Published : 24 Feb 2026, 08:01 PM
একটি দৈনিক পত্রিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ২০২৪ সালের ৫ অগাস্টের ঘটনাপ্রবাহ এবং তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ নিয়ে ‘অনেক কিছুই চেপে গেছেন’ বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান।
মঙ্গলবার এক ফেইসবুক পোস্টে তিনি বলেছেন, “পতিত পলাতক প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের বিষয়ে উনি উপস্থিত নেতৃবৃন্দকে যা বলেছিলেন এবং পরবর্তীতে জাতিকে যা জানিয়েছিলেন তার বর্তমান বক্তব্যে তিনি তা স্বীকার করেননি। আর এখন যা বলছেন সেদিন তার কিছুই তিনি বলেননি।”
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলন পরে সরকার পতনের আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়। অভ্যুত্থানের মুখে ৫ অগাস্ট শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে গেলে আওয়ামী লীগের টানা ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে।
সেদিন রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, “প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন এবং আমি তা গ্রহণ করেছি।”
এরপর সুপ্রিম কোর্টের মতামত নিয়ে ৮ অগাস্ট নোবেলবিজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হয়। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন সেই সরকারের শপথ পড়ান।
তার আড়াই মাসের মাথায় ওই বছর ১৯ অক্টোবর মানবজমিন সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগের ‘কোনো দালিলিক প্রমাণ’ তার কাছে নেই।
বিষয়টি নিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তুমুল আলোচনা শুরু হলে ২১ অক্টোবর এক বিবৃতিতে রাষ্ট্রপতি ‘মীমাংসিত’ বিষয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি না করার আহ্বান জানান।
সবশেষ গত শুক্রবার দৈনিক কালের কণ্ঠকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ৫ অগাস্ট ও পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে রাষ্ট্রপতি অনেক কথা বললেও শেখ হাসিনার পদত্যাগ সংক্রান্ত বিষয়ে আর কিছু বলেননি।
সোম ও মঙ্গলবার কালের কণ্ঠে দুই কিস্তিতে প্রকাশিত ওই সাক্ষাৎকারের সূত্র ধরে জামায়াত আমির তার ফেইসবুক পোস্টে বলেন, “কোটি-কোটি মানুষ যা শুনল এবং সেদিন তিনি যা বললেন আর এখন যা বলছেন তার হিসেব রাষ্ট্রপতি মিলিয়ে দেবেন কি?
“জাতি অবুঝ নয়। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ জায়গা থেকে এ রকম আচরণ অগ্রহণযোগ্য।”
সাক্ষাৎকারে কালের কণ্ঠর প্রশ্ন ছিল, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিন বঙ্গভবনের পরিবেশ কেমন ছিল?
জবাবে রাষ্ট্রপতি বলেন, “স্বাভাবিকভাবে ওই আন্দোলনটা জনবিস্ফোরণে রূপ নেয়। যখন বিক্ষোভকারীরা গণভবন অভিমুখে, তখন আমাকে জানানো হল, যে কোনো মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গভবনে আসবেন। ১২টার সময় আমাকে জানানো হল, উনি প্রস্তুতি নিচ্ছেন বঙ্গভবনে আসার।
“এর আগে আমরা আঁচই করতে পারিনি যে আসলে ঘটনা কী ঘটতে যাচ্ছে। তবে উনি যখন এখানে আসবেন বলছেন এবং হেলিকপ্টারও রেডি, তখন আমরা ঘটনার ভয়াবহতা সম্পর্কে ধারণা করতে পারি। এখানে সিকিউরিটি যারা ছিল, সবাই পজিশন নিয়ে নিল।
“দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে জানানো হল, না, উনি আসছেন না। আসছেন না যখন জেনেছি, তখন আমরাও সতর্ক ছিলাম। কিছুক্ষণ পরেই শুনলাম, উনি দেশ ছেড়েছেন। একসময় জানতে পারলাম, উনি অলরেডি দেশের বাইরে চলে গেছেন।
“সব মিলিয়ে ৩০ থেকে ৪০ মিনিটের মধ্যে সামগ্রিক ঘটনাপ্রবাহের খুব দ্রুত পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছিলাম।”
সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক সাহাবুদ্দিনের কাছে জানতে চাওয়া হয়, সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে তখন কোনো যোগাযোগ হচ্ছিল?
