০৯ অক্টোবর ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩

জামায়াত জোটের বাকি ৪৭ আসনের ভাগাভাগি কতদূর? ইশতেহার কীভাবে?

যৌথ ইশতেহারের বিষয়ে এখনো নিশ্চিত নন এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু। তার দাবি, নির্বাচনি প্রচারে জোটগত অংশগ্রহণ থাকতে পারে, কিছু আসনে।

বিডিনিউজ২৪

সালমান তারেক শাকিল

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 19 Jan 2026, 02:30 AM

Updated : 26 Aug 2026, 05:35 PM

জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন নির্বাচনি জোটে যোগ না দেওয়ায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জন্য রাখা ৪৭ আসন ভাগাভাগি কীভাবে হবে? 

১১ দলীয় জোট বলা হলেও দল রয়েছে ১০টি, সেখানে আরেকটি দলকে জোটে টানা হবে?

আসন ভাগাভাগি হয়ে যাওয়ার পর জোটের তরফে যৌথ ইশতেহার দেওয়া হবে?

এ সব বিষয়ে জোটের শরিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনা চলছে বলে কয়েকটি দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা বলেছেন। 

যৌথভাবে নির্বাচনি ইশতেহার দেওয়া যায় কি না, সে আলোচনায় কোনো কোনো দল ইতিবাচক। কেউ কেউ স্বতন্ত্রভাবেও ইশতেহার দেওয়ার পক্ষে।

জোটের ওই নেতারা বলেছেন, বণ্টনের বাকি থাকা ৪৭ আসনের ১০টি দুইটি দলকে দেওয়া হচ্ছে, বাকিগুলো ভাগাভাগি নিয়ে জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির মধ্যে আলোচনা চলছে। 

নতুন যে দলকে জোটে অন্তর্ভুক্ত করা হবে তাদের সঙ্গে আসন সমঝোতায় না যাওয়ার কথা বলেছেন জোটের অন্যতম শীর্ষ নেতা বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক।

১৬ জানুয়ারি রাতে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন নির্বাচনি মোর্চার সমঝোতার ভিত্তিতে ২৫৩ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়। 

১৬ জানুয়ারি রাতে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন নির্বাচনি মোর্চার সমঝোতার ভিত্তিতে ২৫৩ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়।

কীভাবে হচ্ছে ৪৭ আসন ভাগাভাগি?

২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট গণঅভ্যুত্থানে বদলে যাওয়া বাংলাদেশে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগকে বাইরে রেখে হতে যাওয়া ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির বড় প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করা হচ্ছে জামায়াতকে। 

২০০১ সালে বিএনপি জোট সরকারের শরিক দলটি এবার ইসলামপন্থিদের ভোট এক বাক্সে আনার লক্ষ্যে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, ইসলামপন্থি প্ল্যাটফর্ম হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে থাকা কয়েকটি দলের সঙ্গে মোর্চা গড়ে তোলে। তবে আসন সমঝোতা নিয়ে টানাপড়েনে ইসলামী আন্দোলন এককভাবে নির্বাচনের ঘোষণা দিয়ে জামায়াতের সেই মোর্চা ত্যাগ করে।

আসন সমঝোতা নিয়ে টানাপড়েনের মধ্যে বৃহস্পতিবার ‘১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য’ আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা করে। ইসলামী আন্দোলনের অনুপস্থিতিতে জামায়াত ১৭৯, এনসিপি ৩০, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২০, খেলাফত মজলিস ১০, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এলডিপি ৭, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি ৩, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি ২ ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি-বিডিপি ২ আসন নিয়ে সমঝোতায় আসে।

রোববার এনসিপি তাদের ভাগের ৩০ আসনের মধ্যে ২৭টিতে প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করেছে, বাকি তিনটি আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলে দলটি বলেছে।

বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ও জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি-জাগপা আসন না নিয়েই জোটে থাকার সমঝোতা করে।

