১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪ আশ্বিন ১৪৩৩

পাল্টাপাল্টি সমাবেশের উত্তেজনা ছাড়াচ্ছে উদ্বেগ

ভোট ঘনিয়ে আসছে, উত্তাপ বাড়ছে রাজনীতিতে; পাল্টাপাল্টি সমাবেশের জন্য প্রস্তুত দুই শিবির, তাতে উদ্বেগও ছড়াচ্ছে।

পাল্টাপাল্টি সমাবেশের উত্তেজনা ছাড়াচ্ছে উদ্বেগ

নয়া পল্টনে বিএনপি কার্যালয়ের সামনে দিনভর ছিল পুলিশ সদস্যদের অবস্থান।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 28 Jul 2023, 01:06 AM

Updated : 28 Jul 2023, 01:06 AM

বিউটি আক্তার থাকেন ঢাকার আজিমপুরে। একটি কাজে তাকে গুলশান যেতে হত। ভাবছিলেন শুক্রবার যাবেন। কিন্তু গুলিস্তান আর নয়া পল্টনে দুটি সমাবেশ নিয়ে বেশ চিন্তায় পড়েন। শেষে বৃহস্পতিবারই যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

বিউটি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বিকালে প্রথমে রিকশায় খিলগাঁওয়ে তার এক বোনের বাসায় যান। সেখান থেকে বোনকে নিয়ে গুলশানে যান।

“বৃহস্পতিবার রাস্তা এত ফাঁকা কেন, প্রথমে বুঝতে পারিনি। পরে বুঝলাম, সমাবেশের আগের দিন হওয়ায় সড়কে গাড়ির সংখ্যা কম।”

বিউটির মতো অনেককেই তাদের পরিকল্পনা বদলাতে হয়েছে শুক্রবার ঢাকায় ক্ষমতাসীন দল আর বিরোধী দলের পাল্টাপাল্টি সমাবেশের কারণে।

শুধু পরিকল্পনা বদলেই তার রেশ থেমে নেই, প্রতিপক্ষ ‍দুই দলের সমাবেশ ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা দেখে সংঘাতের শঙ্কাও জাগছে অনেকের মনে।

সেই কারণেই দোকান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বিজয়নগরের চশমা ব্যবসায়ী মো.  শাহজাহান। দুই সমাবেশ স্থলের মাঝখানেই পড়েছে তার এলাকাটি।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “রাস্তার পাশেই দোকান। শুক্রবার দোকান বন্ধ থাকবে। যদি মারামারি অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে, তাই খুব চিন্তায় আছি।”

একই রকম দুশ্চিন্তায় গুলিস্তানের নবাবপুরের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলতাফ হোসেনও। যাত্রাবাড়ীর বাসা থেকে প্রতিদিন নবাবপুরে গিয়ে দোকানে বসেন।

শুক্রবারের পাল্টাপাল্টি সমাবেশে তার মনেও অস্বস্তি। তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “প্রত্যেক শুক্কুরবার নামাজ পড়ি বায়তুল মোকাররমে। নামাজ শেষে বন্ধের দিনেও দোকানের খোঁজ নিই। তারপর বাসায় আসি।

“এবার শুক্কুরবার কী যে হয়? মনে হয় খারাপ কিছু হবে না, তারপরও মনডা চিনচিন করে। গণ্ডগোল হইলে তো গুলিস্তান থেকে নবাবপুর খুবই কাছে। অনেক ব্যবসায়ী তাই শুক্কুরবারও দোকানের আশপাশে থাকবে।”

রাজনৈতিক সমাবেশের কারণে এই শুক্রবার সাপ্তাহিক আড্ডা বাতিল করে দিতে হল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ব্যবসায়ী কামরুল ইসলামের বন্ধুদের।

কামরুল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বন্ধু ও ব্যবসা সূত্রে ঘনিষ্ঠরা প্রতি শুক্রবার সন্ধ্যায় মিলিত হই মতিঝিলে। পুরো সপ্তাহে কাজের যে চাপ তৈরি হয়, তা ঝেড়ে ফেলে একটু মানসিক প্রশান্তি পাই। কিন্তু এবার আড্ডা বাতিল করতে হল।”

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মজীবী নারী শাহানুর ইসলাম থাকেন বেইলি রোডে। কর্মব্যস্ততার কারণে অন্য দিন সময় দিতে না পারলেও শুক্রবার সন্তানদের বেড়াতে নিয়ে যান রমনা পার্কে। দুই দলের বড় সমাবেশের কারণে তার এবারের সাপ্তাহিক ছুটির দিনে ছন্দপতন ঘটছে।

