“ভারতের সম্পর্ক একটি দেশের সঙ্গে, কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নয়,” বৈঠকে বলেন মোদী।
Published : 04 Apr 2025, 09:50 PM
বিমসটেক সম্মেলনের ফাঁকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে প্রথমবার দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরত চাওয়ার পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক কথাবার্তা ছড়ানোর অভিযোগ তুলেছেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস।
বিষয়টি নিয়ে শেখ হাসিনাকে ‘থামানোর ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে’ ভারতের প্রতি প্রধান উপদেষ্টা অনুরোধও জানিয়েছেন বলে বাসস জানিয়েছে।
বৈঠকে ইউনূস বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী হাসিনা বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে বিভিন্ন মাধ্যমে ‘বিদ্বেষমূলক মন্তব্য’ করে আসছেন, যেটা মনে হয় ভারতের ‘আতিথেয়তার লঙ্ঘন’। তিনি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে ‘মিথ্যা ও বিদ্বেষমূলক অভিযোগ’ করে আসছেন।
“যেহেতু তিনি আপনার (নরেন্দ্র মোদী) দেশেই অবস্থান করছেন, আমরা অনুরোধ জানাই এমন উসকানিমূলক বক্তব্য থামাতে ভারত সরকার উপযুক্ত ব্যবস্থা নেবে।”
শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পর থেকেই বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কে এক ধরনের টানাপড়েন চলছে। বিচারের জন্য শেখ হাসিনাকে ফেরত চাওয়ার পাশাপাশি দিল্লিতে বসে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টার অভিযোগ তার বিরুদ্ধে এনেছে ইউনূস সরকার।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ক্ষমতাচ্যুত হন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেদিনই তিনি ভারতে চলে যান। তিন দিন পর সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নেয় মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার।
তখন থেকেই দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে অস্বস্তি চলে আসছে, যার বড় কারণ ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার ভারতে উপস্থিতি।
ছাত্র-জনতার আন্দোলনের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সরকারের চালানো দমন পীড়নকে ‘গণহত্যা’ বিবেচনা করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুবনালে শেখ হাসিনাসহ তার সহযোগীদের বিচারের উদ্যোগ নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার।
এছাড়া গোপন বন্দিশিবিরের একটি নেটওয়ার্ক পরিচালনা করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে, যেখানে ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের নামে’ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আটকে রাখা, গুম ও হত্যার মত ঘটনা ঘটত বলে অভিযোগ রয়েছে।
হত্যা, গুমসহ তিন মামলায় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে ট্রাইব্যুনাল। প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় তাকে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ জানিয়ে সরকার ভারতকে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠালেও দিল্লি তার উত্তর দেয়নি।
তবে মার্চে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম স্কাই নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইউনূস জোর দিয়ে বলেছেন, শেখ হাসিনাকে অবশ্যই বিচারের মুখোমুখি হতে হবে, তা তিনি সশরীরে বাংলাদেশে থাকুন বা না থাকুন। ভারতে থাকলেও তার অনুপস্থিতিতে বিচার চলবে।
মুহাম্মদ ইউনূস দায়িত্ব নেওয়ার পর দুই দফা মোদীর সঙ্গে দেখা হওয়ার সুযোগ তৈরি হলেও তা হয়ে ওঠেনি। ফলে বিমসটেকের সম্মেলনে তাদের বৈঠক হবে কি না, তা নিয়ে আলোচনা চলছিল।
তবে শেষ পর্যন্ত বিমসটেকের সাইডলাইনে সেই বৈঠক হয়েছে এবং সেখানে শেখ হাসিনাকে ফেরানোর পাশপাশি তার বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বার্তা ছড়ানোর অভিযোগ, বাংলাদেশে তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ, গঙ্গা ও তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি, সীমান্ত হত্যা ও দুই দেশের সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
বৈঠকে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনারের প্রতিবেদনের কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা, যে প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই থেকে ৫ অগাস্ট পর্যন্ত নিরাপত্তা বাহিনী ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মাধ্যমে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র উঠে আসার কথা বলা হয়েছে।
ইউনূস বলেন, ইউএন ওএইচসিএইচআরের প্রতিবেদনে বিক্ষোভ সম্পর্কিত ১ হাজার ৪০০ মানুষের মৃত্যুর কথা উঠে এসেছে, যার মধ্যে প্রায় ১৩ শতাংশ শিশু। খুন, নির্যাতনের মত মানবাধিকার লঙ্ঘনের মত অপরাধ সংঘটনের বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণও উঠে এসেছে প্রতিবেদনে।
“জাতিসংঘের প্রতিবেদন বলছে, বিক্ষোভকারীদের গুলি করতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী নিজে নিরাপত্তা বাহিনীকে নির্দেশ দেন। বিশেষ করে আন্দোলনের নেতাদের গ্রেপ্তার, হত্যা ও লাশ গুমের নির্দেশনা দেন।”
বাসস জানিয়েছে, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে উসকানি ছড়ানোর অভিযোগের বিষয়ে বৈঠকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে দায়ী করেন।
মোদী বলেন, “শেখ হাসিনার মন্তব্য ঘিরে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে তার জন্য দায়ী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। ভারতের সম্পর্ক একটি দেশের সঙ্গে, কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নয়।”
বৈঠকে সীমান্ত হত্যা বন্ধে ভারতকে উপায় খোঁজার আহ্বান জানান প্রধান উপদেষ্টা। বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদী বলেন, “ভারতীয় সীমান্ত রক্ষা বাহিনী কেবল আত্মরক্ষায় গুলি চালায়। আর প্রাণহানির ঘটনাগুলো ভারতের সীমান্তের মধ্যেই ঘটে।”
বিষয়টি নিয়ে দুই নেতা একসঙ্গে কাজ করার ওপর জোর দেন।
বাংলাদেশে ‘সংখ্যালঘু নির্যাতন’ নিয়ে বৈঠকে উদ্বেগ প্রকাশ করেন মোদী। তবে ইউনূস তাকে বলেন, সংখ্যালঘু নির্যাতনের খবরের ‘বেশিরভাগই ভুয়া’। সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ অনুসন্ধানে ভারতীয় সাংবাদিকদের আমন্ত্রণ জানান তিনি।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন, প্রধান উপদেষ্টার হাই রিপ্রেজেনটেটিভ খলিলুর রহমান, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দেভাল বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
আরও পড়ুন-