জোটের কয়েকজন নেতা বলেছেন, বাকি থাকা আসনগুলো চারটি দলের মধ্যে ভাগ হচ্ছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসকে ৭টি দেওয়া হচ্ছে। খেলাফত মজলিসকে দেওয়া হচ্ছে ৩ আসন। আর জামায়াত ও এনসিপির মধ্যে এখনও আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।

গত ২৮ ডিসেম্বর জামায়াত নেতৃত্বাধীন ৮ দলীয় নির্বাচনি জোটে যোগ দেয় এনসিপি ও এলডিপি। 

গত ২৮ ডিসেম্বর জামায়াত নেতৃত্বাধীন ৮ দলীয় নির্বাচনি জোটে যোগ দেয় এনসিপি ও এলডিপি।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক বিডিনিউজ টোয়েন্টি ফোর ডটকমকে বলেন, “ইসলামী আন্দোলন না আসার কারণে ৪৭টি আসন প্রধানত চারটি দলের মধ্যে বণ্টন করা হবে। জামায়াত, এনসিপি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ও খেলাফত মজলিসের আসন বাড়ছে।”

এরকম সমঝোতা হলে মামুনুল হকের দলের আসন বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ২৭, আর খেলাফত মজলিসের হবে ১৩টি।

যদিও জামায়াত জোটের বিভিন্ন পর্যায়ের কয়েকজন নেতা বিডিনিউজ টোয়েন্টি ফোর ডটকমকে বলছেন, এখনও আসন বণ্টন চূড়ান্ত হয়নি। সোমবার জোটের নেতারা এ বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারবেন বলে তারা আশা করছেন।

“আমাদের কোনো দাবি নাই, কথাবার্তা বলতেছি,” বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী।

তিনি বলেন, “সবার সঙ্গে তো বৈঠক হয়নি। কালকের (সোমবার) মধ্যে আশা করি একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারবো।

“আমাদের মধ্যে কোনো দর কষাকষি নাই, আমরা চাই, যত বেশি আসনে জিতে আসা যায়। এই বিষয়ে আমরা পজিটিভ রয়েছি।”

জোটের শরিক হিসেবে এবি পার্টি ইতোমধ্যে ৩ আসন নিয়ে সমঝোতায় উপনীত হয়েছে। বাকি থাকা ৪৭ আসনের মধ্যে একাধিক আসন নিয়ে এবি পার্টির সঙ্গেও সমঝোতা হতে পারে, এমন আভাস মিলেছে।

তবে দলটির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু এ বিষয়ে মন্তব্য করতে চাননি। 

তিনি বলেন, “সোমবার নাগাদ আমরা সিদ্ধান্ত নিতে পারবো।”

জানতে চাইলে ‘১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য’ সমন্বয়ক জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, জোটের প্রার্থিতা ৩০০ আসনেই থাকবে। 

“খুব দ্রুত আমরা চূড়ান্ত আসন বণ্টন জানাবো।”

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট হবে। মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের পর রিটার্নিং অফিসারদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে করা আপিল নিষ্পত্তিও শেষ হয়েছে। আগামী ২০ জানুয়ারি প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন, সেদিনই চূড়ান্ত হবে, কতজন ভোটে লড়বেন।

এই মোর্চায় এখন আর ইসলামী আন্দোলন নেই। নতুন দল অন্তর্ভুক্ত করার আলোচনা চলছে।

এই মোর্চায় এখন আর ইসলামী আন্দোলন নেই। নতুন দল অন্তর্ভুক্ত করার আলোচনা চলছে।

‘নতুন দল যুক্ত হলেও আসন সমঝোতা হচ্ছে না’

ইসলামী আন্দোলন না থাকায় জোটে দলের সংখ্যা বাড়িয়ে ১১টি করার প্রক্রিয়াও এগিয়ে নিচ্ছেন নেতারা।

নতুন কোনো দল জোটে যুক্ত হবে কি না, এমন প্রশ্নে মামুনুল হক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “অন্য কারও জোটের সঙ্গে একীভূত হয়ে কাজ করতে আপত্তি নাই, আগ্রহ আছে। তবে নমিনেশনের সুযোগ নাই আর।”

