Published : 25 Dec 2025, 10:48 PM
দীর্ঘ নির্বাসন কাটিয়ে তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে দেশের গণতান্ত্রিক ধারায় যে ঘাটতিগুলো রয়েছে তা পূরণ হওয়ার আশা দেখছেন বাংলাদেশ জাসদের স্থায়ী কমিটির সদস্য মুশতাক হোসেন।
দেশে গণতন্ত্রের উত্তরণের জন্য তার আগমন গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “দেশটা গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় যাবে। বেশ কিছু অস্থিরতা, অস্বাভাবিকতা রয়েছে, বিশৃঙ্খলা রয়েছে। সেটা অনেকখানি কমে যাবে বলে আশাবাদী।”
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের কাছে প্রত্যাশার প্রশ্নে তিনি বলেন, “দীর্ঘদিন ব্রিটেনে ছিলেন, গণতন্ত্রের পীঠস্থানে অনেক দেখেছেন তিনি, মিথষ্ক্রিয়া করেছেন; চিন্তা করার সুযোগ হয়েছে।
“আশরা আশা করি দেশ শান্তিপূর্ণ, গণতান্ত্রিক ধারায় আসবে। যে ঘাটতিগুলো আছে, ঘাটতিগুলো পূরণ করবেন তিনি। তার জায়গা থেকে অবদান রাখবেন।”
তারেক রহমানের দেশে ফেরা উপলক্ষে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সরাসরি সম্প্রচার অনুষ্ঠানের আলোচনায় যোগ দিয়ে এসব বলেন এই রাজনীতিক।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘ সময়ের প্রতিযোগী আওয়ামী লীগকে রাজনীতির ময়দানেই মোকাবেলা করতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে পরামর্শ দেন মুশতাক হোসেন। বলেন, “আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে, রাজনৈতিক ময়দানে মোকাবেলা উচিত। সবাইকে যদি ঢালাওভাবে দমন করা হয়, এটাও কিন্তু অতীতের শিক্ষায় এটা কিন্তু করা যায় না। বরং অতীতের দোষত্রুটি ঢাকার একটা সুযোগ তৈরি হয়।
“অতীতে যে কাজগুলো তারা করেছে, বিশেষ করে গত ১০ বছরে, ’১৪ থেকে ’২৪, এগুলো কিন্তু ঢাকা পড়ে যাবে যদি আওয়ামী লীগের ওপরে বা মুক্তমনার ওপরে, সাধারণ নাগরিক যারা আওয়ামী লীগের সমর্থক তাদের ওপর যদি একই রকম মব সন্ত্রাস করা হয়। তাহলে কিন্তু অতীতের ধারাবাহিকতা দেখা যাবে। দেখা যাবে, তাদের দোষত্রুটি মানুষ আর সামনে আনছে না, তাদের ওপর নির্যাতন সামনে আনছে “

লন্ডনে দেড় যুগের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে বৃহস্পতিবার বেলা পৌনে ১২টায় ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দরে সপরিবারে পৌঁছান তারেক রহমান। সেখানে দলীয় নেতাদের উষ্ণ অভ্যর্থনার পর সোয়া ৩ ঘণ্টায় পৌঁছান ৩০০ ফিটের সমাবেশে, যা পরিণত হয়েছিল জনসমুদ্রে। সেখানে ১৫ মিনিটের মত বক্তৃতা করে তিনি বসুন্ধরায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মা খালেদা জিয়াকে দেখতে যান।
তারেকের মাতৃভূমিতে ফেরার দিনের সরাসরি সম্প্রচার অনুষ্ঠানে অতিথি হয়ে এসেছিলেন মুশতাক হোসেন। ডাকসুর সাবেক এই সাধারণ সম্পাদক (১৯৮৯-৯০) ছিলেন এরশাদবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা। এখন তিনি বাংলাদেশ জাসদ এর স্থায়ী কমিটির সদস্য।
