Published : 27 Jan 2026, 01:25 AM
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে একজন নিজেই গুমের শিকার হয়েছিলেন, আরেকজনের ভাই গুম হয়েছিলেন, তার এখনো খোঁজ মেলেনি। ঢাকা-১৪ আসনের নির্বাচনি আলোচনায় তাই ‘গুম’ শব্দটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ছয়টি ওয়ার্ড এবং সাভার উপজেলার দুটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই আসনে বিএনপির প্রার্থী হয়েছেন সানজিদা ইসলাম তুলি, তিনি গুম হওয়া বিএনপি নেতা সাজেদুল ইসলাম সুমনের বোন।
ভাইয়ের খোঁজ পেতে তিনি গুমের শিকার পরিবারগুলোকে নিয়ে গড়ে তুলেছেন ‘মায়ের ডাক’ নামের সংগঠনটি। বিগত আওয়ামী লীগ আমল জুড়ে তারা গুমের বিরুদ্ধে ছিল সোচ্চার।
একই আসনে জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী করেছে গুমের শিকার মীর আহমাদ বিনকাসেমকে, যিনি ব্যারিস্টার আরমান নামেই বেশি পরিচিত।
তিনি মসজিদে মসজিদে গিয়ে নিজের গুম হওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরছেন, পরামর্শ ও দোয়া চাইছেন।
আরমান ভোটের প্রচারে নেমে তুলিকে সম্বোধন করছেন ‘বোন’ বলে। আর তুলিও তার প্রতিদ্বন্দ্বীর বিষয়ে শ্রদ্ধা রেখে সৌহার্দ্যের রাজনীতির বার্তা দিচ্ছেন।
এই আসনে ধানের শীষ আর দাঁড়িপাল্লার বাইরে আরেকটি ‘ফ্যাক্টর’ হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘ফুটবল’। এই মার্কা নিয়ে ভোটযুদ্ধে নেমেছেন দারুস সালাম থানা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক সৈয়দ আবু বকর সিদ্দিক সাজু।
দলের নির্দেশ উপেক্ষা করে নির্বাচন করায় তাকে বহিষ্কারও করা হয়েছে। তবে স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীরা বলছেন, বিগত আওয়ামী লীগ আমলজুড়ে এই এলাকার বিএনপির নেতা-কর্মীরা সাজুকে ঘিরেই সংগঠিত ছিলেন।
নির্বাচনে ধানের শীষ না পেলেও তাকে ছেড়ে যেতে পারছেন না নেতা-কর্মীরা। ফলে ফুটবল এবার ধানের শীষের ভোট কাটবে বলেই অনেকে মনে করছেন।
মিরপুর থেকে সাভারের কাউন্দিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত এ আসনে শ্রমজীবী ও মধ্যবিত্ত ভোটারের সংখ্যা বেশি। নিরাপত্তা, মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম এ আসনের নির্বাচনী আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এছাড়া রয়েছে বুড়িগঙ্গার ওপর একটি সেতুর দাবি।
রাজধানীর প্রান্তঘেঁষা এ আসনের মোট ভোটার ৪ লাখ ৫৬ হাজার ৪৪ জন। তাদের মধ্যে ২ লাখ ৩২ হাজার ৬৬ জন পুরুষ, ২ লাখ ২৩ হাজার ৭ জন নারী এবং ৪ জন হিজড়া।
ভোটারদের মধ্যে মূল আলোচনা ধানের শীষ, দাঁড়িপাল্লা আর ফুটবল নিয়ে। তবে প্রতিন্দ্বন্দ্বিতায় আরো আছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির মো. ওসমান আলী (একতারা), সিপিবির রিয়াজ উদ্দিন (কাস্তে), জাতীয় পার্টির মো. হেলাল উদ্দীন (লাঙ্গল), বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির মো. লিটন (হাতি), গণফোরামের মো. জসিম উদ্দিন (উদীয়মান সূর্য), এলডিপির মো. সোহেল রানা (ছাতা), এবি পার্টির মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান (ঈগল), জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডির নুরুল আমিন (তারা) এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. আবু ইউসুফ (হাতপাখা)।

