Published : 10 Jan 2026, 01:35 AM
প্রবাস থেকে ভোট দিতে এবারই প্রথম মোবাইল অ্যাপে নিবন্ধন সারা হয়েছে, যাতে সাড়া দিয়েছেন সাড়ে সাত লাখের বেশি বাংলাদেশি।
প্রবাস জীবনে সোয়া কোটিরও বেশি বাংলাদেশি রয়েছেন, সেই হিসাবে নিবন্ধিত বাংলাদেশি ভোটারের হার ৬ শতাংশের বেশি।
এ হারকে নির্বাচন কমিশন ‘সফলতা’ হিসেবে দেখলেও শেষ পর্যন্ত পোস্টাল ব্যালটে কত ভোট সম্পন্ন হয়, সেদিকে নজর রাখতে চাইছেন অনেকে।
‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপের মাধ্যমে প্রবাসীদের পাশাপাশি দেশের ভেতরে তিন ধরনের ব্যক্তি নিবন্ধন সেরেছেন। নির্বাচনি দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তি, নিজ এলাকার বাইরে কর্মরত সরকারি চাকরিজীবী এবং আইনি হেফাজতে (কারাগারে) থাকা ভোটারদের পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
নিবন্ধিত প্রবাসীদের কাছে ইতোমধ্যে পৌঁছাতে শুরু করেছে পোস্টাল ব্যালট। আর দ্রুত সময়ে ভোট দিয়ে ব্যালট ফেরত পাঠাতে হবে।

ডিজিটাল প্লাটফর্ম থেকে আসনভিত্তিক প্রার্থী তালিকা, নাম ও প্রতীক দেখে ‘টিক’ চিহ্ন দিয়ে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে হবে।
২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দ হওয়ার পরই যার যার আসনের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারবেন নিবন্ধিত ভোটাররা এবং পরদিন থেকেই ফিরতি ডাক পাঠানো যাবে।
>>মোট নিবন্ধন দেশে ও প্রবাসে ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮৩ জন।
>> পুরুষ ১২ লাখ ৮১ হাজার ৪৩৫; নারী ২ লাখ ৫২ হাজার ২৪৬ জন।
>> বাংলাদেশে ৭ লাখ ৬১ হাজার ১৪১ জন (নিজ ভোটার এলাকার বাইরে থাকা সরকারি চাকরিজীবি, ভোটের দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তি, আইনি হেফাজতে থাকা ব্যক্তি)
>> প্রবাসী বাংলাদেশি ৭ লাখ ৭২ হাজার ৫৪২ জন।
>> ১ কোটি ২৫ লাখ প্রবাসী বিবেচনায় নিবন্ধনের এ হার ৬.১৮ শতাংশ।
>> তবে ৫০ লাখ প্রবাসী নিবন্ধন লক্ষ্যমাত্রার ক্ষেত্রে ১৫.৪৫ শতাংশ।
জয়-পরাজয়ে প্রভাব ফেলতে পারবে?
আসনওয়ারি সর্বোচ্চ ১৬ হাজার প্রবাসী নিবন্ধন সেরেছেন ফেনী-৩ আসনের জন্য। এছাড়া আরও ১৭টি আসনে দশ হাজারের বেশি প্রবাসী নিবন্ধনকারী রয়েছেন। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নিবন্ধনকারী রয়েছেন অনেক আসনে।

তাদের ভোট কি কোনো আসনে জয়-পরাজয় নির্ধারক হতে পারবে, এ প্রশ্নের উত্তরে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য আব্দুল আলীম বলেন, “প্রবাসে বাংলাদেশি ভোটারের সংখ্যা এক কোটি ৩০ লাখের উপরে। নির্বাচন কমিশনের টার্গেট ছিল ৫০ লাখের মতো নিবন্ধন করা। যেহেতু প্রথমবারের মতো নিবন্ধন ও ভোট চালু করা, তাই কম টার্গেট ছিল।
“ইতোমধ্যে দেশে ও প্রবাসে নিবন্ধন হল ১৫ লাখের বেশি, তার অর্ধেক দেশের ভেতরে। তার মানে সাড়ে সাত লাখ প্রবাসে নিবন্ধন করেছে। এ সংখ্যাটা খুব কম।”
আসন ওয়ারি সর্বোচ্চ প্রায় ১৬ হাজার আর সর্বনিম্ন প্রায় এক হাজার ৬০০ নিবন্ধনকারী রয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, “আমার মনে হয় না, পোস্টাল ব্যালটের ভোট জয়-পরাজয়ের বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়াবে।”
এ নির্বাচন বিশ্লেষক মনে করেন, আসন ওয়ারি এ ভোটার সংখ্যা জয়-পরাজয়ের বড় নিয়ামক হয়ে ওঠার ‘সম্ভাবনা কম’।
“প্রতিটি আসনের পোস্টাল ব্যালটের নিবন্ধিতদের মধ্যে দেশের ভেতরের ব্যক্তি যেমন রয়েছে, প্রবাসেরও রয়েছে। সবাই যে ভোট দেবে, তার গ্যারান্টিও নেই; যারা ভোট দেবে- ওই আসনে ভাগ হতে পারে।”
সংসদ ও গণভোটের দুটি ব্যালট পেপার পাঠানো শুরু হয়েছে তফসিল ঘোষণার এক সপ্তাহ পরে, ২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দের পরে ভোট দেওয়া শুরু হবে পোস্টাল ব্যালটে। এরপর দ্রুত ডাকযোগে পাঠাতে হবে; রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে ভোটের আগেই পৌঁছাতে হবে।
চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে আব্দুল আলীম বলেন, “সর্বোচ্চ সংখ্যক পোস্টাল ব্যালট তো আর একদিকে যাবে না। এছাড়া কিছু ব্যালট পেপার সময় মতো পৌঁছানো, ভোট দেওয়ার পর সময় মত ফেরত আসার গ্যারান্টি নেই। কাজেই আমার কাছে মনে হয়-পোস্টাল ব্যালট আসন ওয়ারি বড় ধরনের ইম্প্যাক্ট পড়বে বলে মনে হয় না।”