চব্বিশের অভ্যুত্থানে দেড় দশক ধরে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের পতনের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে মেরুকরণ, অতি ডান পন্থার উত্থান, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনমানুষের আস্থা ফেরানো নিয়ে তারেক রহমানের প্রতি প্রত্যাশার কথাও আলোচনায় তুলে ধরেন এই রাজনীতিবিদ।

মুশতাক হোসেন বলেন, “ডান পন্থা, বাম পন্থা, মধ্য পন্থা- যে যার মত রাজনীতি করতে পারে যে কেউ। কিন্তু ডান পন্থার উত্থানের নামে যদি সহিংসতার জয় লাভ হয়, নব্য ফ্যাসিবাদী কায়দায় অন্যদের উপর ছাপিয়ে দেওয়া হয় (তাহলে আপত্তি)।
“অভিযোগ করা হয় বিগত আওয়ামী লীগ সরকার রাষ্ট্রীয় বাহিনী ব্যবহার করে বিরোধী দলকে দমন করেছে। এখন যদি সরকারের বহির্ভূত শক্তি একই রকম সহিংসতা, বেসরকারি সামরিক শক্তি ব্যবহার করে গণমাধ্যম পুড়িয়ে দেওয়া, টার্গেট কিলিং করা, হুমকি দেওয়া-এখানে কিন্তু আপত্তি।”
তিনি বলেন, ডান পন্থা প্রচার করে জনগণ যদি গ্রহণ করে, দেশের দায়িত্ব পাবে। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় ও অশনি সংকেত- ‘আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদ’ তাড়াতে গিয়ে উগ্র ফ্যাসিবাদ কায়েম করেন, তাহলে দেশটা আরও খারাপ হয়ে গেল। তাহলে আগের ফ্যাসিবাদ গ্রহণযোগ্য হয়ে যায়, মানুষ বিশৃঙ্খলাকে নিয়তি মনে করবে।
“সেটা তো গণতান্ত্রিক উত্তরণ হল। তারেক রহমান, বিএনপি বলেছে- তারা গণতান্ত্রিক উত্তরণে এগিয়ে নিতে কাজ করবে। আমরা আস্থা রাখতে চাই। তবে অতীতে আমরা দেখেছি-বিএনপি ও আওয়ামী লীগ অতীতের গণতন্ত্রের পথে হাঁটেনি। বিশেষ করে বিএনপির ২০০১ থেকে ২০০৬ এর শাসন খুই সহিংস, দমনমূলক ছিল, গ্রেনেড হামলা হয়েছে।”
তিনি বলেন, শেখ হাসিনার জনসমাবেশেই শুধু নয়, কিছু রাজনৈতিক নেতাকে হত্যা করা হয়েছে। এর দায় দায়িত্ব বিএনপি এড়াতে পারে না, সে বিচার শেষ হয়নি। বিচার শেষ হওয়া দরকার।
২০০১ থেকে ২০০৬ সালের সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে ‘শান্তিপূর্ণভাবে দেশ চালানোর’ বিষয়েও তারেক রহমানের প্রতি আস্থা রাখতে চান বাংলাদেশ জাসদের এই নেতা।
আওয়ামী লীগ সরকারে আমলে ভোট নিয়ে প্রহসনসহ নানা প্রসঙ্গ টেনে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য বলেন, “চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পরে দেশকে সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক ধারায় নেওয়ার জন্য একটা লক্ষ্য ছিল, বিএনপিসহ বেশ কিছু দল কোণঠাসা ছিল, যদিও তাদের রাজনীতির সাথে অনেকে একমত নাও থাকতে পারে। কিন্তু গণতান্ত্রিক পরিসরে সবার অংশগ্রহণটা খুব প্রয়োজনীয় ছিল। ‘২৪ এর পরে আশা ছিল, সেই শূন্যস্থান পূরণ করে সেই গণতান্ত্রিক যাত্রা পথে ভূমিকা রাখবে, তারা করেছেও।“
