Published : 12 Apr 2026, 08:00 PM
বিএনপি সরকার জুলাই সনদ বাস্তবায়নে ‘গরিমসি’ করছে অভিযোগ করে আবারো রাজপথে নামার হুমকি দিয়েছেন ১১ দলীয় ঐক্যের নেতারা।
জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ শরিক দলের নেতারা বলছেন, বিএনপি তাদের দলীয় ইশতেহার, ৩১ দফা যুগপৎ রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিও ‘মান্য করছে না’।
রোববার জুলাই শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় ১১ দলীয় ঐক্যের নেতাদের বক্তব্যে এসব অভিযোগ উঠে আসে।
ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশে আয়োজিত এ মতবিনিময় সভায় সভাপতিত্ব করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশকে সংস্কারের মাধ্যমেই পরিবর্তন করতে হবে। সংস্কারে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিএনপি সরকার। আমরা মনে করি, জুলাই শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধারা বাংলাদেশের জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে। আমরা জুলাইকে রাজনৈতিক বা দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করিনি, করবও না।
“বিএনপি জুলাইকে রাজনৈতিক ও দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করছে। সরকার নিজেদের কাজের বৈধতার জন্য কখনো একাত্তর, কখনো চব্বিশকে ব্যবহার করছে। বিএনপি কোনো আন্দোলনে ছিল না; তারা কেবল আন্দোলনের ফসল ভোগ করেছে। বিএনপি জুলাই সনদ কিংবা নিজেদের ইশতেহারের ৩১ দফার কোনোটিই পালন করছে না।”
বিএনপি এখন ‘সর্বস্তরে দলীয়করণের মিশনে নেমেছে’ অভিযোগ করে এনসিপি নেতা বলেন, “তারা সংস্কারের কথা মুখে বললেও কাজে তার কোনো প্রমাণ নেই; বরং তারা ফ্যাসিবাদী শাসনের সকল কালো আইন-কানুন ও নিয়মনীতি বহাল রাখতে উঠেপড়ে লেগেছে।”
তিনি বলেন, “আজকের এই মতবিনিময় আমাদের করণীয় নির্ধারণের জন্য। শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের পরামর্শে আমরা তা নির্ধারণ করতে পেরেছি। আমরা জুলাই সনদ বাস্তবায়নে রাজপথে নামব। এবার আংশিক নয়, পরিপূর্ণ সফলতার জন্যই রাজপথে নামব।”
সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেন, “সংসদের ভেতরে যতদিন অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়তে পারব, কথা বলতে পারব, ততদিন সংসদে থাকব। লড়তে না পারলে, কথা বলতে না পারলে এক মিনিটও থাকব না।
“যখনই বিএনপি সরকার গুম ও মানবাধিকার অধ্যাদেশ, দুদক অধ্যাদেশ, পুলিশ অধ্যাদেশ, গণভোট অধ্যাদেশসহ গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলো সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বাতিল করেছে, তাৎক্ষণিক আমরা প্রতিবাদ জানিয়ে ঘৃণার সঙ্গে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছি। ফ্যাসিবাদের পক্ষে বিএনপি দৃঢ়ভাবে অবস্থান নেওয়ায় আমরা এক মুহূর্তের জন্যও সংসদে থাকিনি; সঙ্গে সঙ্গে ওয়াকআউট করেছি।”
শফিকুর রহমান বলেন, “সংসদে টু-থার্ড ক্ষমতাবলে বিএনপি গায়ের জোরে কাজ করছে। রাষ্ট্রীয় সব প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণ করে বিএনপি নিজেদের নির্বাচনি ইশতেহার নিজেরাই লঙ্ঘন করেছে।”
আগামীতে ‘ফ্যাসিবাদের’ চূড়ান্ত পরাজয় এবং জনগণের বিজয় হবে মন্তব্য করে জামায়াত আমির বলেন, ‘সেই চূড়ান্ত আন্দোলনের জন্য’ দেশবাসীকে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, “এক পা কেটে ফেলার পরও জুলাই যোদ্ধার অনুভূতি- প্রয়োজন হলে পুরো শরীরই দেব! কিন্তু জুলাই কাউকে ছিনিয়ে নিতে দেব না।”