কাউন্দিয়ায় তুলি
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের শাহ আলী মাজার, গাবতলী বাস টার্মিনাল, চিড়িয়াখানা, বোটানিক্যাল গার্ডেন, মিরপুর স্টেডিয়াম এলাকা ঢাকা-১৪ আসনে পড়েছে। বুড়িগঙ্গার ওপারের সাভার উপজেলার কাউন্দিয়া ইউনিয়ন ও বনগাঁও ইউনিয়নও এই আসনের অন্তর্ভুক্ত।
ধানের শীষের প্রার্থী সানজিদা ইসলাম তুলি রোববার সকালে কাউন্দিয়া ইউনিয়ন থেকে প্রচার শুরু করেন। মানচিত্রে দেখতে ঢাকার খুব কাছে হলেও এ ইউনিয়নে যেতে গেলে মনে হয় অনেকটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মত। মিরপুরের দিক থেকে নৌকায় করে বুড়িগঙ্গা পার হয়ে কাউন্দিয়ায় পৌঁছাতে হয়।
তুলি নৌকায় করে ঘাট পাড় হয়ে কাউন্দিয়ায় আসার পর স্থানীয় নেতা-কর্মীরা তাকে ফুলেল সংবর্ধনা জানান। এরপর তিনি নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে এলাকায় কিছুটা ঘোরেন, লিফলেট বিলি করেন।
কাউন্দিয়ায় গিয়ে এলাকার উন্নয়নে অনেকগুলো প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তুলি।
পথসভায় তিনি বলেন, “ঢাকা–১৪ আসনের মধ্যে সবচেয়ে অবহেলিত জনপদ হল কাউন্দিয়া ও বনগাঁ। সামান্য উদ্যোগ ও সঠিক পরিকল্পনা নিলেই এ অঞ্চলকে পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তোলা যাবে। আমরা গ্রামীণ পরিবেশ ও ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ রেখে আধুনিক সকল সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে চাই।
“আমি নির্বাচিত হলে ঢাকা–১৪ আসনের সকল মানুষের নিরাপত্তার দায়িত্ব নেব। চাঁদাবাজ, ভূমিদস্যু, দুর্নীতিবাজ ও মাদক ব্যবসায়ীদের এই এলাকায় কোনো স্থান হবে না। তারা হয় ভালো হয়ে যাবে, নয়ত এলাকা ছাড়তে বাধ্য হবে।”

ভোট চাওয়ার ক্ষেত্রে ‘নেতিবাচক রাজনীতি না করার’ অঙ্গীকার করে তুলি বলেন, “আমি কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ করে ভোট চাই না। আমি কী করতে পারব, সেই উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েই মানুষের সমর্থন চাই।”
তবে কাউন্দিয়ার মানুষের প্রধান দাবি হয়ে উঠেছে বুড়িগঙ্গার ওপর একটি সেতু। ছোট নৌকায় করে এই বুড়িগঙ্গা পার হতে গিয়ে কাউন্দিয়ার বাসিন্দাদের একদিকে যেমন টাকা খরচ হচ্ছে, আরেকদিকে যাচ্ছে সময়। প্রায়ই ঘটছে নৌ দুর্ঘটনা, যাচ্ছে জীবনও।
গত বছরের ২৪ জুন সকালে কাউন্দিয়া থেকে মিরপুরে আসার সময় বড় জাহাজের প্রপেলারে পেঁচিয়ে নিখোঁজ হন ছোট নৌকার যাত্রী রিপা আক্তার। রিপার রক্তে পানি লাল হয়ে উঠলেও তার লাশ এখনো পাননি স্বজনরা।