কিন্তু প্রবাসের পোস্টাল ব্যালটের ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
আব্দুল আলীম বলেন, “উদ্যোগটা বড়; অন্তত বড় উদ্যোগের মাধ্যমে একটা পাইলটিং হল। সারা দুনিয়ায় দেখছি-পাইলটিং ছোট করে হয়; প্রাইমারিলি অল্প কয়েকটা দেশে স্টার্ট হয়।
“আমাদের এখানে প্রবাসে বাংলাদেশিরা যেখানেই রয়েছে, সবখানে টার্গেট করা হচ্ছে। অল্প কয়েকটা দেশ টার্গেট করে ব্যাপক ক্যাম্পেইন করা হত, তাহলে হয়ে যেত।”
স্বস্তি ইসিতে, অভিজ্ঞতা কি কাজে দেবে?
পোস্টাল ভোটিংয়ে দেশে-প্রবাসের সাড়ায় সাফল্য দেখছে নির্বাচন কমিশন।
নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, “প্রথমবারের মতো এ উদ্যোগের সাড়ায় আমরা মনে করি, খুব আশাব্যঞ্জক। যতদূর জানি, এ সিস্টেমে (প্রবাসীদের নিবন্ধনের হার) বৈশ্বিক রেকর্ড ২ এর সামান্য বেশি; সে হিসাবে আমাদের পার্সেন্টেজটা ওই রেকর্ড অতিক্রম করতে পেরেছি। এটা আমাদের সন্তুষ্টির জায়গা।”

নিবন্ধনের হার ৬ শতাংশের উপরে হওয়ায় ভোট দেওয়ার হার অন্তত ৩ শতাংশের বেশি হবে বলে আশা করছেন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম।
“আমাদের প্রত্যাশা ছিল, ওয়ার্ল্ডের যে রেকর্ডটা অ্যাসিভ করতে পারি—তাহলে অন্যান্য দেশের সাথে সামঞ্জস্য থাকবে। সে হিসাবে তো আমরা ভালো করেছি।”
নির্বাচনে কম ভোটের ব্যবধান যেখানে হয়, সেখানে পোস্টাল ব্যালটের প্রভাব থাকবে বলে মনে করেন আনোয়ারুল ইসলাম সরকার।
“ভোটের কমপিটিশনে দেখা যায়, সমান সমান ভোট পায়; অনেক সময় ৫-১০টা ভোটের ব্যবধানেও পাস-ফেল নির্ধারণ করে। সেখানে এতগুলো ভোটার অবশ্যই জয়-পরাজয়ের ডিসাইডিং ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করবে প্রবাসী ভোট।”
এবারের অভিজ্ঞতা নিয়ে বর্তমান ইসি স্থানীয় সরকারে পোস্টাল ভোটিংয়ে ব্যবস্থা নেবে কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “ব্যক্তিগত ভাবনা হল—অভিজ্ঞতা থেকে থেকে মানুষ শিক্ষা নেয়; ভুল-ত্রুটি থেকে পারফেকশন আসে।

