Published : 28 Oct 2025, 08:40 PM
জাতীয় জুলাই সনদ বাস্তবায়নে ছয় ধাপের রূপরেখা তুলে ধরে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আবারও জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট আয়োজনের দাবি করেছে।
দলটি বলছে, অভ্যুত্থানের দাবি অনুযায়ী সংবিধান সংশোধনের গণভোট আগে হলে পরবর্তী নির্বাচনেই বেশকিছু সংস্কার বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।
মঙ্গলবার বিকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী মিলনায়তনে ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন রূপরেখা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এ রূপরেখা তুলে ধরা হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের একটি আদেশের মাধ্যমে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবি তুলে ধরে দলটি রূপরেখায় ছয়টি ধাপের কথা বলেছে।
এনসিপির এ রূপরেখা যখন প্রকাশ করে এর কিছু আগে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে সাংবিধানিক আদেশের মাধ্যমে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন বা আগে জুলাই সনদ নিয়ে গণভোট আয়োজনের আনুষ্ঠানিক সুপারিশ করে।
মঙ্গলবার দুপুরে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে সনদ বাস্তবায়নের এসব সুপারিশ হস্তান্তর করেন ঐকমত্য কমিশনের সদস্যরা।
এর কিছু পরে জাতীয় প্রেস ক্লাবে লিখিত রূপরেখা তুলে ধরে এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব জহিরুল ইসলাম মুসা বলেন, “ঐকমত্য কমিশনে দীর্ঘ আলাপ-আলোচনা ও বিতর্কের পর রাজনৈতিক দলগুলো কর্তৃক গৃহীত জুলাই সনদের অন্তর্ভুক্ত সংস্কার প্রস্তাবনা বাস্তবায়িত হলে রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটবে।
“সাংবিধানিক ও আইনগত সংস্কার বাস্তবায়ন করার মাধ্যমে ফ্যাসিবাদি ক্ষমতা কাঠামো থেকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনিমার্ণের পথ সুগম হবে।”
রূপরেখা তুলে ধরার সময় দলটির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহ ও সারোয়ার তুষারসহ অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন।
রূপরেখায় জুলাই সনদ বাস্তবায়নে এনসিপির তুলে ধরা ধাপগুলো হল
প্রথমত, জুলাই গণ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রকাশিত জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশের ‘অথরিটি’ হিসেবে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস ‘অর্ডার’ (আদেশ) জারি করবেন। এটির সম্ভাব্য নাম হতে পারে ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫' বা 'জুলাই সনদ বাস্তবায়ন (সংবিধান সংস্কার) আদেশ, ২০২৫'।
এনসিপি বলছে, “তবে অর্ডারের নামের মধ্যে সংবিধান সংস্কার প্রসঙ্গ থাকতে হবে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে উৎস বিবেচনা করে অর্ডার জারি করা ব্যতীত পুরোনো সাংবিধানিক কাঠামোতে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক অধ্যাদেশ জারি বা প্রজ্ঞাপন বা অন্য কোনো আইনি পদ্ধতির মাধ্যমে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করার সুযোগ নেই।”
রূপরেখায় বলা হয়, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন (সংবিধান সংস্কার) আদেশ, ২০২৫ এর প্রস্তাবনায় এবং আদেশের মধ্যে অবশ্যই জুলাই গণঅভ্যুত্থান এবং মানুষের সার্বভৌম ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ কেন্দ্রিক যথোপোযুক্ত ‘টেক্সট’ হাজির থাকতে হবে।
এনসিপি বলছে, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশের আইনিভিত্তি অবশ্যই গণঅভ্যুত্থান। গণঅভ্যুত্থান নিজেই আইনগত কর্তৃত্বসম্পন্ন। পুরোনো সাংবিধানিক বা আইনি কাঠামো কিংবা আদালতের নজির থেকে গণঅভ্যুত্থানের বৈধতা নেওয়ার কিছু নাই। এরকম উদ্যোগ মূল্যহীন।
