Published : 26 Jun 2026, 06:32 PM
শহীদ জননী জাহানারা ইমামের মৃত্যুবার্ষিকীতে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ।
শুক্রবার সকালে রাজধানীর মিরপুরে শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে শহীদ জননীর সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান দলের নেতারা।
শ্রদ্ধা জানানোর পর সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, “স্বাধীনতার পরই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হওয়ার কথা ছিল। কারণ গণহত্যাকারী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার না হলে মুক্তিযুদ্ধের নৈতিকতা প্রতিষ্ঠিত হয় না। কিন্তু ক্ষমতাসীন শাসকেরা তা করেনি।
“বরং তাদের আশ্রয় ও প্রশ্রয়ে ৭১-এর ঘাতক যুদ্ধাপরাধীরা শুধু টিকে থাকেনি, পত্রপল্লবে বিকশিত হয়ে মহীরুহ রূপ ধারণ করে। যার কারণে মরণব্যাধি ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েও শহীদ জননী জাহানারা ইমাম জীবিত অবস্থায় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার এবং ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার যে আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন, তা আজও প্রাসঙ্গিক।”
বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, “নির্বাচিত সংসদে যুদ্ধাপরাধীদের নামে শোক প্রস্তাব পাশ করেছে এবং চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী, আলবদর কমান্ডার, মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত এ টি এম আজহারকে অন্তর্বর্তী সরকার বেকসুর খালাস দিয়েছে। এ সবই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও শহীদদের আত্মত্যাগের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা।”
বাসদনেতা বলেন, “কতিপয় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করলেও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী, বাহিনী গঠন করে এবং সরাসরি হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নি সংযোগকারী সকল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল ও রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার নিষিদ্ধ এবং যুদ্ধাপরাধী গণহত্যাকারী দলের বিচার ও তাদের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বাজেয়াপ্ত করেনি।”
এ সময় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বাসদের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য জুলফিকার আলী, কেন্দ্রীয় বর্ধিত ফোরামের সদস্য মাঈন উদ্দিন চৌধুরী, কেন্দ্রীয় পাঠচক্র ফোরামের সদস্য ও ঢাকা নগর কমিটির নেতা নাসির উদ্দীন প্রিন্স, রুখশানা আফরোজ আশা, আনোয়ারুল ইসলাম,আবদুল্লাহ আল মামুন তাজু, ইলিয়াস হাসান ইলু।
লেখিকা জাহানারা ইমাম (ডাক নাম জুডু)১৯২৯ সালের ৩ মে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা সৈয়দ আব্দুল আলী ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। মা সৈয়দা হামিদা বেগম।
প্রথম জীবনে শিক্ষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও স্বাধীনতার পরে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে সোচ্চার হয়ে উঠেন তিনি।
গত শতকের নব্বইয়ের দশকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠা গণআদালতের প্রধান উদ্যোক্তা জাহানারা ইমাম মরণব্যাধি ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ১৯৯৪ সালের ২৬ জুন যুক্তরাষ্ট্রের একটি হাসপাতালে মারা যান।
জাহানারা ইমামের আত্মজীবনীমূলক লেখা ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত ‘একাত্তরের দিনগুলি’ বইটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একটি অসাধারণ দলিল হিসেবে দেখেন ইতিহাসবেত্তারা।
সাহিত্যকর্মের জন্য তিনি ১৯৮৮ সালে 'বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ সাহিত্য পুরস্কার' ও 'কমর মুষতারী সাহিত্য পুরস্কার' লাভ করেন। এছাড়া ১৯৯১ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান তিনি।
১৯৯১ সালে ২৯ ডিসেম্বর জামায়াতে ইসলাম গোলাম আজমকে আমির ঘোষণা করলে তার প্রেক্ষাপটে ১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারি ১০১ সদস্যবিশিষ্ট একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গঠিত হয়। জাহানারা ইমাম ছিলেন এর আহ্বায়ক।
এর পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী প্রতিরোধ মঞ্চ, ১৪টি ছাত্র সংগঠন, প্রধান প্রধান রাজনৈতিক জোট, শ্রমিক-কৃষক-নারী এবং সাংস্কৃতিক জোটসহ ৭০টি সংগঠনের সমন্বয়ে পরবর্তীতে ওই বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি’ গঠিত হয়।
একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’র এ আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ‘শহীদ জননী’ হিসেবে দেশব্যাপী পরিচিত হয়ে ওঠেন মুক্তিযুদ্ধে ছেলে গেরিলা যোদ্ধা রুমিকে হারানো এই মা।
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে তার ছেলে শফি ইমাম রুমী শহীদ হন এবং স্বামী শরীফ ইমামও ওই সময়ে মারা যান।