তাতে আক্ষেপ নেই শাহানুরের। তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “রাজনীতির গোলযোগ এতদিন ছিল না। এখন যে অস্থিরতা শুরু হচ্ছে, তা শুক্রবার দিন শেষে ঠাণ্ডা হলেই সকলের জন্য ভালো।”

মনে হয় খারাপ কিছু হবে না, তারপরও মনডা চিনচিন করে
নবাবপুরের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলতাফ হোসেন

বাংলাদেশের ইতিহাসে জাতীয় নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ, সংঘাতম সহিংসতা নতুন নয়। এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটছে না।

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে উত্তাপ। নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে দুই পক্ষের দূরত্ব বাড়ছে। নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানে বিএনপি সরকারের পতন ঘটানোর ডাক দিয়েছে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ কোনোভাবেই তাতে নত না হওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

এই অবস্থায় বিএনপি ঢাকায় বৃহস্পতিবার ‘মহাসমাবেশ’ ডাকার পর আওয়ামী লীগের সহযোগী তিন সংগঠনও শক্তিমত্তার জানান দিতে পাল্টা ‘শান্তি সমাবেশ’ করার ঘোষণা দেয়।

পুলিশ অনুমতি না দেওয়ার পর বিএনপি সমাবেশের দিন পেছায় একদিন। তারপর যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগও তাদের সমাবেশ একদিন পিছিয়ে দেয়।

পুরানো খবর:

দুই দলের সমাবেশই এক দিন পেছাল

পুরানো খবর:

সিদ্ধান্ত বদল, বায়তুল মোকাররমেই সমাবেশ করবে আওয়ামী লীগের ৩ সংগঠন

পুরানো খবর:

দুই দলকেই ২৩ শর্তে সমাবেশের অনুমতি

পুরানো খবর:

পাঁচ শতাধিক নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তারের অভিযোগ বিএনপির

পুরানো খবর:

নয়া পল্টনে ‘মহাসমুদ্র’ দেখার আশায় বিএনপি নেতারা

বিএনপি নেতারা বলছেন, এভাবে ‘সংঘাত বাঁধানোর পাঁয়তারা’ করছে ক্ষমতাসীনরা। অন্যদিকে যুবলীগ নেতারা বলছেন, বিএনপি যেন ‘অরাজক পরিস্থিতি’ তৈরি না করতে পারে, সেজন্যই মাঠে থাকবে তারা।

শেষে একই ধরনের ২৩টি শর্তে নয়া পল্টনে বিএনপিকে এবং তার দেড় কিলোমিটারের মধ্যে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের দক্ষিণ ফটকে আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনগুলোকে সমাবেশ করার অনুমতি দেয় ঢাকা মহানগর পুলিশ।

রাস্তা আটকে কাউকে সমাবেশ করতে না দেওয়ার কথা ডিএমপি বলে এলেও নয়া পল্টন কিংবা বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ ফটক, দুটো সমাবেশই হবে আসলে সড়কে।

দুটি সমাবেশ বিকালে হলেও অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, সকাল থেকেই নেতা-কর্মীদের ভিড় জমতে থাকে। তাতে সড়কে যানজটের পাশাপাশি গণপরিবহনের সংকট দেখা দেয়। কারণ সংঘাতের ভয়ে অনেক মালিক বাস নামান না।

আশুলিয়া কামারপাড়া থেকে চিটাগাং রোডের মনজিল পরিবহনের চালক মো. ইউনুস জানালেন, তাদের মালিক শুক্রবার কোনো বাস না নামাতে বলেছেন। 

এই পরিবহনের ৪০টির মতো বাস প্রতিদিন সড়কে চলে। কিন্তু বৃহস্পতিবার ১০-১২টি নামান হয় বলে জানান ইউনুস।

তবে মোহাম্মদপুর রুটের রমযান পরিবহনের মালিকদের একজন মনজু মোল্লা জানান, তাদের ৫৫টি বাস বৃহস্পতিবার চলেছে, শুক্রবারও চলবে।

এসএসসি পরীক্ষার্থীদের ইচ্ছা পূরণে বাধা

এবারের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হবে শুক্রবার। সমাবেশের কারণে ঢাকার অনেক শিক্ষার্থী ফল দেখতে স্কুলে যাওয়ার চিন্তা বাদ দিয়েছেন।

তারা বলছেন, অনেক শিক্ষার্থীই ফল দেখতে স্কুলে যায়, শিক্ষকদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়। কিন্তু পাল্টপাল্টি রাজনৈতিক সমাবেশ থাকায় উৎকণ্ঠায় রয়েছেন তারা।

