Published : 20 Apr 2026, 09:07 PM
দেশে জ্বালানি সংকট, এর প্রভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা ও জনজীবনে তৈরি হওয়া পরিস্থিতি নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানের আনা মুলতবি প্রস্তাব গ্রহণ করেনি জাতীয় সংসদ।
তবে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দুজনই বলেছেন, বিষয়টি আলোচনার যোগ্য এবং অন্য বিধিতে তা তোলা যেতে পারে।
সোমবার জাতীয় সংসদে কার্যপ্রণালী বিধি ৬২ অনুযায়ী জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পাওয়া দুটি মুলতবি প্রস্তাবের নোটিস নিষ্পত্তি করতে গিয়ে বিষয়টি সামনে আসে।
মুলতবি প্রস্তাবের নোটিস দেন বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ ৩ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম।
ডেপুটি স্পিকার বলেন, দুটি নোটিসের বিষয়বস্তু প্রায় একই। দুজনই জ্বালানি সংকট এবং এর প্রভাব নিয়ে আলোচনা চেয়েছেন।
শফিকুর রহমান তার নোটিসে ‘দেশব্যাপী তীব্র জ্বালানি সংকট এবং এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প কারখানায় সৃষ্ট অচলাবস্থাসহ জনজীবনের বহুমাত্রিক সংকট’ নিয়ে সংসদের কাজ মুলতবি রেখে আলোচনার প্রস্তাব দেন।
ডেপুটি স্পিকার নোটিস দুটি পড়ে শোনানোর পর বলেন, বর্তমানে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনা চলছে। এ অবস্থায় অধিবেশন মুলতবি না করেও উত্থাপিত বিষয়টি নিয়ে আলোচনার সুযোগ রয়েছে। তাই সংসদ মুলতবি করে এ প্রস্তাবের ওপর আলোচনা ঠিক হবে না।
তিনি বলেন, “উল্লেখিত নোটিসটির ক্ষেত্রে অধিবেশন মুলতবি না করেই আলোচনার সুযোগ রয়েছে। মুলতবি করে আলোচনা সমীচীন নয়।”
ডেপুটি স্পিকার বলেন, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইতোমধ্যে কার্যপ্রণালী বিধির ৩০০ ধারায় এ বিষয়ে বিবৃতি দিয়েছেন। এরপরও আলোচনার অবকাশ থাকলে যথাযথ বিধিতে নতুন নোটিস দিলে তা বিবেচনা করা যেতে পারে।
এরপর কার্যপ্রণালী বিধি ৬৩ অনুযায়ী দুটি নোটিসই নাকচ করেন তিনি।
‘সবচেয়ে বার্নিং সমস্যা’ নিয়ে কথা বলার সুযোগ চাইলেন বিরোধীদলীয় নেতা
ডেপুটি স্পিকারের সিদ্ধান্তের পর ফ্লোর নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, বিষয়টি এখন জাতীয় জীবনের ‘অতিব গুরুত্বপূর্ণ’ একটি প্রশ্ন।
তিনি বলেন, “রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনা চলতে থাকবে, তাতে আপত্তি নেই। কিন্তু দেশের মানুষের সবচেয়ে জ্বলন্ত সমস্যা নিয়ে যদি সংসদে কথা বলার সুযোগ না থাকে, তাহলে তা দুর্ভাগ্যজনক হবে।”
শফিকুর রহমান বলেন, “আমরা তো কাউকে দোষারোপ করার জন্য এই আলোচনায় যাচ্ছি না। বাস্তব অবস্থাটা জেনে কী করা যায়, সে বিষয়েই তো আমরা কথা বলতে চাচ্ছি।”
তিনি বলেন, বিষয়টি সংসদে আনার জন্য আগে ৭১ বিধিতেও তারা চেষ্টা করেছেন, কিন্তু সুযোগ মেলেনি। এখন মুলতবি প্রস্তাবও নাকচ হলে মানুষের কাছে বার্তা যাবে যে, সংসদ দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা নিয়েও আলোচনা করতে পারছে না।
“এই মুহূর্তে বাংলাদেশে প্রিভেইলিং যতগুলা সমস্যা আছে, এর মধ্যে সবচাইতে গুরুতর সমস্যা হচ্ছে জ্বালানির সমস্যা।”
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, তিনি নিজেও মাঠে গিয়ে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করেছেন। পত্রিকা ও সামাজিক মাধ্যমে যা আসছে, তার কিছু সত্য, কিছু অতিরঞ্জিত হতে পারে। কিন্তু সরকারি বিবৃতির সঙ্গে বাস্তবতার মিল তিনি পাচ্ছেন না।
“আপনি বিবৃতির কথা বলেছেন। তিনি যে বিবৃতি দিয়েছেন, বাস্তবের সাথে তার কোনো মিল খুঁজে পাইনি। সেই বিবৃতি দিয়ে কী হবে? এই বিবৃতিতে কি সমস্যার সমাধান হবে?”
