত্ব করতে আসেন।”
ঋণখেলাপি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে বা নির্বাচিত হওয়ার পর ঋণখেলাপি হলে তার সদস্যপদ বাতিলের আইন করার দাবি জানান তিনি।