ভিকারুননিসানূন স্কুল ও কলেজের এক এসএসসি পরীক্ষার্থীর মা আফরোজা ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমার মেয়ে ও তার বন্ধুরা স্কুলে গিয়ে রেজাল্ট দেখবে বলেছিল। অনেকদিন ওদের দেখা হয় না। কিন্তু সমাবেশের কথা শুনে যেতে দিতে ভয় পাচ্ছি। যে কোনো অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটে যেতে পারে।

“অনেক বাচ্চাদেরই মন খারাপ হয়ে যাবে। রেজাল্টের পরে আমরা মিষ্টি কিনে শিক্ষকসহ পরিচিতজনদের মাঝে বিতরণ করি, কিন্তু এই পরিবেশে আসলে সেটা কীভাবে করব বুঝতে পারছি না।”

হলিক্রস কলেজের এসএসসি পরীক্ষার্থী তাসমিয়া রহমানও সমাবেশের কারণে ফলাফল দেখতে স্কুলে যাবেন না।

তাসমিয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "আমি স্কুলে যেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু আব্বু-আম্মু যেতে নিষেধ করেছে। কোন ঝামেলা হয়ে যাবে, সেজন্যই যেতে দিচ্ছে না।"

উইলস লিটল ফ্লাওয়ারস প্রিপারেটরি স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলাম মনে করেন, সমাবেশের কারণে শিক্ষার্থীদের উদ্বেগের কিছু নেই।

“সবচেয়ে সুবিধার বিষয়টা হল, অনলাইনেই তো ফল পাওয়া যাবে। মোবাইলে এসএমএস করেও জানা যাবে। স্কুলে না এলেও হবে। তারপরেও আমরা তো যাবোই, শিক্ষার্থীরা আসলেও তেমন কোন অসুবিধা হবে বলে মনে হচ্ছে না। তারপরেও সাবধানে থাকতে হবে।"

Image

নয়া পল্টনে বিকালেও ছিল বিএনপিকর্মীদের ভিড়

অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতায় শঙ্কা

কার্যদিবসে না করে সমাবেশ একদিন পিছিয়ে নেওয়ার ঘোষণাকে ‘খুবই প্রশংসনীয়’ বলে মন্তব্য করেন নির্বাচন পর্যবেক্ষক ও বিশ্লেষক আব্দুল আলীম।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বিএনপি তাদের কর্মসূচি একদিন পিছিয়ে ছুটির দিন শুক্রবার করাটা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। যে উদ্বেগের দিকে ধাবিত হচ্ছিলাম, তাতে কিছুটা হলেও স্বস্তি আনবে।”

পাল্টাপাল্টি সমাবেশে সবসময় উদ্বেগ থাকে মন্তব্য করে আলীম বলেন, “একই দিনে, একই সময়ে শক্তি প্রদর্শনের পাল্টাপাল্টি এ প্রবণতা আমাদের জন্য সমস্যা। এমন পরিস্থিতি সবার মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করে। একটি দল কর্মসূচি দিলে একই দিন কাউন্টার কর্মসূচি অন্য দলের পরিহার করা উচিৎ।”

নির্বাচন নিয়ে দুই দল অনমনীয় অবস্থান ধরে রাখলে পরিস্থিতি সহিংসতার দিকে যাবে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

“মনে হয়েছিল- সংলাপ, সমঝোতার সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে। এ মুহূর্তে তা আর দেখছি না আমরা। এ ধরনের মনোভাবে সহিংসতার দিকে যেন এগিয়ে যাচ্ছি আমরা, যা কোনোভাবে কাম্য নয়।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শান্তনু মজুমদার বলেন, নির্বাচনের আর কয়েক মাস বাকি। নির্বাচন ঘনিয়ে এলে রাজনৈতিক দলগুলোর কথার লড়াই বাড়াটাই স্বাভাবিক।

রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিটি পদক্ষেপকে ইতিবাচকভাবে দেখার পক্ষে এই শিক্ষক।

সেই সঙ্গে তিনি বলেন, “তবে অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটানোরও চেষ্টা হয়ে থাকে। তাই বলে আগাম শঙ্কা না করাই ভালো। রাজনৈতিক দলের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি থাকবে, কথার লড়াই থাকবে। কিন্তু অতীতের মতো সহিংসতা মানুষ চায় না।”