একদিকে সরকার বলছে তেলের সংকট নেই, অন্যদিকে বাস্তবে মানুষ ‘ভিন্ন চিত্র দেখছে’ বলেও মন্তব্য করেন শফিকুর রহমান।
“আমরা চাই সবাই মিলে কন্ট্রিবিউট করতে, চাপটা কমাতে, পরিস্থিতিটা সহজ করতে।”
তিনি বলেন, “জনগণ তো তাদের প্রয়োজনে আমাদের পাঠিয়েছেন। আমাদের প্রয়োজনে তো আসিনি। সেই প্রয়োজন যদি পূরণ করতে না পারলাম, থাকার তো কোনো সার্থকতা নাই।”
এ পরিস্থিতিতে প্রস্তাবটি এখনই নিষ্পত্তি না করে এক বা দুই দিন পরে হলেও সংসদ নেতার উপস্থিতিতে আলোচনার জন্য সময় নির্ধারণ করার অনুরোধ জানান তিনি।
আলোচনার পক্ষে, তবে মুলতবির বিপক্ষে সরকারি দল
এরপর বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, বিরোধীদলীয় নেতার উত্থাপিত বিষয়টি “অবশ্যই আলোচনার যোগ্য এবং জাতীয় জীবনে জরুরি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও বটে।”
তবে তার বক্তব্য ছিল, প্রশ্নটি আলোচনা হবে কি না, তা নয়; প্রশ্ন হচ্ছে, আলোচনা করতে গিয়ে সংসদের বৈঠক মুলতবি করা হবে কি না।
তিনি বলেন, ডেপুটি স্পিকার আলোচনার বিষয়টি নাকচ করেননি, বরং বিকল্পভাবে আলোচনার সুযোগ আছে বলে মত দিয়েছেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংসদীয় রীতি ও ইতিহাসে মুলতবি প্রস্তাব সাধারণত বিরোধী দল থেকেই আসে এবং অনেক সময় তা সরকারি দলের কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত করার হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। তবে ‘সাম্প্রতিক ও জ্বলন্ত ইস্যুতে’ এ ধরনের প্রস্তাবের রেওয়াজ আছে।
“বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে মুলতবি প্রস্তাব খুব বেশি আলোচনা হয়নি। বর্তমান সংসদের এই সেশনেই আগের দুটি বৈঠকে দুইটি মুলতবি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে, যা ইতিহাসে অনন্য নজির।”
এ অবস্থায় একই সেশনে আরেকটি মুলতবি প্রস্তাব অনুমোদন করা হলে ভবিষ্যতে তা ‘দৃষ্টান্ত হয়ে যাবে’ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
৭১ বা ৬৮ বিধিতে আলোচনার পরামর্শ
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জ্বালানি সংকট নিয়ে আলোচনা পুরোপুরি বন্ধ নেই। তিনি ৭১ বিধি ও ৬৮ বিধির কথা তুলে ধরে বলেন, অন্য বিধিতে নোটিস দিলে এ বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।
তার বক্তব্য, ৭১ বিধিতে নোটিস গৃহীত হলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী বিবৃতি দেবেন, সম্পূরক প্রশ্নও করা যাবে। আর ৬৮ বিধিতে জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনার সুযোগ আছে। সেখানে সময় নির্ধারণ করে কয়েকজন সদস্যকে বক্তব্যের সুযোগ দেওয়া সম্ভব।
তিনি বলেন, “৬৮বিধি অনুসারেও সংক্ষিপ্ত আলোচনার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। সেখানে মন্ত্রীও বিবৃতি দেবেন। আমরাও দু’চার কথা কন্ট্রিবিউট করতে পারব।”
