Published : 06 Jan 2026, 06:32 PM
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ ও গণভোট সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষাভাবে হবে কি না, তা নিয়ে ‘শঙ্কা’ প্রকাশ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির মুখপাত্র, দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।
নির্বাচনের আগে ‘একটি নির্দিষ্ট দলের’ প্রতি প্রশাসন এক ধরনের একতরফা পক্ষপাতিত্বের পরিচয় দিচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছেন তিনি।
মঙ্গলবার নির্বাচন কমিশনে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে দেখা করার পর বিকালে এক ব্রিফিংয়ে আসিফ মাহমুদ এই অভিযোগ তোলেন।
জুলাই অভ্যুত্থানের সামনের সারির এই নেতা বলেন, “খুবই দুঃখের সাথে আমরা একটা জিনিস প্রত্যক্ষ করেছি যে বিগত কিছুদিনে সাম্প্রতিক একটি দলের চেয়ারপার্সন দেশে এসেছেন। আমরা অবশ্যই তাকে আমরা আমাদের পার্টির পক্ষ থেকেও, সকলের পক্ষ থেকে ব্যক্তিগতভাবেও স্বাগত জানিয়েছি। তবে তারপরে আমরা যেটা দেখলাম, সেটা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য একটা অশনি সংকেত।
“আমরা দেখলাম, বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তারা, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানরা একটা পার্টি অফিসের দিকে তাদের কেবলা ঠিক করে ফেলেছেন। তারা সেখানে নিয়মিত যাচ্ছেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টার পদ ছেড়ে সদ্য এনসিপিতে যোগ দেওয়া আসিফ মাহমুদ বলেন, “আমরা মনে করছি এটা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য হুমকি স্বরূপ। আমরা বিগত সময়ে যেই বাজে চর্চাগুলো দেখে এসেছিলাম, আওয়ামী ফ্যাসিবাদের সময়ে, সেগুলো আবারো দেখা যাচ্ছে।”
গেল ২৫ ডিসেম্বর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ১৭ বছর পর লন্ডন থেকে দেশে ফেরেন। ৩০ ডিসেম্বর তার মা বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা মারা যান।
বাংলাদেশে প্রশাসনের সবসময় ক্ষমতাসীনদের দিকে ‘ঝোঁক থাকে’ মন্তব্য করে এনসিপির মুখপাত্র বলেন, “কিন্তু ক্ষমতাসীন হওয়ার আগেই, মানুষের জনরায় প্রকাশিত হওয়ার আগেই, এ ধরনের ধৃষ্টতা আমরা কোনোভাবেই মেনে নেব না।”
কোন গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান একটা দলের প্রধানের সঙ্গে দেখা করেছেন তা সাংবাদিকরা জানতে চাইল আসিফ মাহমুদ বলেন, “আমরা দেখলাম যে এনএসআইয়ের প্রধান, তিনি একটা দলের প্রধানের সাথে পার্টি অফিসে গিয়ে সাক্ষাৎ করেছেন। যদি কোনো ধরনের নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ে সাক্ষাৎ করার বিষয় থাকে, সেটা যেকোনো রাজনৈতিক দলের সাথে গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানরা হয়তো সাক্ষাৎ করতে পারেন।
“কিন্তু সেটা পার্টি অফিসে যাওয়াটা আমাদের জন্য অশনি সংকেত বলে আমরা মনে করি এবং সরকারি কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক, এটাও নিয়মবহির্ভূত এবং এটাও নির্বাচন ও ভোটাধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে জনগণের মধ্যে একটা শঙ্কা তৈরি করছে।”
এদিন আসিফ মাহমুদের নেতৃত্বে এনসিপির একটি প্রতিনিধি দল নির্বাচন কমিশনে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে দেখা করতে আসেন। সাক্ষাৎ শেষে বের হয়ে সাংবাদিকদের মুখমুখি হন আসিফ।
আসিফ মাহমুদের মতে, ওই কর্মকর্তারা একটি দলের কার্যালয়ে গিয়ে সরকারি চাকরি বিধিমালা, সেটা লঙ্ঘন করেছেন।
“একই সাথে বাংলাদেশের মানুষের আগামী নির্বাচনে জন রায় দেওয়ার এবং ভোটাধিকার প্রয়োগ করার যে একটা উৎসাহ ছিল, সেই উৎসাহেও ভাটা পড়েছে। আমরা সরকারকে আহ্বান জানাবো, যারা সেখানে গিয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে এবং এটা জনগণের কাছে নিশ্চিত করতে যে জনগণের ভোটাধিকার দেওয়ার জন্য এখনো সুযোগ বাকি আছে।”
