Published : 11 Nov 2025, 10:33 PM
যারা ‘জুলাই বিপ্লব’ মানবেন না, তাদের জন্য ২০২৬ সালে ‘কোনো নির্বাচন নাই’ বলে হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান।
তার ভাষায়, “জুলাই বিপ্লবের স্বীকৃতি দিতে হলে, জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি দিতেই হবে। এই আইনিভিত্তি ছাড়া কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠান হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।”
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে সাংবিধানিক আদেশ জারি ও আগামী নভেম্বর মাসেই গণভোট আয়োজন, নির্বাচনে সকলের জন্য ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত করাসহ পাঁচ দফা দাবিতে মঙ্গলবার ঢাকার পল্টন মোড়ে আয়োজিত জামায়াতসহ আট দলের সমাবেশে এসব কথা বলেন শফিকুর রহমান।
জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়ন কীভাবে হবে, সে বিষয়ে ২৮ অক্টোবর বিস্তারিত সুপারিশমালা প্রধান উপদেষ্টার কাছে হস্তান্তর করে জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশন।
জুলাই সনদ বাস্তবায়নে দুটি বিকল্প উপায় বাতলেও গণভোটের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত না দিয়ে ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশে বলা হয়, সেটা সংসদ নির্বাচনের দিনেও হতে পারে, নির্বাচেনের আগেও হতে পারে।
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি ও গণভোটের সময় নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তীব্র মতবিরোধ রয়েছে।
সরকার কোনো সিদ্ধান্ত না দিয়ে সুপারিশ হাতে পাওয়ার ছয় দিনের মাথায় এসে গত ৩ নভেম্বর দলগুলোকে সমঝোতায় আসার আহ্বান জানায়; সময় দেয় এক সপ্তাহ।
জামায়াতের আমির বলেন, “আমাদের দাবি কম এবং খুবই সুস্পষ্ট। জুলাই সনদকে স্বীকৃতি দিতে হবে। যারা জুলাই বিপ্লব মানবেন না, তাদের জন্য ২০২৬ সালে কোনো নির্বাচন নাই। ২০২৬ সালের নির্বাচন দেখতে হলে আগে জুলাই বিপ্লবকে স্বীকৃতি দিতে হবে।
“আর জুলাই বিপ্লবের স্বীকৃতি দিতে হলে জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি দিতেই হবে। এই আইনিভিত্তি ছাড়া কোন নির্বাচন অনুষ্ঠান হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই।”
দুপুর ২টায় পল্টন মোড়ের সমাবেশে জড়ো হন জামায়াতের যুগপৎ আন্দোলনের শরিক সব দলের নেতাকর্মীরা।
অপর দলগুলো হল-ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) একাংশ ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি)।
আগামী ফেব্রুয়ারিতে রোজার আগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতির ধারাবাহিকতায় নির্বাচন কমিশন বৃহস্পতিবার থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ শুরু করছে। ডিসেম্বর নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার কথা রয়েছে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে গণভোট দাবি করেন জামায়াত আমির বলেন, “গণভোটের ব্যাপারে সকল দল একমত, তাহলে তারিখ নিয়ে এই বায়নাবাজি কেন? একমত হয়ে যখন স্বাক্ষর করেছি সবাই, তখন গণভোট আগে হওয়াই হচ্ছে যুক্তিযুক্ত।

“এরমধ্য দিয়ে আইনিভিত্তির পাটাতন তৈরি হবে ইনশাআল্লাহ এবং এর ভিত্তিতেই আগামী জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ওই নির্বাচন যখন অনুষ্ঠিত হবে তখন আর কোনো সংশয় সন্দেহ থাকবে না।”
তিনি বলেন, “আমরা চাই আগামী ফেব্রুয়ারিতে রোজার আগেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক। এইটা নিয়ে কেউ ধুম্রজাল সৃষ্টির চেষ্টা চালাবেন না। ‘উদর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে’ ফেলবেন না।”