“এ নির্বাচন শেষ হওয়ার পরে স্থানীয় নির্বাচনের পোস্টাল ব্যালট হবে কি না, তা চিন্তাভাবনার বিষয়টি আসবে।”
২০১০ সালে ছোট পরিসরে শুরু হয়ে বিগত সময়ে প্রযুক্তির ব্যবহারে ইভিএম চালু হয়েছিল, এবার তা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
আইটি সাপোর্টেড পোস্টাল ভোটিংয়ের ভবিষ্যৎও কী, তার উত্তর জানতে অপেক্ষা করতে হবে।
নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, “ইন্সটিটিউশনাল মেমোরি নিয়ে অনেকে সিদ্ধান্ত নিতে পছন্দ করে; আবার অনেকে ট্র্যাডিশনটাকে বাদ দিয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনা করে।
“ভবিষ্যত কমিশনের চিন্তাভাবনার ওপর নির্ভর করবে, তারা কী করবে।”
>>সবচেয়ে বেশি ১৬ হাজার ৯৩ জন নিবন্ধন করেছেন ফেনী-৩ আসনে, আর সবচেয়ে কম নিবন্ধন হয়েছে বাগেরহাট-৩ আসনে, ১ হাজার ৫৯৫ জন।
>>১১ হাজারের বেশি নিবন্ধন করেছে ১৪ আসনে।
>> ১০ হাজারের বেশি ভোটার নিবন্ধন করেছেন এমন আসন চারটি।
>> নয় হাজারের বেশি ভোটার রয়েছে নয়টি আসনে।
>>আট হাজারের বেশি ভোটার নিবন্ধন করেছেন, এমন আসন সংখ্যা ১০টি।
>>সাত হাজারের বেশি নিবন্ধন হয়েছে ১১টি আসনে।
>>ছয় হাজারের বেশি নিবন্ধন হয়েছে ২১টি আসনে।
>>পাঁচ হাজারের বেশি প্রবাসী নিবন্ধিত ভোটার রয়েছে ৪৬টি আসনে।
>> ৫ হাজারের নিচে কিন্তু ১ হাজার ৫শ ভোটারের বেশি নিবন্ধন করেছেন, এমন আসনের সংখ্যা ১৮৫টি।

‘পোস্টাল ব্যালট-এ যুগে অপ্রচলিত চিন্তাভাবনা’
আইটি সাপোর্টেড পোস্টাল ভোটিংয়ের জন্য প্রবাসে সাড়ে সাত লাখ নিবন্ধনকে ‘খুব ইনসিগনিফিক্যান্ট’ বলে বর্ণনা করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক।
তিনি বলেন, “প্রবাসী বাংলাদেশিদের কোটি নাগরিকের বেশিরভাগই ভোট দেওয়ার ন্যূনতম বয়সি; তাদের নিবন্ধনের জন্য ব্যাপক প্রচারণা ও তাদের আস্থায় নিয়ে আনার ঘাটতি রয়েছে; যার কারণে রেজিস্ট্রেশন আসলে কম হয়েছে।
“এখান থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। ফিডব্যাক নিতে হবে বিভিন্ন সেক্টরের। সমস্যার গভীরতা কী, সেটা আইডেন্টিফাই করতে হবে।”
অধ্যাপক রাজ্জাক বলেন, “অনেকেই এ ধরনের আইটি সিস্টেম ডিজাইন ডেভেলপ করা এবং সেটা ইমপ্লিমেন্ট করা খুবই সহজ কাজ বলে মনে করে। আইটি বিশেষজ্ঞদের এখানে এনগেজ করা দরকার।
“একটা টেকসই কর্মপরিকল্পনা নিতে হবে। প্রকৃতপক্ষে অংশগ্রহণকারী নির্বাচন যেটা, দেশের ভেতরে-প্রবাসে তারা যেন ভোট দিতে পারে। সেখান থেকে আমরা অনেকখানি পিছিয়ে আছি—এ পরিসংখ্যান সেটাই প্রমাণ করে।”
সোশাল মিডিয়ায় ব্যালট পেপারের সফট কপি প্রচারের মাধ্যমে ‘ভোটের গোপনীয়তা’ নষ্ট হচ্ছে বলেও মনে করেন আব্দুর রাজ্জাক।
“এটা খুবই আশঙ্কাজনক। এটা কনফিডেনশিয়াল বিষয়। পোস্টাল ব্যালট সিস্টেম যেটা ডাকযোগে পাঠানো হচ্ছে, আগেই ভোট দিয়ে দেবে—এগুলো বর্তমান যুগে এসে একেবারেই অবস্যুলেট (অপ্রচলিত) চিন্তাচেতনা এবং ধীর গতির কর্মপরিকল্পনা। এগুলোর মাধ্যমে আসলে ঈপ্সিত ফলাফল, উদ্দেশ্য যেটা— সেটা পূরণ করা সম্ভব হবে না।”
প্রবাসে বাংলাদেশিরা নিজের ভোট নিজে দিচ্ছে—এমন বিশ্বাসযোগ্য প্রযুক্তি নিশ্চিতের সময় এসেছে বলে মন্তব্য করেন অধ্যাপক রাজ্জাক।
তিনি বলেন, “আমাদেরকে ট্রাস্টেড, ওয়েব ইন্টারফেস, মোবাইল ইন্টারফেস—এগুলো তৈরি করতে হবে। সেটির মাধ্যমে প্রকৃত ভোটদানকারী যেন তার মতামত এখানে প্রতিফলন করছে, টেকনিক্যালি ভেরিফাইড ওয়েতে সংগ্রহ করতে হবে।”
পুরনো খবর
বিপুল ব্যয়ের পোস্টাল ভোটিংয়ে সাড়া মিলবে তো?
প্রবাসী ভোট: কীভাবে পোস্টাল ব্যালট সামলাবে ইসি, চ্যালেঞ্জ কোথায়?