তার স্বামী আনোয়ার হোসেন বলছেন, “আমাদের তো একটাই চাওয়া, বিরিজটা খালি হোক। আমরা কত কষ্ট কইরা যাতায়াত করি, তা কেবল আল্লাই জানে। আমার বাচ্চাদের মা এই নদী পার হইতে গিয়াই গেল। লাশটাও খুঁইজা পাইলাম না।”
সানজিদা ইসলাম তুলি কাউন্দিয়ার অবকাঠামোগত উন্নয়নেরও আশ্বাস দিয়েছেন।

কল্যাণপুরের মসজিদে আরমান
মীর আহমাদ বিনকাসেম আরমানের বাবা মীর কাসেম আলী ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর নির্বাহী পরিষদ সদস্য এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্রথম সভাপতি। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আদালতের রায়ে তার ফাঁসি কার্যকর করা হয়।
রোববার বিকেলে কল্যাণপুর ৯ নম্বর সড়কের একটি গলিতে মসজিদুল বাকীতে আসরের নামাজ পড়ে প্রচার শুরু করেন দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী ব্যারিস্টার আরমান।
আসরের নামাজের পর মসজিদের ইমাম জানান, ব্যারিস্টার আরমান দুটি কথা বলবেন। এরপর সবার নামাজ শেষে কথা বলতে দাঁড়ান আরমান।
তিনি বলেন, “এখানে আমি আমার শৈশব, কৈশোর ও যৌবনের অনেকটা সময় কাটিয়েছি। আমার বাবার ফাঁসির কয়েক দিন আগে আমাকে গুম করা হয়। আমি ভেবেছিলাম হয়ত ২৪ ঘণ্টা পর তারা আদালতে নেবে। কিন্তু ঘণ্টা পেরিয়ে দিন, দিন পেরিয়ে সপ্তাহ- মাস গড়াল। আট বছর আমাকে সেই অন্ধকার ঘরে রাখা হয়েছিল। নামাজ পড়ার সময়টুকুও সেখানে বলা হত না।”
মসজিদ থেকে বের হয়ে গলিতে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী। তিনি বলেন, “আমরা নির্বাচিত হলে সবার আগে চাঁদাবাজি বন্ধ করব। প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি হতে পারছে কারণ চাঁদাবাজদের রাজনৈতিক ভিত্তি রয়েছে। এগুলো বন্ধ করা হবে।”

প্রশাসন একমুখী আচরণ করছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, “এটা আমাদের শঙ্কার কারণ। আমরা প্রধান উপদেষ্টার কাছে গিয়ে শঙ্কা জানিয়েছি। তিনি নির্বাচনের আগেই লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিতের আশ্বাস দিয়েছেন।”
আরমান বলেন, “আমরা নির্বাচনে নির্বিঘ্নে ভোট দিতে চাই। আমরা যেন আন্দোলনে নামতে বাধ্য না হই। এটা আমার আহ্বান থাকবে।”
প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে জামায়াতের প্রার্থী বলেন, “অপচনশীল দ্রব্য ব্যবহার করে রঙিন পোস্টার দেখা যাচ্ছে। শিক্ষা কেন্দ্রে প্রচার হচ্ছে। আমরা দেখছি বিভিন্ন জায়গায় রাস্তার ওপর তারা ক্যাম্প করছে। আমরা আহ্বান জানাব, আচরণবিধি আক্ষরিক অর্থে অনুসরণে যেন সব প্রার্থীকে বাধ্য করে প্রশাসন।
“জনগণকে বুঝতে হবে, ফ্যাসিবাদের মাথা কাটা গেছে, কিন্তু প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এখনো ফ্যাসিবাদের দোসররা ঘাপটি মেরে রয়েছে।”

‘ফুটবল ফ্যাক্টর’
২০১৮ সালের নির্বাচনে ঢাকার এ আসন থেকে নির্বাচিত হন আসলামুল হক। তার বিরুদ্ধে এলাকায় চাঁদাবাজি ও ভূমি দখলের ব্যাপক অভিযোগ ওঠে।
