“আগামী নির্বাচনে আমরা ইসলামী দলগুলোর সাথে জোটগতভাবে জাতীয় নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিয়ে কাজ শুরু করেছি”, বলেন মিয়া গোলাম পরওয়ার।
Published : 22 Nov 2024, 07:05 PM
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নানা ঘটনায় বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের দূরত্বের যে আলোচনা তৈরি হয়েছে তা নাকচ করেছেন দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
সংস্কারের আগে নির্বাচন নয়- জামায়াতের পক্ষ থেকে আসা আগের বক্তব্যেও কিছুটা বদল এসেছে। দলের সেক্রেটারি জেনারেল বলেছেন, তারা সংস্কার চাইলেও সরকারকে খুব বেশি সময় দিতে চান না।
শুক্রবার মেহেরপুর শামসুজ্জোহা পার্কে দলের কর্মিসভায় বক্তব্য রাখছিলেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল।
তিনি বলেন, “বিএনপি আমাদের শরিক দল। আমরা একসাথে ‘ফ্যাসিস্টবিরোধী’ আন্দোলন করেছি। বিএনপির সাথে আমাদের সম্পর্ক এখনও সেই আগের মতই। যারা বিএনপির সাথে আমাদের সম্পর্কে দূরত্ব দেখছে, তারা গুজব সৃষ্টিকারী।”
আগামী নির্বাচনে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ প্রশ্নে জামায়াত নেতা বলেন, “তারা নির্বাচনে আসতে পারবে কিনা সেটি জনআকাঙ্ক্ষার উপর নির্ভর করবে।”
বিএনপি-জামায়াত পরস্পরকে আক্রমণ করে যা যা বলেছে
আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর আগস্টের শেষে নির্বাচন প্রশ্নে বিএনপি ও জামায়াতের নেতারা পরস্পরকে আক্রমণ করে বক্তব্য রাখতে শুরু করেন। বিএনপির পক্ষ থেকে জামায়াতের মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকা সামনে এনে দলটিকে ‘স্বাধীনতাবিরোধীও’ বলা হয়।
আগস্টের শেষ সপ্তাহ থেকেই বিএনপি নির্বাচন প্রশ্নে রূপরেখার দাবি করে আসছে। দলটির বারবার তাগাদার মধ্যে ২৬ অগাস্ট দলের এক আয়োজনে জামায়াত আমির শফিকুর রহমান বিএনপির তুমুল সমালোচনা করে বলেন, “এখন জাতি বহুমুখী সংকটে, একদিকে শহীদ পরিবারগুলো আহাজারি করছে, আহতরা হাসপাতালের বেডে কাতরাচ্ছে, পা হারা, হাত হারা, চোখ হারা, কী কষ্টের মধ্যে তারা আছে। আবার ইতিমধ্যে বন্যার ভয়াবহতা শুরু হয়েছে।
“যারা জনগণের জন্য রাজনীতি করে… রাজনীতি তো জনগণের জন্য তাদের তো উচিত এই বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানো। এই সময়টায় ওখানে না দাঁড়িয়ে যদি নির্বাচন, নির্বাচন, নির্বাচন জিকির করলে জাতি তা কবুল করবে?”