শফিকুর রহমান বলেন, “আমরা জাতীয় ঐক্যমত কমিশনে গিয়ে সকল দল আমাদের মতামত দিয়েছি। এই আট দলের পক্ষ থেকে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ আমরা দিই নাই। আমরা প্রস্তাব যৌক্তিক মনে করে সেখানে আলাপ-আলোচনায় ইতিবাচক মত দিয়েছি। এরপর সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের মতামতের ভিত্তিতে একটা সনদ তৈরি হয়েছে। গণতন্ত্রের কথা যে সংখ্যাগরিষ্ঠরা যা বলবে, বাকিরা তাই মেনে নেবে। কিন্তু আমরা দেখলাম, কেউ কেউ তা মেনে নিতে রাজি নন।
“জুলাই সনদে যদি আপনি গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধা না দেখান, জাতীয় নির্বাচনে আপনি শ্রদ্ধা দেখাবেন কীভাবে? এই জায়গায় আসতে হবে। সকল বায়না ভুলে যান। জুলাই শহীদের রক্তের প্রতি সম্মান দেখান। জুলাই যারা লড়াই করেছে, পঙ্গু আহত হয়েছে, এখনো ধুঁকেধুঁকে কষ্ট করছেন, মেহেরবানী করে তাদের মুখের ভাষা বুঝার চেষ্টা করুন।”
জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি নিশ্চিত না করে কোনো নির্বাচন হলে সেটি ‘অবৈধ’ হবে বলে দাবি করেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম।
তিনি বলেন, “জনগণের মূল ইচ্ছা হল, জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি নিশ্চিত করে নির্বাচন; সরকার যদি সেই পথ অবলম্বন না করে, তাহলে আন্দোলনকারীরা কঠোর কর্মসূচিতে যেতে বাধ্য হবে।”
সরকার আলোচনার সুযোগকে অগ্রাহ্য করে রাজনৈতিক চাপের কাছে নতিস্বীকার করেছে মন্তব্য করেন তিনি।
ইসলামী আন্দোলনের আমির বলেন, “যারা ফ্যাসিস্ট চরিত্র ধারণ করে ক্ষমতা রক্ষা করতে চায়, তাদের জন্য আর পালানোর জায়গা নেই।”
বৃহস্পতিবার কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা থাকা আওয়ামী লীগের ‘ঢাকা লকডাউন’ কর্মসূচির প্রসঙ্গ ধরে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক বলেন, “আগামী ১৩ নভেম্বর কোনো বাকশালপন্থিকে বাংলার রাজপথে আমরা নামতে দেব না।
“যদি কেউ ওইদিন রাজপথে নামার অপচেষ্টা চালায়, আমরা তাদেরকে রাজপথে মোকাবেলা করবো।”
বাংলাদেশ আজ দুই ভাগে বিভক্ত, এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, “এক ভাগ বাহাত্তরের বাকশালপন্থি, আরেক ভাগ জুলাইয়ের বিপ্লবপন্থি। আজ বাংলাদেশের প্রতিটি রাজনৈতিক দল এবং পক্ষের কাছে আমার সুস্পষ্ট জিজ্ঞাসা। সবাই যার যার অবস্থান পরিষ্কার করুন। হয় আপনি জুলাই বিপ্লবের পক্ষে, আর না হয় আপনি বাহাত্তরের বাকশালপন্থি।”
জুলা অভ্যুত্থানের নীতিভিত্তিক রূপরেখা ও বাংলাদেশ পরিচালনার জন্যই জুলাই সনদ প্রস্তুত করা হয়েছে মন্তব্য করেন মামুনুল হক বলেন, “আমরা এটিকে কেবল কোনো কাগজপত্রের সনদ হিসেবে দেখছি না, বরং আগামীর বাংলাদেশের রূপরেখা হিসেবে গৃহীত হোক এটাই আমাদের দাবি।”
অনতিবিলম্বে জুলাই সনদকে সরকারি আদেশের মাধ্যমে প্রাথমিক আইনি ভিত্তি দেওয়ার এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে গণভোটের মাধ্যমে এটির চূড়ান্ত আইনি স্বীকৃতি দাবি করেন তিনি।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রধান বলেন, “যদি এ পথে কোনো ব্যত্যয় ঘটে, তাহলে জুলাই বিপ্লবপন্থিরা সেটাকে বরদাশত করবে না; আমরা তা মেনে নেব না। আমরা স্পষ্ট ঘোষণা দিচ্ছি— আমাদের জুলাই যোদ্ধাদের, বিপ্লবের শাহাদাৎ বরণকারী বীর শহীদদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই সনদকে গণভোট ব্যতীত বাংলার মাটিতে বাস্তবায়িত হতে দেব না।”
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “দিল্লির ষড়যন্ত্রে আগামী ১৩ তারিখ লকডাউনের নামে আওয়ামী লীগ নতুন নাশকতার পরিকল্পনা করছে।
গণভোট যদি আইনি ভিত্তি না হয়, তাহলে কিসের ভিত্তিতে জাতীয় নির্বাচন হবে, এই প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, “এই সরকারকে হাই কোর্টের আর্টিকেল ১০৬-এর মধ্য দিয়ে রেফারেন্স সহকারে সরকারের বৈধতার কথা অনেকে বলেছেন। কিন্তু বাংলাদেশের সংবিধান বিশেষজ্ঞরাও ১০৬ সম্পর্কে আইনি বিতর্ক সৃষ্টি করেছেন।
“ফলে একমাত্র গণভোটের মধ্য দিয়েই জাতির আকাঙ্ক্ষা পূরণের যত সংস্কার হয়েছে, তার আইনি ভিত্তি দেওয়া সম্ভব। তা না হলে জাতীয় নির্বাচনের বৈধতা ও এই সংস্কার কখনো পূরণ হবে না।”