Published : 25 Dec 2025, 08:50 PM
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী জোট বাঁধতে যাচ্ছে বলে দাবি করেছেন বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের সাবেক আহ্বায়ক আব্দুল কাদের।
বৃহস্পতিবার ফেইসবুকে তিনি যে পোস্ট করেছেন, তাতে শুক্রবারই এই জোট বাঁধার ঘোষণা আসতে পারে।
তিনি লিখেছেন, তারুণ্যের রাজনীতির কবর রচিত হতে যাচ্ছে। এনসিপি অবশেষে জামাতের সাথেই সরাসরি জোট বাঁধতেছে। সারাদেশে মানুষের, নেতাকর্মীদের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে জলাঞ্জলি দিয়ে গুটিকয়েক নেতার স্বার্থ হাসিল করতেই এমন আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামীকাল এই জোটের ঘোষণা আসতে পারে।”
এ বিষয়ে এনসিপির মিডিয়া সেলের সম্পাদক মুশফিকুর সালেহিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের আলোচনা চলছে। আমরা কোনো সিদ্ধান্ত নিলে সবাইকে জানিয়ে দিব।”
কাদের তার ফেইসবুক পোস্টে লিখেছেন, এনসিপি ও জামায়াতের আসন সমঝোতা ৩০টি সিটে চূড়ান্ত হয়েছে।
তার পুরো পোস্ট হুবহু তুলে ধরা হলো—
১) জামায়াতের থেকে এনসিপি চেয়েছিল ৫০ আসন, ধর কষাকষির সর্বশেষ পর্যায়ে সেটা ৩০ আসনে গিয়ে চূড়ান্ত হয়েছে।
২) জোটের শর্ত অনুযায়ী এনসিপি বাকি ২৭০ আসনে কোনো প্রার্থী দিতে পারবে না, সেগুলাতে জামাতকে সহযোগিতা করবে এনসিপি।
৩) জামাতের পক্ষ থেকে জোটসঙ্গী হিসেবে আসন প্রতি এনসিপি'কে নির্বাচনি খরচ দেওয়া হবে দেড় কোটি টাকা।
৪) সমঝোতার ৩০ আসনে কারা কারা চূড়ান্ত হবেন, সেই দায়িত্ব জামায়াতের পক্ষ থেকে এনসিপির একজনকে ঠিক করে দেওয়া হয়েছে। তিনি হচ্ছেন জামাতের অন্যতম আস্থাভাজন, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী আর জামায়াতের দিক থেকে থাকবেন আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। এই দুইজন মিলেই এনসিপির ৩০ প্রার্থী চূড়ান্ত করবেন।
৫) ছোটন গংয়ের সঙ্গে নাহিদ ইসলামের আরো এক ধাপ আগানো সমঝোতা হয়েছে। ছোটন গং জানিয়েছে, পশ্চিমারা প্রধানমন্ত্রী কিংবা বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে সংসদে জামায়াতকে চায় না। সেই হিসাবে নির্বাচনে জিতলে নাহিদ ইসলাম হবেন প্রধানমন্ত্রী, আর বিরোধী দলে গেলে নাহিদ হবেন বিরোধীদলীয় নেতা।
পোস্টে কাদের আরও লেখেন, “এতো এতো তরুণ নিজের গোছানো ক্যারিয়ার, পরিবার পরিজন বাদ দিয়ে দেশের হাল ধরতে এসেছিল, একটা সম্ভাবনা তৈরি করেছিল, স্বপ্ন দেখেছিল; নাহিদ ইসলামরা গতকাল রাতে গিয়ে সেই স্বপ্নকে মাটিচাপা দিয়ে এসেছেন!”
