Published : 16 Sep 2026, 07:58 PM
চলমান জ্বালানি সংকটের মধ্যে শিল্পে গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের যে ধাক্কা লেগেছিল তা ক্রমে কাটিয়ে উঠতে শুরু করেছে বিভিন্ন কলকারখানা।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনার পর মঙ্গলবার রাত থেকে ঢাকার আশেপাশসহ বিভিন্ন এলাকার শিল্প কারখানায় গ্যাস বাড়তে শুরু করার তথ্য দিয়েছেন শিল্পোদ্যোক্তারা।
বুধবার দিনের প্রথমভাগে ঢাকার বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, ও ময়মনসিংহ গ্যাস সরবরাহ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন বিভিন্ন শিল্প কারখানার কর্তা ব্যক্তিরা। তবে সাভারের কয়েকটি এলাকার সমস্যা কাটতে আরও সময় লাগার কথা বলা হচ্ছে।
উদ্যোক্তাদের আশা, খুব দ্রুত গ্যাসের সরবরাহ আগের মত স্বাভাবিক হয়ে গেলে ক্রেতাদের জন্য তা স্বস্তির বার্তা নিয়ে আসবে।
রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানা অনন্ত গার্মেন্টস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইনামুল হক খান আগের থেকে গ্যাস সরবরাহ বাড়ার তথ্য দিয়ে বলেন, স্বাভাবিক যদি হয়ে যায় তাহলে লোকসান কাটিয়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, ‘‘আমরা চাই সবকিছু দ্রুত স্বাভাবিক হোক। ক্রেতাদেরও সেই নিশ্চয়তা দিতে পারলে রপ্তানি বাড়বে।’’
বস্ত্র খাতের কারখানা এপেক্স স্পিনিংয়ের কোম্পানি সচিব দেলোয়ার হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘‘রাত থেকেই চাপ বেশি পাচ্ছি। এখনো সব ঠিক আছে। আশা করি, গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হয়ে যাবে। এটি হলেই ক্রেতাদের নিশ্চয়তা দিতে পারবো, তারা প্রতিদিন খোঁজ খবর নিচ্ছেন গ্যাস পরিস্থিতির।’’
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘‘গত কয়েকদিনের তুলনায় বুধবার নারায়ণগঞ্জে গ্যাস সরবরাহ বেড়েছে। আমরা চাইবো, সরকার যেভাবে পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছে, খুব দ্রুত সবকিছুই স্বাভাবিক হোক। আমরা সবাইকে আশ্বস্ত হতে চাই জ্বালানি সংকট আর থাকবে না।
‘‘গাজীপুর ও ময়মনসিংহ এলাকার কারখানা মালিকরা জানিয়েছেন, গ্যাসের চাপ বাড়ছে। আজকে এখন (বিকাল সাড়ে ৪টা) পর্যন্ত কোনো লোডশেডিং নাই। কিন্তু সাভারের কয়েকটি এলাকায় এখনো কিছুটা সমস্যা আছে, আশা করছি রাতের মধ্যে তারাও গ্যাস অন্যান্য এলাকার মতো পাবে।’’
বৃহত্তর ঢাকা ও ময়মনসিংহে গ্যাস সরবরাহকারী কোম্পানি তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশনের মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান শিল্প ও বিদ্যুতে গ্যাস সরবরাহে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা তুলে ধরেন।
‘‘আশা করছি পরিস্থিতি খুব দ্রুত আগের মত হবে। আগের মতো মানে গত জুলাই মাসে যেরকম ছিল। আজকে এখন পর্যন্ত কোনো এলাকা থেকে অভিযোগ আসেনি। সাধারণত দিনে অনেকবার এটি পাই।’’
চট্টগ্রাম অঞ্চলের সরবরাহের দায়িত্বে থাকা কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) নাহিদ আলম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘‘আমাদের সরবরাহ গত কয়েকদিন ধরেই বাড়ছে। আজকে (বুধবার) আরো বেড়েছে। এখন কোনো এলাকায় অভিযোগ নাই।’’