সিলেট-১ ও সিলেট-৩ আসনে প্রশাসনের কর্মকর্তারা একটি দলের প্রতি পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণ করছেন বলেও অভিযোগ করেন এই সাবেক উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, “আমরা মনে করি যে স্পষ্টভাবেই একটি নির্দিষ্ট দলের প্রতি, একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর প্রতি প্রশাসনের এক ধরনের একতরফা এবং পক্ষপাতিত্বের পরিচয়, আমরা এই দুটি আসন নির্দিষ্টভাবে দেখছি এবং এর বাইরেও অন্তত আরও একশটি উদাহরণ আছে।
“আপনারাই কাভার করেছেন মিডিয়ার মাধ্যমে আমরা দেখেছি, খুব নেক্কারজনকভাবে একজন স্বতন্ত্র প্রার্থীকে সরকারি অফিসেই ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়ার মতো ঘটনা মানিকগঞ্জে আমরা দেখেছি।”
এ ধরনের ঘটনা প্রার্থী ও ভোটারদের জন্য ‘আশঙ্কার’ বিষয় মন্তব্য করে এনসিপিটির মুখপাত্র ও দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান বলেন, “শঙ্কার বিষয় যে এই নির্বাচনটা কি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং মানুষের ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে সম্পন্ন হবে; নাকি যেটা বিগত তিনটা নির্বাচনে আমরা দেখে এসছি, প্রশাসনের এক ধরনের পক্ষপাতিত্ব, একতরফা আচরণ, ব্যালট পূরণ করে রাতের ভোট।
“এই ধরনের একটা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে, একটা ‘সেটেলমেন্টের’ মধ্য দিয়ে নির্বাচনটা হয়ে যাবে; এ ধরনের একটা শঙ্কা বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে তৈরি হয়েছে।”
পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণের ঘটনাগুলোর বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ ও প্রার্থীদের আপিলের ক্ষেত্রে যেন পক্ষপাতিত্ব না হয় তা নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশনকে আহ্বান জানিয়েছেন বলেও তুলে ধরেন আসিফ মাহমুদ।
সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের ওপর নির্ভর করতে পারছেন কি-না এমন প্রশ্নের উত্তরে এনসিপির মুখপাত্র বলেন, “এই বিষয়টা আপেক্ষিক। এই বিষয়ে আমরা নির্বাচনের পরের দিন বলতে পারব যে এই কমিশন কতটুকু সুষ্ঠ এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে পারলো, কি পারলো না?
“তবে এখন পর্যন্ত আমরা যেই লক্ষণগুলো দেখেছি, যাচাই বাছাইয়ের ক্ষেত্রে বলেন কিংবা এখন পর্যন্ত আমরা দেখি যে আচরণবিধি অনেক জায়গায় লঙ্ঘিত হচ্ছে। আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন জায়গায় দেখি পোস্টার ঝুলছে। যেটা স্পষ্টভাবেই এখন করার সুযোগ নেই।
“আমরা বিভিন্ন প্রার্থীদেরকে দেখি যে তারা বিভিন্ন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হচ্ছেন। যেটা স্পষ্টভাবে নির্বাচনি আচরণবিধির লঙ্ঘন। এখনও পর্যন্ত আমরা সম্পূর্ণ আস্থা রাখতে পারছি না। আমরা তাদেরকে ক্রিটিক্যালি দেখছি। তবে এটা তাদেরকে প্রমাণ করতে হবে যে কতটুকু সুষ্ঠু নির্বাচন তারা আয়োজন করতে পারবেন এবং এই বিষয়গুলোতে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে, দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে আস্থাটা তাদের প্রতি তাদের নিজেদেরকেই ফিরিয়ে আনতে হবে।”
নির্বাচন নিয়ে দলীয়ভাবে এনসিপির শঙ্কা আছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমরা যখন দেখি যে একজন প্রার্থীকে সরকারি অফিসেই ঘাড় ধাক্কা দেওয়া হচ্ছে তখন তো স্পষ্টভাবেই এই শঙ্কা আমাদের মধ্যেও কাজ করে। আমরা যখন দেখি যে বিভিন্ন এলাকায় এলাকায় সন্ত্রাসীরা ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং আমরা দেখি যে বিভিন্ন জায়গায় প্রশাসন পক্ষপাতিত্ব করছে, তখন এই শঙ্কাগুলো আমাদের মধ্যে অবশ্যই আছে।