Image

বিএনপি কার্যালয়ের সামনে রাতে ট্রাকের পর ট্রাক সাজিয়ে তৈরি হচ্ছিল সমাবেশের মঞ্চ।

দুই দলের প্রস্তুতি

সমাবেশের একদিন আগে পুলিশের অনুমতি পাওয়ার পর দুই পক্ষই মঞ্চ তৈরিসহ প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে।

বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে নয়া পল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে মঞ্চ নির্মাণের কাজ শুরু করে বিএনপি। আটটি বড় আকারের ট্রাক আনা হয়েছে সেখানে। এগুলো জোড়া লাগিয়ে এই অস্থায়ী মঞ্চ করা হবে, যেখানে বসে শুক্রবার বক্তৃতা দেবেন নেতারা।

বিএনপির ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক আমানউল্লাহ আমান এবং দক্ষিণের আহ্বায়ক আবদুস সালামের তত্ত্বাবধানে এই কাজ চলছে।

আমান বলেন, “আমরা বিশ্বাস করি, শুক্রবার নয়া পল্টন এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হবে। আমাদের এই সমাবেশ হবে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ।”

সালাম বলেছেন, “এই সমাবেশের মধ্য দিয়ে জনগণ এই সরকারকে সিগন্যাল দেবে, ক্ষমতা ছাড়। এনাফ ইজ এনাফ। জনগণ এই সরকারকে আর চায় না।”

দিনভরই বিএনপির কার্যালয়ের সামনে ছিল কর্মীদের ভিড়। সন্ধ্যায় পর কয়েক হাজার কর্মী জড়ো হয়ে শেখ হাসিনার পদত্যাগের দাবিতে স্লোগান তোলে।

কর্মীদের শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে আমান বলছিলেন, “মহাসমাবেশের মঞ্চ নির্মাণ করার সুযোগ করে দিতে হবে। আপনারা সরে যান, সকালে আসবেন। রাস্তা বন্ধ করা যাবে না। একটা লাইন করে গাড়ি চলাচলের ব্যবস্থা করে দিন।”

তবে তাতেও কর্মীদের সরানো যাচ্ছিল না। এক পর্যায়ে ছাত্রদলের কর্মীদের দাঁড়িয়ে দুই সারিতে গাড়ি-রিকশা চলাচলের ব্যবস্থা করে দিতে দেখা যায়।

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ থেকে আসা ছাত্রদলের কর্মী আবদুল করিম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আজকে এখানেই আমরা থাকব। পার্টি অফিসের রাস্তাই আজ আমাদের বাড়ির উঠান।”

সহিংসতার দিকে যেন এগিয়ে যাচ্ছি আমরা, যা কোনোভাবে কাম্য নয়
আবদুল আলীম

করিমের সঙ্গে আসা জোনায়েদ আলী বলেন, “আমরা হোটেলে থাকতে পারি না, আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে থাকতে পারি না। তাই এই পার্টি অফিসে সামনে ঘোরাফেরা করে দিন-রাত কাটাচ্ছি।

“পুলিশ আমাদের ঘুমাতে দিচ্ছে না। এটা কি তারা ঠিক করছে? আমরা তো এই পুলিশ সদস্যদেরই কারও না কারও ভাই বা আত্মীয়।”

নয়া পল্টনে বিকাল ৪টায় পুলিশকে যেরকম শক্ত অবস্থানে দেখা গিয়েছিল, সেরকম দৃশ্য দেখা যায়নি রাতে। পুলিশ সদস্যদের ফুটপাতে বসে থাকতে দেখা যায়।

সড়কজুড়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জটলা করে বিএনপিকর্মীরা অবস্থান নিয়েছিলেন। কেউ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লাইভে কথা বলছেন, কেউ সেলফি তুলছেন, কেউ মোবাইলের ক্যামেরা অন করে নয়া পল্টনের কার্যালয়ে দৃশ্য দেখাচ্ছিলেন।

সিরাজগঞ্জ থেকে আসা মবিন আহমেদ তার বোনকে কল করে বলছিলেন, “দেখ, আজকে নয়া পল্টনে কত মানুষ! সবাই আমরা ভালো আছি। চিন্তা কইরো না। আমার কিছু হবে না।”

রাত সাড়ে ৯টায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস নয়া পল্টনে আসেন। রুহুল কবির রিজভী, শহিদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানিসহ কেন্দ্রীয় নেতারাও রয়েছেন সেখানে।

শুক্রবার দুপুর ২টায় শুরু হওয়া এই সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখবেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

Image

বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ ফটকে নির্মিত হচ্ছে যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের সমাবেশ মঞ্চ।