সেই নির্বাচনে আসলামুল হকের বিপক্ষে ধানের শীষের প্রার্থী ছিলেন আলোচিত বিএনপি নেতা এসএ খালেকের ছেলে এসএ সিদ্দিক সাজু। আসলামুল হকের দাপটে কোনঠাসা সাজুকে সেই বছর কোন প্রচারই চালাতে দেওয়া হয়নি। ভোটের আগে মধ্যরাতে সাজুর বাসা থেকে নেতা-কর্মীদের ধরে নিয়ে যায় পুলিশ।
২০২১ সালে আসলামুল হক মারা যান। শূন্য হওয়া ওই আসনের উপনির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হন আওয়ামী লীগের প্রার্থী আগা খান মিন্টু। পরে ২০২৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে বিজয়ী হন যুবলীগ নেতা মাইনুল হাসান খান নিখিল।
স্থানীয়রা বলছেন, এই পুরোটা সময় স্থানীয় বিএনপির অলিখিত কার্যালয় ছিল দারুস সালাম এলাকায় এসএ সিদ্দিক সাজুর বাবার বাড়ি। প্রতিটি নির্বাচনের আগে সেখানে দফায় দফায় অভিযান চালায় পুলিশ।
রোববার গিয়ে দেখা গেল, বাড়ির সামনের গেট থেকে শুরু করে ভেতরটা কাগজের ‘ফুটবল’ দিয়ে সাজানো হয়েছে। নির্বাচনি প্রচারের গাড়ি আর মোটরসাইকেল বাড়ির সামনে রাখা।
সাজু রোববার প্রচার চালান ১০ নম্বর ওয়ার্ড এলাকায়। বিকেলে বিহারী পাড়ায় একটি ফুটবল টুর্নামেন্টের উদ্বোধন করেন।
স্থানীয়দের আলোচনায় বোঝা গেল, ধানের শীষে নাকি ফুটবলে ভোট দেবেন–তা নিয়ে দ্বিধায় আছেন স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীরা।
মাজার রোড প্রথম কলোনির বাসিন্দা গাড়িচালক আশরাফ আলী বিএনপির ১০ নম্বর ওয়ার্ডের ৯ নম্বর ইউনিটের সদস্য। তিনি বললেন, “আমাগো ইউনিটের বেশিরভাগ সদস্যই ফুটবল মার্কার দিকে গেছেগা। আমরা কয়েকজন সিনিয়র শুধু ধানের শীষের পক্ষে রইছি। পোলাপাইন একটাও ধানের শীষে নাই।”

জানতে চাইলে আশরাফ আলী বলেন, “এই এলাকায় সাজু ভাই অনেকদিন ধইরাই দলটা ধইরা রাখছে। আন্দোলন-সংগ্রামে আমরা ওনারেই দেখছি। আসলাম এমপির সঙ্গে উনি ভোট করছেন, তখনো অনেক নির্যাতন হইছে। পোলাপাইন জেলে গেলে উনি চেষ্টা-তদ্বির করছেন।
“আমরা জানি যে সাজু ভাইয়ের বিকল্প কিছু নাই। এখন দল এমন একটা সিদ্ধান্ত দিল যে… মনে করেন ধানের শীষের ভোটটা তো ভাগ হয়্যা গেল গা।”
আশরাফের ভাষ্য, গাবতলী, মিরপুর ১ নম্বর, কল্যাণপুর, দারুসসালাম এলাকায় ধানের শীষের ভোট কাটবে সাজুর ফুটবল।
“তার বাবা এমপি ছিল, এলাকার ভোটাররা বিএনপি বলতে তাদেরই চেনে। তাদের অনেক পুরানা গাড়ির ব্যবসা। আর এই এলাকায় প্রচুর গাড়ির লোকজন থাকে, ড্রাইভার-হেলপার দিয়া ভরা বলতে পারেন। তারা তো সাজুরেই চেনে।”
মাজার রোডের চা দোকানদার মশিউরের দোকানে নির্বাচন নিয়ে আলোচনা চলছিল বেশ কয়েকজনের মধ্যে। তাদের মধ্যে দুজন একটি গাড়ির বডি তৈরি গ্যারেজে কাজ করেন।
তারা বলছেন, স্থানীয় হিসেবে তারা এসএ সিদ্দিক সাজুকেই বিগত বছরগুলোতে দেখেছেন। সাজু ধানের শীষের প্রার্থী হবেন–এমন ধারণাই তাদের ছিল। কিন্তু প্রার্থী চূড়ান্ত হওয়ার পর তারা দেখলেন, তা হয়নি। এখন তারা দোটানায়, ভোটটা কাকে দেবেন।