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “বিএনপি সরকার কর্তৃক সৃষ্ট চলমান রাজনৈতিক সংকট সমাধানে আমাদের করণীয় নির্ধারণ করার লক্ষ্যে আজকের এই মতবিনিময় সভা। আজ শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধারা নিজেদের যে অনুভূতি প্রকাশ করেছে, তাতে আমাদের করণীয় নির্ধারণ সহজ হয়েছে। আমরা জাতির স্বার্থে আপসহীনভাবে নিঃস্বার্থ ভূমিকা অব্যাহত রাখব। এজন্য আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।”

উদ্বোধনী বক্তব্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, “জুলাই শহীদদের রক্তের ওপর দিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় এসে জাতির সঙ্গে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে নব্য ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। আমরা চলমান সংকট সংসদে সমাধান চাই, কিন্তু সরকার সেই উদ্যোগ গ্রহণ করছে না।
“এমন পরিস্থিতিতে দেশ ও জাতির স্বার্থে করণীয় নির্ধারণে আজকের এই মতবিনিময় সভা। এখান থেকে শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধারা যেভাবে চাইবে, ১১ দলীয় ঐক্য সেভাবেই করণীয় নির্ধারণ করবে।”
বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেন, “বাংলাদেশে যাতে আর কোনো ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠা না হয়, সেজন্য জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। বিএনপি ৭০ শতাংশ জনগণের রায় মেনে না নিলে আমরাও বিএনপি সরকারকে মেনে নেব না।”
জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম বলেন, “যখনই বিএনপি গুম, দুদক ও মানবাধিকার অধ্যাদেশ বাতিল করে, তখন বুঝতে বাকি থাকে না যে বিএনপিও আওয়ামী লীগের মতই একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা বহাল রাখতে চায়। বিরোধী দলের জন্য কবর খুঁড়তে যাবেন না-সেই কবরে আপনাদেরই আগে ঢুকতে হবে।”
বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মুসা বিন ইযহার বলেন, “বিগত ১৭ বছর ধরে নির্যাতিত বিএনপি ক্ষমতায় বসেই সব ভুলে গেছে। আজকের বিএনপি শহীদ জিয়ার বা বেগম জিয়ার বিএনপি নয়; বরং এটি ভারতীয় আধিপত্যবাদের ভাষায় কথা বলছে। আধিপত্যবাদী গোষ্ঠীকে বাংলাদেশে প্রভাব বিস্তার করতে দেওয়া হবে না।”
জুলাই যোদ্ধা কামরুল আহসান গণভোট, গুম ও মানবাধিকার অধ্যাদেশ বাতিলের তীব্র নিন্দা জানান।
জামায়াতের ঢাকা মহানগর উত্তরের সেক্রেটারি রেজাউল করিম এবং কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য দেলাওয়ার হোসেনের যৌথ পরিচালনায় মতবিনিময় সভায় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন এলডিপির প্রেসিডিয়াম সদস্য নেয়ামুল বসির ও এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী।
বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম চান , বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব তোফাজ্জল হোসাইন মিয়াজী, খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব মোস্তাফিজুর রহমান ফয়সাল, এবি পার্টির যুগ্ম মহাসচিব আবদুল্লাল আল মামুনও বক্তব্য দেন।
এছাড়া জুলাই আন্দোলনে নিহত আলিফের পিতা গাজীউর রহমান, মেহেরুন নেছার পিতা মোশারফ হোসেন, মাহমুদুর রহমান সৈকতের বোন সাবরিনা আফরোজ, জুলাই যোদ্ধা মোস্তাফিজুর রহমান, শেখ জামাল হোসেন, সানজিদা খানম দ্বীপ্তি, লাখী বেগম, শহিদুল ইসলাম, কবির হোসেন, তাজুল ইসলাম আলোচনায় অংশ নেন।