সরকারের দাবি, ‘কোনো সংকট নেই’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার বক্তব্যে সরকারের অবস্থানও তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, “আমাদের দেশে জ্বালানি তেল এবং গ্যাসের কোনো সংকট নেই। সেটা আমরা পরিসংখ্যান দিয়ে দেখিয়েছি। মন্ত্রী দেখিয়েছেন।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংসদ নেতার ‘প্রত্যক্ষ নির্দেশনায়’ দীর্ঘদিন জনগণের সুবিধার কথা বিবেচনায় রেখে জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়নি, যাতে দ্রব্যমূল্য ও জনদুর্ভোগ না বাড়ে।
তবে এক পর্যায়ে পরিস্থিতি ‘শৃঙ্খলায় আনা’ এবং অপচয় বা পাচারের প্রবণতা ঠেকাতে সরকার জ্বালানির মূল্য ‘কিঞ্চিত’ বাড়াতে বাধ্য হয়েছে বলে তার ভাষ্য।
তিনি বলেন, “এ বিষয়ে কোনো সংকট নেই। সুতরাং মুলতবি রেখে সংসদের অধিবেশন এই আলোচনাটা করার প্রয়োজন নেই।”
‘সংকট সংসদের ভেতরে নয়, বাইরে’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের জবাবে আবার ফ্লোর নেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, “কোনো সংকট নাই, এটা আসলে সংসদের ভিতরে নেই। সংকটটা আমাদের সংসদের বাইরে।”
উদাহরণ হিসেবে তিনি হাই কোর্টের কথা তুলে বলেন, “জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য দেশের এমন স্পর্শকাতর জায়গাতেও দুই দিন ভার্চুয়ালি আদালত চালাতে হয়েছে। এটিই প্রমাণ করে বাস্তবে সমস্যা আছে।”
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, “সংকটটা এই সরকারের সৃষ্টি নয়। একটা গ্লোবাল ম্যাটার। যুদ্ধ পরিস্থিতি চলছে। এগুলো বুঝি।”
তবে সে কারণেই সবাই মিলে সমাধানের পথ খোঁজা উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।
শফিকুর বলেন, “সব দায়িত্বই যদি এককভাবে সরকারি দল পালন করে, আমরা কোনো সুযোগ পাব না। জনপ্রতিনিধি বাদ দিলেও দেশের নাগরিক হিসেবেও আমাদের কিছু দায় আছে।”
সংলাপের এক পর্যায়ে ডেপুটি স্পিকার বলেন, বিষয়টি হচ্ছে আলোচনা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও আলোচনা চান। বিরোধীদলীয় নেতাও আলোচনা চান। প্রশ্ন হচ্ছে, তা সংসদ মুলতবি করে হবে, নাকি না করে হবে।
“সেদিনই প্রায় আধা ঘণ্টার মত আলোচনা হয়ে গেছে। চাইলে অন্য বিধিতে এ আলোচনাকে এগিয়ে নেওয়া যেতে পারে। আধা ঘণ্টার জায়গায় এক ঘণ্টা বা দেড় ঘণ্টাও করা যেতে পারে, তবে সংসদ মুলতবি না রেখেই।”
এ পর্যায়ে বিরোধীদলীয় নেতা রসিকতার সুরে বলেন, “আপনার বুলিতে চন্দন ফুটুক। ফুল ফুটুক। আপনি শেষে বলেছেন দেড়ঘণ্টা। আমি মেনে নিলাম। আপনারটাই কবুল।”
তিনি বলেন, আজই তিনি নতুন করে নোটিস দেবেন এবং সংসদ নেতার উপস্থিতিতে আলোচনা চান।
তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবার বলেন, সংক্ষিপ্ত আলোচনার বিধিতে সময়সীমা এক ঘণ্টা। এর বেশি হলে তা বিধিভঙ্গ হবে।
শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত
আলোচনা এক ঘণ্টায় সীমিত রাখার প্রস্তাবে বিরোধীদলীয় নেতা হাস্যরসের ভঙ্গিতে বলেন, “সুন্দর করে কথা বলার পরেও কি মন গলাইতে পারলাম না? আর কোন ভাষায় বললে মন গলবে?”
তবে তিনি শেষ পর্যন্ত বলেন, স্পিকার যা ‘সর্বোত্তম’ মনে করবেন, সেটাই তিনি মেনে নেবেন। তার চাওয়া শুধু ‘অর্থবহ আলোচনা’।
ডেপুটি স্পিকারও শেষ পর্যন্ত বিরোধীদলীয় নেতাকে নতুন নোটিস দিতে বলেন।
“আপনি নোটিসটা দেন, আমরা কার্যকর পদক্ষেপ নেব। অর্থবহ আলোচনার জন্য যা করণীয় সংসদ তাই করবে।”