পেট্টোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় গ্যাস সরবরাহ হয় ২৩৬ কোটি ৯৫ লাখ কোটি ঘনফুট।
আগের দিন মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ হয় ২৩১ কোটি ৪৮ লাখ ঘণফুট। গত সোমবারে তা ২৩২ কোটি ৮০ লাখ ঘনফুট ও গত রোববার সরবরাহ হয় ২২৭ কোটি ১৩ লাখ ঘনফুট।
আগে থেকেই চাহিদার বিপরীতে গ্যাস সরবরাহ কমে আসার মধ্যে দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটি মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। গত ২১ জুলাই সেখানে অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে সরবরাহ কমে যেতে শুরু করে গ্যাসের। কয়েক সপ্তাহ পর সেটি মেরামতের পর দেখা দেয় এলএনজি কার্গোর সংকট।
গত কয়েক দিনে এলএনজি সরবরাহ বাড়ায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ বাড়তে শুরু করার তথ্য দিচ্ছেন পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা।
এলএনজি টার্মিনালটিতে দুর্ঘটনার দিন অর্থাৎ গত ২১ জুলাই সকাল ৮টা পর্যন্ত গ্যাসের সরবরাহ ছিল ২৫৮ কোটি ৭৩ লাখ ঘনফুট। এর পরে গত ৩১ জুলাই তা নেমে যায় ২১২ কোটি ঘনফুটে। এক মাস পরে ৩০ অগাস্টে হয় ২২৫ কোটি ৭১ ঘনফুট।
তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ কর্পোরেশন (পেট্রোবাংলা) তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের সামগ্রিক চাহিদা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুটের বেশি। এর বিপরীতে বছর কয়েক ধরে দিনে সরবরাহ করা হচ্ছে গড়ে ২৭০ কোটি ঘনফুট। প্রতিদিন সরবরাহ করা মোট গ্যাসের ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশই আসে আমদানি করা এলএনজি থেকে।
দেশের বিভিন্ন স্থানে শিল্পে গ্যাস সংকট তীব্র হলেও বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষের (বেপজা) আওতাধীন অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে থাকা শিল্প কারখানায় গ্যাস সরবরাহে খুব একটা সমস্যা হয়নি।
সিইপিজেডের কারখানা ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিজিএমএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘‘চট্টগ্রামের পতেঙ্গার কর্নফুলী ইপিজেড এলাকার কারখানাগুলো এই দুর্যোগের সময়ে ততটা ভুগতে হয়নি। গ্যাসের সরবরাহ বাড়তে শুরু আমরা আশা করছি, অন্যান্য এলকার পরিস্থিতিও কেটে যাবে।“
এবারের গ্যাস সংকটে ইপিজেডের বাইরে বিশেষ করে গাজীপুর, সাভার ও নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলের শিল্প কারখানা ভুগেছে সবচেয়ে বেশি। এসব অঞ্চলের কারখানার উৎপাদন কমে সক্ষমতার ৪০ শতাংশে নেমে যায়। গ্যাস সংকটে নতুন ক্রয়াদেশ হারিয়েছে সবচেয়ে বেশি বস্ত্র, ডাইং ও স্পিনিং খাত বলে দাবি রপ্তানিকারকদের।
বিজিএমইএ এর পরিচালক ও চট্টগ্রামে অবস্থিত এইচকেসি অ্যাপারেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাকিবুল আলম চৌধুরী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘‘পরিস্থিতি ভালো হয়েছে। আমার কারখানায় লোডশেডিংয়ের মুখে পড়তে হয়নি।
“উৎপাদন নিয়মিত থাকলে রপ্তানিও বাড়বে আশা করি। যেটা ক্ষতি হয়ে গেছে, তা এখন কীভাবে মেকাপ করবো তার পরিকল্পনা নিতে পারবো যদি সরবরাহ ঠিকমত পাই।’’