“আমরা এক্ষেত্রে ধৈর্য সহকারে সরকার নির্বাচন কমিশনসহ সকলকে আমাদের জায়গা থেকে তথ্য দিয়ে এবং প্রয়োজনে তারা যদি চায় আমরা মাঠে আমাদের শক্তি দিয়েও তাদেরকে সহযোগিতা করতে চাই একটা সুষ্ঠ নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে। তবে এক্ষেত্রে তাদের সদিচ্ছাটা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এখন পর্যন্ত আমরা যে লক্ষণ দেখছি তাতে অবশ্যই স্বাভাবিকভাবেই সকলের মধ্যে এই শঙ্কাটা রয়েছে। তবে এই শঙ্কা দূর করার দায়িত্ব সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের।”
সুষ্ঠ নির্বাচন আয়োজন, নাকি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া নিয়ে এনসিপির ‘শঙ্কা’-এমন প্রশ্নের উত্তরে আসিফ মাহমুদ বলেন, “সবকিছু নিয়েই শঙ্কা রয়েছে। তবে এটা আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ। গণতান্ত্রিক রূপান্তরটাকে সুষ্ঠভাবে বাস্তবায়ন করা; এটা যেমন সরকার ও নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বই ৮০-৯০ শতাংশ, তবে রাজনৈতিক দল, দেশের জনগণসহ সকল স্টেকহোল্ডারদের দায়িত্ব এই দেশের ভবিষ্যৎ যেন একটা সুন্দর গণতান্ত্রিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে; একটা সুন্দর ভবিষ্যতের দিকে আমরা যেতে পারি সেটা নিশ্চিত করা।”
নির্বাচনকেন্দ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খুবই হতাশাজনক বলে তুলে ধরে এনসিপির মুখপাত্র বলেন, “যেহেতু তফসিলের পরের দিনই আমরা দেখেছি, যে একজন চিহ্নিত আসামি, যিনি জামিনে বের হয়েছিলেন কিছুদিন আগে, তার হাতে আমাদের একজন সহযোদ্ধা শহীদ হয়েছেন এবং এর ফলেই কিন্তু এই নির্বাচন নিয়ে শঙ্কাটা মানুষের মনে আরও বেশি তৈরি হয়েছে। এখন পর্যন্ত আমরা সেভাবে দৃশ্যমান আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিও নির্বাচনকেন্দ্রিক আমরা লক্ষ্য করতে পারছি না। আগে যেরকম ছিল সেরকমই দেখা যাচ্ছে।”
নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসন পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণ করলে রাজপথে নামার হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, “আমরা যদি দেখি যে তারা কোনোভাবে এই নির্বাচনকে একতরফা কোনো একটা নির্বাচন আয়োজনের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন, যেটা আমরা ইতোপূর্বেই শঙ্কা প্রকাশ করেছি যে একটা পার্টির পলিটিক্যাল অফিসের দিকে আমরা দেখছি যে নিয়ম বহির্ভূতভাবে অনেক সরকারি কর্মকর্তারা এবং গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানরা যাওয়া শুরু করেছেন।
“এই বিষয়গুলো যদি এভাবেই চলতে থাকে এবং আমরা যদি দেখি বাংলাদেশে আরো একটি পাতানো নির্বাচনের প্লট সাজানো হচ্ছে; তাহলে অবশ্যই তখন আমাদেরকে রাজপথ বেছে নিতে হবে।”
জাতীয় পার্টির নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসিফ বলেন, “আমরা চাই না যে ফ্যাসিবাদের যারা দোসর আছেন এবং বিগত ফ্যাসিবাদকে যারা বিভিন্ন উপায়ে বৈধতা দিয়েছেন, তারা যেন কোনোভাবেই এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করতে পারেন।
“এর বাইরেও আমরা শঙ্কার সাথে লক্ষ্য করেছি, কিছু জায়গায় ‘জুলাই অভ্যুত্থানে’ হত্যা মামলার আসামি এবং এমনও আছেন যারা পাঁচ পাঁচটি হত্যা মামলার আসামি; তাদেরও মনোনয়নপত্র বৈধ বলে গৃহীত হয়েছে এবং স্থানীয়ভাবে তারা ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের যারা দোসর আছেন তাদের অর্থ, তাদের মাফিয়া এবং মাস্তানদেরকে নিয়ে এক ধরনের নির্বাচনি মহড়ার দিকে যাচ্ছেন। সেটির ক্ষেত্রেও সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং প্রশাসনকে আরো শক্ত অবস্থান নিতে হবে।”