এদিকে ‘৩০ আসনে এনসিপি জামায়াতের সঙ্গে জোটে গেলে ব্যাপারটা আত্মঘাতী’ হবে বলে মন্তব্য করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি রিফাত রশিদ।
তিনি এদিন এক ফেইসবুক পোস্টে লেখেন, “এখন পর্যন্ত এনসিপি-জামায়াতের আসন সমঝোতা হচ্ছে না। যা হচ্ছে সেটা নির্বাচনি জোট। জোটের নমিনেশনের বাইরে গিয়ে কেউ নির্বাচন করতে পারবে না।”
এনসিপির আসনে প্রার্থীদের নমিনেশন নিয়ে তার পোস্টও হুবহু তুলে ধরা হলো—
১.প্রথমত এনসিপি অলরেডি ১২৫ আসনে নমিনেশন কনফার্ম করেছে। প্রত্যেকেই তাদের এলাকায় গণসংযোগ চালাচ্ছে, খরচ করেছে। মহা ধুমধামে এনসিপি নমিনেশন ফরম বিক্রি করে যাচাই-বাছাই করে এদের নমিনেশন দিয়েছে। এদের মাঝে মাত্র ৩০ জন নমিনেশন পেলে বাকিরা বিদ্রোহী হয়ে উঠবে। পার্টি ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। যারা একবার এলাকায় প্রচারণা চালিয়েছে তারা যদি নির্বাচন না করতে পারে তাহলে এলাকায় তাদের রাজনীতি থাকবে না। ফলে এনসিপির নিজস্ব সাংগঠনিক ভিত্তি ভেঙেচুরে যাবে।
২. এনসিপিকে নিয়ে বাজারে এতোদিন চলে আসছে তারা জামাতের বি টিম। এখন নির্বাচনী আসন সমঝোতারও উর্ধ্বে উঠে জোটে গেলে সেটা স্টাবলিশ হয়ে যাবে। এনসিপি আর কখনো স্বতন্ত্র রাজনৈতিক সত্তা আকারে দাঁড়াতে পারবে না। মানুষ আর কখনো বিশ্বাস করবে না জামাত আর এনসিপি আলাদা। ফলে এনসিপির স্বতন্ত্র রাজনৈতিক যাত্রার ইতি টানা হয়ে যাবে। সে আর স্বতন্ত্রভাবে রাজনীতি করতে পারবে না।
সেইসাথে জুলাই অভ্যুত্থান ও তার রাজনীতিকে পুরোপুরি জামাতের কাছে হ্যান্ডওভার করে দেয়া হবে। জুলাইকে আর কোনোদিন এনসিপি ক্লেইম করতে পারবে না।করলেও জনগণ সেটা আর বিশ্বাস করবে না।প্রত্যাখ্যান করবে।নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের আলাপ স্রেফ একটা স্ট্যান্ডবাজি হিসেবে দেখবে মানুষ। এইটা এনসিপির স্মরণে রাখা উচিত।
৩. এনসিপির একটা বড় গ্রুপ এন্টি জামাত। অনেকেই বাম ঘরানা এবং জাতীয়তাবাদী ঘরানার। আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলছি এই মানুষগুলোকে জামাতের বণ্টনকৃত আসনে রাখা হবে না। ফলে রাজনৈতিকভাবে কর্ণার হওয়ার আগেই এদের অনেকেই পদত্যাগ করবে। একইসাথে এনসিপির ছাত্র সংগঠন জাতীয় ছাত্রশক্রি এন্টি জামাত-শিবির ফোর্স আকারেই পলিটিক্যালি দাঁড়িয়ে আছে। তারা ক্যাম্পাসে অকার্যকর হয়ে যাবে। যদি এমন জোট আগেই হতো তাহলে শিবিরের সাথে লিয়াজো করে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে তৎকালীন বাগসাস বেশ অনেকগুলো টপ পদ নিয়ে আসতে পারতো। এই ছেলেগুলো অলরেডি বিট্রেড ফিল করতেছে। এদেরকে রাজনৈতিকভাবে একোমোডেট করা এনসিপির জন্য প্রায় অসম্ভব কাজ হয়ে যাবে। ক্যাম্পাসগুলোতে এনসিপির ছাত্রসংগঠন না দাঁড়ালে এনসিপি রাজনৈতিকভাবে হারিয়ে যাবে।
৪. একাত্তরে জামাতের ঐতিহাসিক দায়, সাম্প্রতিক মবোক্রেসি, বিভিন্ন ধর্ম ও কমিউনিটির বিরোধিতা সহ এসব ক্ষেত্রে জামাতের পজিশনকেই এনসিপির পজিশন হিসেবে গণ্য করা হবে। এনসিপিও জোটের ঐক্য নিশ্চিতে এসবে সমর্থন জানাবে। ফলত এনসিপির ইনক্লুসিভ পলিটিক্সের বয়ান শেষ হয়ে যাবে।
৫. এনসিপির জামাতপন্থী বেল্টের হাতে পার্টির নেতৃত্ব চলে যাবে। ফলে এনসিপির ক্ষেত্রে যে রিউমার ছিলো এই পার্টির নেতৃত্ব বাংলামোটর না বরং মগবাজারের শুরা কাউন্সিলের থেকে আসে সেইটা সত্য হিসেবে প্রমাণিত হবে।এরফলে জামাতের বাইরে এনসিপির নিজস্ব কোনো রাজনীতি থাকবে না।
রিফাত লিখেছেন, “আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, এনসিপির স্বতন্ত্র নির্বাচন করা উচিত। সম্ভব হলে এনসিপির নেতৃত্বের তিন দলীয় জোটে আরও দল বাড়ানো উচিত। আর যদি জামায়াতের সাথে যেতেই হয় নির্বাচনি সমঝোতায় যাওয়া উচিত। ৩০ আসনে সমঝোতা হলে বাকি আসনগুলোতে এনসিপির ক্যান্ডিডেটরা যাতে নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়ে এলাকায় শক্ত সাংগঠনিক বেসমেন্ট তৈরি করতে পারে, সেদিকে ফোকাস করতে হবে। এনসিপি যদি জামায়াতের সঙ্গে জোটে যায় তাহলে এই দলটি অঙ্কুরেই বিনষ্ট হবে কিছু মানুষের মাত্রাতিরিক্ত ক্ষমতার খায়েশের জন্য।”