তিনি বলেন, তাদের (বিএনপি) প্রধান নেতা (তারেক রহমান) বিদেশে থাকায় সেটা অসম্পূর্ণ ছিল। নির্বাসন থেকে ফেরত আসা-এটা তাৎপর্যপূর্ণ। দলটির রাজনৈতিক শূন্যতা বলা যাবে না, তবে রাজনৈতিক যে ঘাটতিগুলো আছে সেটা পূরণের জন্য বিএনপি একটা বড় ভূমিকা রাখতে পারে। তাদের প্রধান নেতা অসুস্থ হয়ে আছেন, দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না।
“সেক্ষেত্রে রাজনৈতিক যে ঘাটতি রয়েছে সেটা পূরণ করবার জন্য যথাযথ ভূমিকা রাখবে আশা করি। গণতন্ত্রের উত্তরণের জন্য তার আগমনটা গুরুত্বপূর্ণ। আশাবাদী, দেশটা গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় যাবে। বেশ কিছু অস্থিরতা, অস্বাভাবিকতা রয়েছে, বিশৃঙ্খলা রয়েছে। সেটা অনেকখানি কমে যাবে বলে আশাবাদী।”
মুশতাক হোসেন এসময় দেশে চলতে থাকা ‘পরিকল্পিত দঙ্গলবাজী ও মব সন্ত্রাসের’ দমনেও তারেক রহমান কাজ করবেন বলে আশা রাখেন। বলেন, “পাঁচ অগাস্টের পরে যেসব বিশৃঙ্খলাগুলো ঘটেছে, সব জায়গায় বিএনপির সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। যে পর্যায়েই হোক না কেন। তো সেখানে তারা যে পরিকল্পিতভাবে দঙ্গলবাজী হচ্ছে, মব সন্ত্রাসী হচ্ছে।
“এটা কীভাবে বন্ধ হবে তা নির্ভর করে তারেক রহমান এটার ওপর কী দৃষ্টিভঙ্গি। যেহেতু গোটা দলের ওপর সবচাইতে তার প্রভাব বেশি, সাংগঠনিক শৃঙ্খলার চাইতেও আবেগগত প্রভাব বেশি কাজ করবে। দেখা যাক, আমরা আশা করছি যে নিশ্চয়ই তিনি এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।”
তার দলের সম্পৃক্ততা বন্ধই নয় বরং অন্যরাও যেন এসব করতে না পারে সেজন্য বিএনপির সবাইকে সম্পৃক্ত করার পরামর্শ দেন তিনি।
মুশতাক হোসেন বলেন, “তারেক রহমানের দলের অসংখ্য কর্মী আছে, প্রায় সব উপজেলা-জেলা, এমনকি গ্রাম পর্যন্ত, তার দল যদি সত্যি সত্যি গুরুত্ব দিয়ে এই মব সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করে, দঙ্গলবাজীর বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করে, তার দল যদি এটা হতে না দেয়, তাহলে যারা এটা চালাচ্ছে মবে নামে পরিকল্পিত বিশৃঙ্খলা সেটা কঠিন হয়ে যাবে।
“এবং যারা এগুলো করবে তাদেরকে গ্রেপ্তারে সহায়তা করতে পারে। পুলিশ যেন তাদের ধরতে পারে।”
সবশেষ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার পালাবদলের ধারা চালুর প্রত্যাশা রেখে তিনি বলেন, “নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার পালাবদলের ঐতিহ্য ফিরে আসা দরকার। বাংলাদেশে খুব কমই নির্বাচনের মাধ্যমে পরবর্তী সরকার এসেছে। প্রায় সময়ই হয় গণ অভুত্থান, না হয় সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে এসেছে। ফলে নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের ধারাটা ফিরে আসুক। এবং সমস্ত রাজনৈতিক দল যেন অবাধে তাদের মতামত প্রকাশ করতে পারে।
“নির্বাচনের পরও তো বিরোধী দল হবে, সরকারি দল হবে। সেখানেও যেন তারা অবাধে এই মতামতগুলো প্রকাশ করতে পারে। সেই ভিত্তিতে যদি নির্বাচনটা হয় তাহলে আমরা আশাবাদী হতেই পারি।”