জামায়াতের এই জোটে জেবেল রহমান গানির নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ ন্যাপের যুক্ত হওয়ার কথা ছিল, জোটের ভেতরে-বাইরে কয়েকটি দলের শীর্ষ নেতাদের আলোচনায় এ বিষয়টি এসেছে। তার সঙ্গে গত কয়েক মাসে একাধিকবার আলোচনা হওয়ার কথা বলেছেন জামায়াতের দুইজন প্রভাবশালী নেতা।

তবে, রোববার দুপুরে জেবেল রহমান গানি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমার সঙ্গে কয়েক দফা আলোচনা হয়েছে জামায়াতের সিনিয়র একাধিক নেতার। তবে আজ (রবিবার) নাগাদ কোনো অগ্রগতি হয়নি।”

এক সময়ের বিএনপি জোটের শরিক বাংলাদেশ ন্যাপের এই নেতা ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যর সঙ্গে যুক্ত হতে রাজি আছেন বলে তার দলের এক নেতার দাবি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জোটের সমন্বয়ক আযাদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরকে বলেন, “কেউ যদি আসতে চায় দরজা খোলা আছে।”

জামায়াত ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান (ডানে) ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। ফাইল ছবি: ভিডিও থেকে। 

জামায়াত ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান (ডানে) ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। ফাইল

যৌথ নাকি আলাদা ইশতেহার?

ইসলামপন্থিদের সঙ্গে এলডিপি, এনসিপি, জাগপার মতো দল নিয়ে জামায়াত জোট করেছে, যাদের সঙ্গে ইসলামপন্থিদের রাজনৈতিক লক্ষ্যের মিল কমই। সে ক্ষেত্রে এই জোটের তরফে যৌথ নির্বাচনি ইশতেহার আসবে কিনা, তা নিয়ে মানুষের মধ্যে আগ্রহ আছে।

‘১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য’ ব্যানারে যৌথ ইশতেহার আসার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জোটের শীর্ষনেতাদের কেউ কেউ বলেছেন। 

জোটের প্রতিটি দল থেকে প্রতিনিধি নিয়ে একটি সমন্বয় কমিটির মাধ্যমে ইশতেহার তৈরি করা হবে, বলেন তারা।

এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্যের ইশতেহার নিয়ে আমরা পজিটিভ। আমাদের দল এনসিপিও ইশতেহার দেবে।”

তিনি বলেন, ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্যের প্রত্যেক দল থেকে প্রতিনিধি নিয়ে একটি সমন্বয় কমিটির মাধ্যমে ইশতেহার তৈরির করার আলোচনা আছে।

ঢাকা-৮ আসনে জোটের প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, জোটের ইশতেহারে জুলাই অভ্যুত্থানের পথ ধরে সংস্কার, আধিপত্যবাদবিরোধী অবস্থানের পাশাপাশি সুবিচার নিশ্চিত করা, অর্থ পাচার ও লুটপাট বন্ধ, নারী ইস্যুকে প্রাধান্য দেওয়া হতে পারে। 

খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব মুহাম্মদ মুনতাসির আলী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে মানুষের মধ্যে আকাঙক্ষা তৈরি হয়েছে-নতুন রাষ্ট্র, রাষ্ট্র ব্যবস্থা ও সংস্কারের, এটাকে (ইশতেহারে) প্রাধান্য দেওয়া।”

জোটের ইশতেহার তৈরির কাজ চলার কথা তুলে ধরে সিলেট-৫ আসন থেকে জোটের এই প্রার্থী বলেন, “তরুণ ভোটারদের চাহিদা মূল্যায়ন করা হবে। নারীদের বিষয়টিও যুক্ত থাকবে। মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তোলার লক্ষ্যে ১১ দলীয় জোট ইশতেহার ঘোষণা করবে।”

তবে যৌথ ইশতেহারের বিষয়ে এখনো নিশ্চিত নন এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু। তার দাবি, নির্বাচনি প্রচারে জোটগত অংশগ্রহণ থাকতে পারে, কিছু আসনে।