রূপরেখার দ্বিতীয় প্রস্তাবে বলা হয়েছে, জুলাই সনদে নেওয়া সাংবিধানিক সংস্কারকে পুরোনো সংবিধানে সন্নিবেশিত করার জন্য পরবর্তী সংসদকে ‘কনস্টিটুয়েন্ট পাওয়ার ডেলিগেট’ করতে হবে। এটা গণভোটের মাধ্যমে হবে।
“গণভোটে শুধুমাত্র পরবর্তী সংসদকে কনস্টিটুয়েন্ট পাওয়ার ডেলিগেট করার বিষয় উল্লেখ থাকবে। গণঅভ্যুত্থানকে বৈধতা দেওয়ার বিষয়ে গণভোটে কোনো প্রশ্ন থাকবে না।”
এনসিপি চাইছে, গণভোট কীভাবে আয়োজিত হবে তার রূপরেখা আদেশে বলা থাকবে। তবে কোনভাবেই গণভোট আয়োজনের পদ্ধতি নিয়ে কোনো অধ্যাদেশ জারি করা যাবে না।
বাস্তবায়ন আদেশের অধীনে নির্বাচন কমিশনকে ক্ষমতায়িত করলে কমিশন বিধি/প্রবিধান বা প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমেও গণভোট আয়োজনের বিস্তারিত পদ্ধতি ঠিক করতে পারে বলেও রূপরেখায় তুলে ধরা হয়েছে।
এনসিপি বলছে, আদেশ জারির মাধ্যমে গণভোট আয়োজন, পরের সংসদকে কনস্টিটুয়েন্ট পাওয়ার ডেলিগেট করা এবং তার মাধ্যমে সংবিধান সংস্কারের কাঠামোর কোন কিছুই বিদ্যমান সংবিধান, আইন বা নজিরে নাই। পুরোটা একটা 'এক্সটা-কনস্টিটুশনাল' ব্যাপার। তাই পুরোনো আইনি বা সাংবিধানিক কাঠামো থেকে এই বৈধতা খোঁজার কোনা সুযোগ নাই।”
দলটির ভাষ্য, গণভোটের মাধ্যমে ‘ডেলিগেটের কনস্টিটুয়েন্ট পাওয়ারের’ একটা লিমিট থাকবে। শুধু জুলাই সনদে গৃহীত প্রস্তাবকেই সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার কাজ করবে তারা।
তাদের দাবি, পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট আয়োজন করতে হবে, যাতে পরবর্তী নির্বাচনেই বেশকিছু সংস্কার বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়।
এক্ষেত্রে পরবর্তী নির্বাচিত প্রতিনিধিদের একটি ‘সময়সীমা’ দেওয়ার বাধ্যবাধকতার কথা তুলে ধরে দলটি বলছে, এ সময়সীমার মধ্যে তারা কাজ সমাপ্ত না করতে পারলে ইতিবাচক পরিণতির ব্যাপারে বলা থাকবে।
রূপরেখার পঞ্চম ধাপে সংস্কার করা সংবিধানকে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান, ২০২৬’ নামকরণ করার কথা বলা হয়েছে।
তারা বলছে, ১৯৭২ সালের সংবিধান ব্রাকেটে ২০২৬ সালে সংস্কারকৃত লিখতে হবে। সেক্ষেত্রেও সাংবিধানিক পদের জন্য নতুন শপথ আয়োজন করতে হবে।
দলটি বলছে, “বিচার বিভাগের জন্য ২০২৬ সালের রেফারেন্স পয়েন্ট খুব গুরুত্বপূর্ণ। অন্যথায় ইতোমধ্যে আদালতের রায়ে সৃষ্ট হওয়া ‘বেসিক স্ট্রাকচার ডকট্রিন’¬- এর নজির দ্বারা এই প্রক্রিয়া চালেঞ্জ করা হতে পারে।”
এনসিপি বলছে, “পুরোনো সংবিধান অনুযায়ী এবং উচ্চ আদালতের বেসিক স্ট্রাকচার ডকট্রিন সংক্রান্ত নজিরের কারণে সংশোধনীর আওতা সীমিত হয়ে আছে এবং সংশোধনীর পদ্ধতি সংবিধানে সুস্পষ্ট করা আছে। গণভোটের মাধ্যমে জনগণ কনস্টিটুয়েন্ট পাওয়ার ডেলিগেট করলে এবং সেই পাওয়ারের বলে সংস্কার করা সংবিধানকে সংশোধনীর মাধ্যমে সংশোধিত বলার কোনো সুযোগ নাই।”
লিখিত রূপরেখা তুলে ধরে এনসিপি নেতা জহিরুল বলেন, “প্রধান উপদেষ্টা কর্তৃক 'জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫' জারি করার আগে অবশ্যই এর খসড়া দেশের জনগণের মতামতের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে। এবং জনগণের মতামত ব্যতীত অগোচরে এই অর্ডারের টেক্সট চূড়ান্ত করা যাবে না।
“গণভোটে একটা প্রশ্ন থাকবে। একাধিক প্রশ্ন রাখা যাবে না। গণভোটে পাস হয়ে এলে 'নোট অফ ডিসেন্ট' এর কোনা কার্যকারিতা থাকবে না। প্রশ্নে পুরো সনদের সংস্কার বাস্তবায়ন এবং কনস্টিটুয়েন্ট পাওয়ার ডেলিগেট করার কথা উল্লেখ থাকবে।”
গণভোটে 'না' জিতলে কী হবে? 'জনগণের উপর আস্থা' রাখতে বললেন আলী রীয়াজ
জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোটের 'কোনো সুযোগ নাই': খসরু
'জাতীয় নির্বাচনের দিন বা আগে' গণভোট করার সুপারিশ ঐকমত্য কমিশনের