Published : 04 Sep 2025, 08:11 PM
প্রশাসনিক ও বিচারিক ব্যবস্থায় ‘গোষ্ঠীগত স্বার্থরক্ষা’ ও ‘ফ্যাসিস্ট কাঠামোর’ বদৌলতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরের এক বছরে অন্তর্বর্তী সরকার ‘শেখ হাসিনা সরকারকে ফিরিয়ে এনেছে’ বলে অভিযোগ করেছে নাগরিক সংগঠন গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি।
বৃহস্পতিবার সংগঠনের এক বিবৃতিতে বলা হয়, “অনেক শ্রমজীবী মানুষের রক্তের বদলে ফ্যাসিবাদের পতন হয়েছে। অথচ গণঅভ্যুত্থানের পর প্রথম বিনাবিচারে হত্যা করা হয়েছে শ্রমিককে।”
শ্রমিক ছাঁটাইয়ের প্রতিবাদে গত মঙ্গলবার উত্তরা ইপিজেডের আন্দোলনকে ‘ন্যায্য আন্দোলন’ হিসেবে বর্ণনা করে বিবৃতিতে বলা হয়, সেই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী এভারগ্রিন কারখানার শ্রমিক মো. হাবিব ইসলামকে ‘রাষ্ট্রীয় যৌথবাহিনী হত্যা করেছে’।
অন্তর্বর্তী সরকার ‘স্বেচ্ছাচারী’ ভূমিকা গ্রহণ করেছে অভিযোগ করে বিবৃতিতে বলা হয়, “দেশের আইন শৃঙ্খলার পরিস্থিতির অবনতির প্রতিটি ঘটনা অন্তর্বর্তী সরকার দায়হীনভাবে কেবল ঘটতে দেয়নি, জনগণের ন্যূনতম মানবাধিকারকে বিপন্নতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। আগের সরকারের মতই শ্রমিকবিরোধী, নারীবিরোধী, জাতিসত্তাবিরোধী, অগণতান্ত্রিক ও স্বেচ্ছাচারী ভূমিকা গ্রহণ করছে এই সরকার।”
অন্তর্বর্তী সরকারের ‘নির্লিপ্ততায় বা সমর্থনে’ দেশে ‘মবোক্রেসি’ চলছে অভিযোগ করে বিবৃতিতে বলা হয়, “আমরা দেখেছি রংপুরে তারাগঞ্জে দুইজন ভ্যানচালক রুপলাল দাস ও প্রদীপ দাসকে নির্মমভাবে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। রংপুরের গঙ্গাছড়ায় ধর্ম অবমাননার মিথ্যা প্রপাগান্ডা তৈরি করে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর হামলা, লুট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে।
“অথচ পুলিশ হামলাকারীকে না ধরে ফেইসবুকের একজন নিছক পোস্টদাতাকে গ্রেপ্তার করে মব হামলার প্রতি প্রত্যক্ষ সমর্থন দিয়েছে। লালমনিরহাটে বৃদ্ধ নাপিত পরেশ চন্দ্র শীল এবং তার ছেলে বিষ্ণ চন্দ্র শীলকে ধর্ম অবমাননার মিথ্যা অপবাদে মব দিয়ে পেটানো হয়েছে এবং পুলিশ সেই নির্যাতনকারীকে না গ্রেপ্তার করে পরেশ এবং বিষ্ণুকেই গ্রেপ্তার করে মবের বৈধতা দিয়েছে।”
মঞ্চ ৭১ এর অনুষ্ঠান থেকে শিক্ষক-সাংবাদিকদের গ্রেপ্তারের ঘটনা নিয়ে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি বলেছে, “ঢাকায় মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এক আলোচনা সভায় মব সন্ত্রাস চালানো হয়েছে। পরে, পুলিশ সন্ত্রাসীদের না ধরে সেই সভার আলোচক মুক্তিযোদ্ধা, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও সাংবাদিকসহ ১৬ জনকে গ্রেপ্তার করেছে ও পরে সন্ত্রাস বিরোধী মামলায় তাদের কারাগারে পাঠিয়েছে।
“মব আক্রমণের একাধিক ঘটনা যখন জনগণের জানমালকে প্রতিমুহূর্তে বিপন্ন করে দিয়েছে, তখন প্রধান উপদেষ্টার মুখপাত্র মবকে প্রেশার গ্রুপ হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের প্রতি একভাবে সমর্থনই প্রকাশ করেছেন এবং জনগণের সাথে তামাশা করেছেন।”
অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই গণহত্যার বিচারকাজ বৈশ্বিক মানদণ্ড মেনে না করে ‘পাইকারি ভাবে মিথ্যা মামলা’ দিচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছে সংগঠনটি।
কমিটি বলছে, “তারা ফ্যাসিস্ট পদ্ধতির এতটুকু বদল না করে ফ্যাসিবাদ বিরোধিতার বাগাড়ম্বর করছে। ব্যক্তিগত বিদ্বেষের জের করে লীগ ট্যাগ দিয়ে মামলা করা ও বিচারহীনভাবে জেলে আটকে রাখাকে স্বাভাবিকীকরণ করেছে এখনকার বিচার ব্যবস্থা।
“চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীর জামিন অধিকারকে সংরক্ষণ করা হচ্ছে, অথচ বম নাগরিকরা কারাগারে মৃত্যবরণ করলেও তাদের জামিনের অধিকার দেখছে না আদালত। এভাবেই প্রশাসনিক ও বিচারিক ব্যবস্থার গোষ্ঠীগত স্বার্থরক্ষা ও ফ্যাসিস্ট কাঠামোর বদৌলতে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরের এক বছরে হাসিনার সরকারকে ফিরিয়ে এনেছে অন্তর্বর্তী সরকার।”
যৌথবাহিনীর ‘নিষ্ক্রিয়তা’ নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উপর সংগঠিত রক্তক্ষয়ী হামলা এবং হামলা প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিস্ময়কর নিষ্ক্রিয়তা দেখলাম আমরা।
“খুব সহজেই শ্রমিককে হত্যা করা ও গত এক বছরে বিভিন্ন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড পরিচালনা করা যৌথবাহিনী কেন স্থানীয় মব ও হামলা সামলাতে পারছে না তা আমাদের আশ্চর্য করে।”
সংগঠনটি বলছে, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, মবের আক্রমণ, মানুষের জীবনকে বিপন্ন করা, শ্রমিক হত্যা, আদিবাসী নির্যাতন, ধর্মীয় সংখ্যালঘু মানুষের প্রাণহানি, নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা, বিদ্বেষ, জাতীয় স্বার্থবিরোধী চুক্তি স্বাক্ষরে জবরদস্তি এই সবকিছুই প্রমাণ করে এই অন্তর্বর্তী সরকার জনস্বার্থে কোনো পরিবর্তনে আগ্রহী নয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, “গণতান্ত্রিক রূপান্তরে আমরা বিভিন্ন সময়ে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ দিয়েছি। তারা (সরকার) জনগণের কথাকে আমলে না দিয়ে, বৈদেশিক সাম্রাজ্যবাদী শক্তি, সামরিক-বেসামরিক আমলাতান্ত্রিক, লুটপাটের বেনিয়া গোষ্ঠীর প্রতিই বারবার ভরসা রাখছে এবং জনবিরোধিতার প্রমাণ দিচ্ছে।”
অন্তর্বর্তী সরকারকে অবিলম্বে মব সন্ত্রাসসহ ‘জনস্বার্থবিরোধী’ তৎপরতা বন্ধের দাবি জানানোর পাশাপাশি শ্রমিক হত্যার বিচার, নারীকে গণধর্ষণের আহ্বানসহ নারীবিদ্বেষী তৎপরতা বন্ধ, বিভিন্ন স্থানে লুটপাট, হামলা সহিংসতার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
সেই সঙ্গে শ্রমিকদের বকেয়া মজুরি পরিশোধ, শ্রমিক নির্যাতন বন্ধ, অন্যায়ভাবে করা ছাঁটাই প্রত্যাহার এবং নিহত শ্রমিকের পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেওয়ারও দাবি জানিয়েছে তারা।
কমিটির পক্ষে বিবৃতিটি দিয়েছেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, সামিনা লুৎফা, হারুন উর রশীদ, মাহা মির্জা, মাহতাব উদ্দীন আহমেদ ও মারজিয়া প্রভা।