শর্ত শিথিল করে দ্রুত প্রণোদনার অর্থছাড়ের পরামর্শ ব্যবসায়ী নেতাদের
ঋণপ্রবাহ বাড়ানোসহ অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে উন্নতি ঘটাতে অংশীজনদের সঙ্গে সভা শুরু করেছেন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান।
অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, তার শর্ত আরও শিথিল করে দ্রুত সময়ের মধ্যে অর্থছাড় নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন ব্যবসায়ী নেতারা।
মঙ্গলবার বিকালে বাংলাদেশ ব্যাংকে এক সভায় নানা পরামর্শ দেন তারা।
বন্ধ কারখানা চালু করাসহ অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে গত মে মাসে ষাট হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক আশা করেছিল, প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন শুরু হলে ঋণপ্রবাহ বেড়ে যাবে। কিন্তু চার মাসেও প্রত্যাশিত সাড়া না পাওয়ায় বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধিও খুব একটা গতি পায়নি।
গত অগাস্টেও এ খাতে প্রবৃদ্ধি হয় ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ, যা আগের মাসে ছিল ৪ দশমিক ৬২ শতাংশ।
এমন প্রেক্ষাপটে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোসহ অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে উন্নতি করতে অংশীজনদের সঙ্গে সভা শুরু করেছেন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। আগের দিন তিনি বসেন অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে।
মঙ্গলবার ব্যবসায়িক সংগঠনগুলোর সঙ্গে বৈঠক হলেও গভর্নর সরকারি আরেকটি কর্মসূচিতে চলে যান তিনি। পরে ডেপুটি গভর্নর কাজী আহাম্মদ ও সারোয়ার হোসেন ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বুধবার ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সঙ্গে বসার সূচি রয়েছে গভর্নরের।
ষাট হাজার কোটি টাকার মধ্যে তৈরি পোশাক খাতে ঋণ বরাদ্দ ২০ হাজার কোটি টাকার।
মঙ্গলবারের সভার বিষয়ে পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘‘ব্যাংকগুলো তো মাসে একটি বোর্ড সভা করে। একটি প্রপোজাল গেলে তা এক মাস অপেক্ষা করতে হয়, কোনো কোয়েরি থাকলে বিষয়টিতে তো সিদ্ধান্ত হয় না। আবার এক মাস অপেক্ষা করতে হয়।
‘‘এভাবে তো সময় অনেক লাগে। আমরা বলেছি, দ্রুত অনুমোদন দিতে প্রতি সপ্তাহে একটি বোর্ড মিটিং করার। বাংলাদেশ ব্যাংক নির্দেশনা দিলে তো তারা করতে পারে।’’
চলমান ও পুনর্তফসিল করা ঋণের বিপরীতে ব্যাংকের কাছে জামানত হিসেবে রাখা সম্পত্তির দাম বেড়েছে। সেটি পুনর্মূল্যায়নের দাবি করেছেন তিনি। এটি করলে ঋণসীমাও বাড়ানো যাবে।
সেই যুক্তি দিয়ে মাহমুদ হাসান বলেন, “ঋণগুলো তো ১০ বছর আগের। জামানত রাখা সেই সম্পত্তির দাম তো বেড়েছে। এখন তো পুনর্মূল্যায়ন করতে পারে।”
সভায় অংশ নেওয়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “প্রণোদনা ঋণ দিতে ব্যাংকগুলোর আগ্রহ কম। সভায় তাও বলেছেন ব্যবসায়ীরা। বিষয়টি ব্যাংকারদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে গভর্নর তুলবেন বলে তাদের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আবার কথা বলবেন গভর্নর।’’
অন্যদিকে প্রণোদনা ঋণের শর্ত আরও শিথিল করার দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ প্লাস্টিক গুডস ম্যানুফ্যাকচারারস অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিজিএমইএ) সভাপতি শাহিন আহমেদ।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “ব্যাংকে তো টাকা আছে। এখন ঋণের যে নিয়ম আছে, তা মানতে পারলে তো ব্যবসায়ীরা টাকা নিতোই। সেটি তো হচ্ছে না। এখন যেহেতু প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে, যেহেতু এটা প্রণোদনা, তাই নীতিমালায় আরও ছাড় দিতে হবে। তাহলে ব্যাংকাররা গ্রাহকদের দিতে পারবে।’’
সভায় ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) প্রশাসক ফজলুল হক, ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই), বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারারস অ্যান্ড এক্সপোর্টারস অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।
সভার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময় করছেন। এখানে অর্থনীতিবিদ থেকে শুরু করে ব্যবসায়িক সংগঠন ও ব্যাংকারও রয়েছেন।’’
তিনি বলেন, ‘‘তাদের কাছ থেকে আসা পরামর্শ পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন নীতি-নির্ধারণী সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হবে। সার্কুলারে তার ইফেক্ট (প্রভাব) থাকবে।’’
গত বছরের ডিসেম্বরে ঘোষিত মুদ্রানীতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রত্যাশা ছিল, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ মাস জুনে বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৫ শতাংশের মতো হবে। কিন্তু ১ দশমিক শূন্য তিন শতাংশীয় পয়েন্ট কমে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে নেমে এসেছিল, যা ছিল এ যাবৎকালের সর্বনিম্ন।