বিএনপির সঙ্গে আর জোটে না যাওয়ার কথা জানিয়ে দলটির বিরুদ্ধে দখলবাজির অভিযোগও আনেন জামায়াত নেতা।
তিনি বলেন, “নির্বাচন ওনাদের (বিএনপি) লাগেও তো না, যেখানে যা দখল করা, ফুটপাত থেকে ফকিরের বাণিজ্য পর্যন্ত সব ওনারা নিয়ে নিয়েছেন। আওয়ামী লীগ ১৫ বছরে যা সাজিয়েছিল, তার ৮০ শতাংশ ওনাদের দখলে ইতিমধ্যে চলে গেছে। বাকি ২০ ভাগ বাকি আছে। আর কী করবে সরকারে গেলে? সরকার তো হয়েই গেছে।”
দুই দিন পর ঢাকাতেই এক আলোচনায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই বক্তব্যের জবাব দিয়ে বলেন,
“যাদের জনসমর্থন নেই, জনগণ মনে করে না যে এরা সরকার চালাতে পারবে, তারা এ ধরনের বিভিন্ন চিন্তা–ভাবনা করে, আমি কোনো দলের নাম বলছি না।
“আমরা এখনও এক-এগারোর কথা ভুলে যাইনি। তাই আবার যখন ওই চেহারাগুলো সামনে আসে, তখন যথেষ্ট সন্দেহের উদ্রেক হয়, প্রশ্ন এসে যায়। সেজন্য আমরা একটা আলোচনার কথা বলেছি, পারস্পরিক আলোচনা দরকার।”
জামায়াত আমিরের বক্তব্য সংবাদ মাধ্যমে গুরুত্ব পাওয়ায় সেদিন উষ্মাও প্রকাশ করেন বিএনপি নেতা। শফিকুরের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, “কিছু ফেইস দেখলে আমরা ভয় পাই। আপনারাও দেখেছেন। কোনো দিন দেখিনি… হঠাৎ করে মিডিয়ার ফ্রন্ট পেইজে চলে আসছে…তার বক্তব্য, তাদের থিওরি এগুলো আপনারা প্রচার করছেন।”
জামায়াত প্রসঙ্গে ফখরুল সেদিন আরও বলেন, ‘‘আমার বাংলাদেশের স্বাধীনতায় যে বিশ্বাস করে না, সেই ধরনের দলকে তো সমর্থন করা যাবে না।”
গত ৫ অক্টোবর প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর সংলাপেও নির্বাচন প্রশ্নের জামায়াত ও বিএনপির বিপরীতমুখী অবস্থান ফুটে উঠে।
আলোচনা শেষ করে মির্জা ফখরুল সাংবাদিকদেরকে বলেন, “আমরা একটা রোড ম্যাপ দিতে বলেছি। নির্বাচন কমিশন কবে নির্বাচন করবে সে ব্যাপারে একটা রোড ম্যাপ দিতে বলেছি।”
শফিকুর সংলাপ থেকে বের হয়ে বলেন, “আমরা মনে করি, নির্বাচন থেকে সংস্কার বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”
জামায়াতের অবস্থান বদল?
মেহেরপুরে জামায়াত সেক্রেটারি পরওয়ার যা বলেছেন, তাতে সংস্কার প্রশ্নে জামায়াতের আগের অবস্থান কিছুটা বদলের ইঙ্গিত মিলেছে। সংস্কারের জন্য সরকারকে কত সময় দিতে চান সেই জিজ্ঞাসার জবাবে তিনি বলেন, “খুব বেশি সময় নয় আবার দুই তিন মাসও নয়। আমরা সংস্কারের মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য সরকারকে গ্রহণযোগ্য সময় দিতে চাই।
“তবে এই যৌক্তিক সময় কতদিন বা কত বছর তা নির্দিষ্ট করে বলা মুশকিল। নির্বাচন কমিশন, পুলিশ প্রশাসন ও নির্বাহী বিভাগ সংস্কারের পর সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি হলেই জাতীয় নির্বাচন হতে পারে।”
জামায়াত সেক্রেটারি বলেন, “এখন প্রশাসন এবং রাষ্ট্রকে সংস্কার জরুরি একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য। তাই আমরা আগে সংস্কার, তারপর নির্বাচন দাবি করছি।”
জামায়াত আমির যে বিএনপির সঙ্গে আর জোটে না যাওয়ার ঘোষণা গত আগস্টের শেষে দিয়েছেন, সেই অবস্থানেই আছে দলটি।
পরওয়ার বলেন, “আগামী নির্বাচনে আমরা ইসলামী দলগুলোর সাথে জোটগতভাবে জাতীয় নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিয়ে কাজ শুরু করেছি। দল সেভাবেই সংগঠিত হচ্ছে।”
পরে অবশ্য আবার তিনি বলেন, “গণতন্ত্রের স্বার্থে যারা ঐক্যবদ্ধ থাকবে তাদের সাথেই জোটবদ্ধ নির্বাচন করবে জামায়াত।”
মেহেরপুর জেলা জামায়াতে র আমির তাজউদ্দিন খাঁনের সভাপতিত্বে এই কর্মিসভায় বক্তব্য রাখেন দলের জেলা শাখার সেক্রেটারি ইকবাল হোসেন, চুয়াডাঙ্গা জেলা আমির রুহুল আমিন, যশোর-কুষ্টিয়া অঞ্চল টিমের সদস্য আলমগীর বিশ্বাস, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মোবারক হোসেন।
আরও পড়ুন
গাইবান্ধায় বিএনপি-জামায়াতের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, আহত ১০
'যারা ভোটে জিততে পারবে না, তারা এসব বলে': জামায়াত আমিরকে ফখরুল