জবাবে তিনি বলেন, “সেদিন বিকেল ৩টার দিকে প্রথমে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান আমাকে টেলিফোনে সব ঘটনা অবহিত করেন। সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ থেকেও আমাকে জানানো হয়। পরে জানানো হল, ওয়াকার সাহেব সাংবাদিকদের সামনে সম্পূর্ণ পরিস্থিতি নিয়ে একটা ব্রিফিং দেবেন।
“উনি ব্রিফিং দিলেন, আমরা টেলিভিশনে দেখলাম। উনি বললেন, প্রধানমন্ত্রী দেশত্যাগ করেছেন। তো দেশবাসী আশ্বস্ত হল যে উনি অলরেডি দেশান্তরী হয়েছেন। তারপর আমাকে সেনাপ্রধান ফোন করে জানালেন যে তারা আসছেন। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী প্রধান—তিনজনই বঙ্গভবনে এলেন। এসে আমার সঙ্গে উদ্ভূত সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনায় বসলেন।
“তখন আমাদের প্রায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা। কী করা যায়, কীভাবে কী হবে—এসব নিয়ে আমরা আলোচনা করলাম প্রায় ২ থেকে ৩ ঘণ্টা। সিদ্ধান্ত হল, সব রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দকে ডাকা হবে। এই কাজে সেনাবাহিনীর টিম নিযুক্ত ছিল। তারপর উনারা চলে গেলেন।
“সেনা সদরে দেশের রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দকে একত্র করা হল। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের মধ্যেও কেউ কেউ ছিল। তখন যাদের পাওয়া গেছে, তাদেরকে নিয়েই আবার তারা বঙ্গভবনে আসেন। আমরা আবার বৈঠকে বসি।”
রাষ্ট্রপতি বলতে থাকেন, “বঙ্গভবনের এই বৈঠকে আমরা দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতার বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছি। কীভাবে, কোন ধরনের সিদ্ধান্ত নিলে দেশের মানুষকে স্বস্তি ফিরিয়ে দেওয়া যায়, সে বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনার আয়োজন হয়।
“আমার সভাপতিত্বে সভা হল। সেনাপ্রধান সঞ্চালনা করলেন। সেখানে তিনি পুরো পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিলেন। সেই বৈঠকে সম্মিলিতভাবে কয়েকটি প্রস্তাব আসে। বিশেষ করে, মূল তিনটি প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। এগুলো হলো—তত্ত্বাবধায়ক সরকার, সর্বদলীয় বা জাতীয় সরকার এবং অন্তর্বর্তী সরকার।
“যে নামেই ডাকা হোক না কেন, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য থাকবে অভিন্ন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বললে হয়ত ওয়ান-ইলেভেনের মত শোনায়। আবার সর্বদলীয় বা জাতীয় সরকার বললে দীর্ঘমেয়াদি সরকারও হয়ে যেতে পারে। তো, নানা বিবেচনায় আমাদের বিজ্ঞ রাজনীতিবিদরা সিদ্ধান্ত নেন যে অন্তর্বর্তী সরকারই গঠন করা উচিত।
“এই সিদ্ধান্ত হল আর আমার ওপর দায়িত্ব পড়ল জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে জাতিকে আশ্বস্ত করার। আর তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে সব ঠিক করবেন সরকারের গঠন প্রণালীটা। এই সিদ্ধান্ত হওয়ার পর প্রফেসর আসিফ নজরুল সাংবাদিকদের কাছে পরিস্থিতির অগ্রগতি তুলে ধরেন।
“আমাকে ভাষণ দিতে হল রাত ১১টার সময়। আর অন্তর্বর্তী সরকার গঠন প্রক্রিয়া তাদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হল। সেনাবাহিনী এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ আলাপ করে এটা করবেন। সেনাবাহিনী থাকবে, সহায়তা করবে সব কিছুতে।”
পুরনো খবর