অন্যদিকে একই দিন বিকাল ৩টায় বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ ফটকে যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের যৌথ সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখবেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।

বৃহস্পতিবার রাতে সেখানে মঞ্চ তৈরিতে ব্যস্ত দেখা যায় সংগঠনগুলোর নেতাদের। বাঁশ ও কাঠ দিয়ে দক্ষিণমুখী এই মঞ্চ তৈরি করা হচ্ছে।

যুবলীগ নেতারা বলছেন, তারা বিএনপিকে অনুসরণ করে কর্মসূচি দিচ্ছেন না।

তাদের এই সমাবেশ শেরেবাংলা নগরে মেলা মাঠে হওয়ার কথা ছিল। স্থান পরিবর্তন নিয়ে আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া বলেন, “সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের সঙ্গে পুরাতন বাণিজ্য মেলা এলাকায় মহামান্য রাষ্ট্রপতির একটি কর্মসূচি থাকায় এসএসএফ পারমিশন দেয় নাই, সে কারণে যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও ছাত্রলীগের কর্মসূচি পুরাতন বাণিজ্য মেলায় করতে পারছে না।”

পুলিশও প্রস্তুত

পাল্টাপাল্টি অবস্থান নিয়ে রাজপথে বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের সহযোগী তিন সংগঠনের অবস্থান যেন সংঘাতের দিকে না গড়ায়, সেজন্যই দুই পক্ষকেই ২৩টি শর্ত দেওয়া হয়েছে বলে জানান ঢাকার পুলিশ কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুক।

তিনি বৃহস্পতিবার বিকালে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “আশুরার নিরাপত্তায় পুলিশের ব্যস্ততা রয়েছে, প্রতিদিন তাজিয়া মিছিল হচ্ছে। তারপরও বিএনপি ও যুবলীগকে তাদের পছন্দের জায়গায় ২৩টি শর্তে সমাবেশ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।”

দুই দলকেই তাদের চৌহদ্দি নির্ধারণ করে দেওয়ার কথা জানিয়ে পুলিশ কমিশনার বলেন, বিএনপির ক্ষেত্রে বলা হয়েছে নাইটিঙ্গেল মোড় থেকে পুলিশ হাসপাতালের মোড় (ফকিরাপুল) পর্যন্ত এলাকার মধ্যে তাদের মিছিল-সমাবেশ এবং মাইক ব্যবহার সীমাবদ্ধ রাখতে হবে।

আর আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনগুলোকে মহানগর নাট্যমঞ্চ থেকে মুক্তাঙ্গনের মধ্যে তাদের সমাবেশ এবং মাইক ব্যবহার সীমাবদ্ধ রাখতে বলা হয়েছে।

Image

নয়া পল্টনে সাঁজেয়া যানও তৈরি রেখেছে পুলিশ 

বড় দুই দলকে একই দিনে সমাবেশের অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে ঝুঁকিগুলো পর্যালোচনা করা হয়েছে, নাকি ‘সহানুভূতিশীল হয়েই’ তাদের অনুমতি দেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে খন্দকার গোলাম ফারুক বলেন, “আমাদের কাছে এই মুহূর্তে বড় কোনো থ্রেট নেই। যেহেতু বড় দুটি দলের বড় সমাবেশ, তাই যে কোনো কুচক্রী মহল বা যে কেউ এই সমাবেশের সুযোগ নিয়ে আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটাতে পারে।

“এজন্য আমরা পর্যাপ্ত পুলিশ রাখব, আনসার থাকবে, আর্মড পুলিশ (এপিবিএন) থাকবে, র‌্যাব থাকবে, আমাদের বিজিবি স্ট্যান্ডবাই থাকবে। আমরা আমাদের সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় থাকব।”

কর্মদিবসে সমাবেশ না করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় ঢাকা মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে দুই দলকেই ধন্যবাদ জানান পুলিশ কমিশনার।

জনদুর্ভোগ এড়াতে প্রত্যেক দলকেই স্বেচ্ছাসেবক রাখার পরামর্শ দিয়ে গোলাম ফারুক বলেন, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি হওয়ার মতো কোনো ঘটনা যদি কোথাও দেখা যায়, তবে পুলিশ কঠোর ব্যবস্থা নেবে।

  •  এই প্রতিবেদন সমন্বিতভাবে তৈরি করেছেন সুমন মাহমুদ, মঈনুল হক চৌধুরী, কামাল হোসেন তালুকদার, কাজী নাফিয়া রহমান, শেখ আবু তালেব