Published : 26 Apr 2026, 08:34 PM
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হওয়ার প্রায় দেড় বছরের মাথায় নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদ গঠনের পরও দেশে ‘ভয়ের পরিবেশ’ তৈরি করা হচ্ছে বলে জাতীয় সংসদে অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ (আবুল হাসনাত)।
কুমিল্লা-৪ আসনের এই এমপি শুধু মত প্রকাশ নয়, ‘দ্বিমত’ প্রকাশেরও স্বাধীনতা চেয়েছেন।
রোববার সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, এত রক্ত, লড়াই ও ত্যাগের পর গঠিত সংসদ আবার আগের ‘দোষারোপের চক্রে’ ফিরে যাচ্ছে।
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে, যার বিরুদ্ধে বিরোধীদের দমনে গুম, খুন, নির্যাতনের নানা অভিযোগে বিচার চলছে।
সেই আন্দোলনের অন্যতম নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, “আমরা মত প্রকাশের স্বাধীনতা চাই। মত প্রকাশের স্বাধীনতা আগেও ছিল। মত প্রকাশের স্বাধীনতা আওয়ামী লীগের সময়ও ছিল। তবে সেটা ছিল সহমত প্রকাশের স্বাধীনতা।
“আমরা এই পার্লামেন্টের পরে শুধুমাত্র মত প্রকাশের স্বাধীনতা নয়, আমরা দ্বিমত প্রকাশের স্বাধীনতা চাই।”
তিনি বলেন, “আমরা এখানে দাঁড়িয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা করতে চাই। আমরা নির্ভয়ে ফেইসবুকে ‘ব্যাকস্পেস’ ব্যবহার করতে চাই না। কিন্তু আবার একটা ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করা হচ্ছে। আবার একটা আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করা হচ্ছে।”
আবার আগের ‘ট্যাগিং’, দোষারোপ ও বিরোধী মত দমনের সংস্কৃতিতে দেশ ফিরে যাচ্ছে অভিযোগ করে হাসনাত বলেন, “ক্যাম্পাসগুলো আবার ‘আনরেস্টের’ দিকে যাচ্ছে। অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে। বিরোধী দল দমনের জন্য মামলা করা হচ্ছে।
“প্রতিমন্ত্রীকে নিয়ে ফেইসবুকে লেখার কারণে বাসা থেকে তুলে নিয়ে আসা হচ্ছে। হুইপের সমালোচনা করলে বাসা থেকে তুলে নিয়ে আসা হচ্ছে। আবার আমরা আগের সংস্কৃতিতে চলে যাচ্ছি।”
প্রধানমন্ত্রী নিজে কার্টুন শেয়ার করে স্যাটায়ার, প্যারোডি ও বিরোধী মতকে উৎসাহিত করছেন তুলে ধরে এই সংসদ সদস্য অভিযোগ করেন, সংসদ গঠনের পর থেকে মত প্রকাশের কারণে নয়টি ঘটনা ঘটেছে, যেখানে মানুষকে বাসা থেকে তুলে আনা হয়েছে।
তার মতে, এতে আবার একটি ‘ভয়ের পরিবেশ’ সৃষ্টি হচ্ছে।
নারীদের নিয়ে সমালোচনার ক্ষেত্রে সমাজে বাছাই করা প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন এনসিপির এমপি হাসনাত।
তিনি বলেন, “সমাজের গ্রহণযোগ্য বা পলিটিক্যালি এলিট শ্রেণির নারীদের নিয়ে সমালোচনা হলে সেটিকে নারীর বিরুদ্ধে অবস্থান হিসেবে দেখা হয়।
কিন্তু রাজনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর নারী, গার্মেন্টস কর্মী, গ্রামগঞ্জের নারী বা শ্রমজীবী মায়েদের গালি দেওয়া বা ‘স্লাটশেমিং’ করা হলে সেটিকে একইভাবে আমলে নেওয়া হয় না।”
ক্যাম্পাস রাজনীতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট বাঁধা এনসিপির এই সংসদ সদস্য।
সম্প্রতি ‘গুপ্ত রাজনীতি’ বিরোধী কর্মসূচি ঘিরে চট্টগ্রাম ও ঢাকায় বিএনপির সহযোগী সংগঠন ছাত্রদলের সঙ্গে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের সংঘর্ষ, মারধর এবং বিক্ষোভের ঘটনা ঘটেছে।
হাসনাত অভিযোগ করে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আবার অস্থিতিশীলতা তৈরি হচ্ছে। গেস্টরুম, গণরুম সংস্কৃতি এবং বাধ্যতামূলক রাজনীতির সংস্কৃতি চালুর চেষ্টা হচ্ছে।
নিজের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি দাবি করেন, ক্ষমতাসীনরা শিক্ষার্থীদের পুঁজি করে ক্ষমতার কাঠামো দীর্ঘমেয়াদি করতে বাধ্যতামূলক রাজনীতিতে ঠেলে দেয়।
ক্ষমতাসীনদের সন্তানরা বিদেশে নিরাপদ ভবিষ্যৎ পায়। কিন্তু মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত, শ্রমিক, রেমিটেন্স যোদ্ধা, যারা কষ্ট করে সন্তানদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠান, তাদের রাজনীতির হাতিয়ার বানানো হয় বলে হাসনাত অভিযোগ করেন।

তিনি বলেন, “আমরা এই সংস্কৃতির পরিবর্তন চাই। আমরা চাই, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শুধুমাত্র নেতা তৈরির হাতিয়ার হবে না।”
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণা, পাঠচর্চা ও মনস্তাত্ত্বিক সমৃদ্ধির জায়গা হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে সাবেক এই ছাত্রনেতা বলেন, সেখান থেকে বুদ্ধিজীবী ও গবেষক তৈরি হতে হবে।
জুলাই আন্দোলনের আকাঙ্ক্ষা পূরণের প্রশ্নও তোলেন আন্দোলন থেকে উঠে এসে এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়কের দায়িত্ব পাওয়া হাসনাত।
তিনি বলেন, “এই ৩৬ জুলাই তরুণ প্রজন্মকে কী দিয়েছে?”
তার অনুযোগ, বক্তব্যের শুরুতে অনেকে অনেককে স্মরণ করলেও জুলাইয়ে আহত এবং ১৭ বছর ধরে নির্যাতিত নিপীড়িত মানুষদের স্মরণ করতে লজ্জা হয়।
হাসনাত বলেন, কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্যই এই সংসদে আসা হয়েছে। এই পরিবর্তনের জন্যই সামগ্রিক ‘হাউজের’ লড়াই ছিল।
তিনি বলেন, ২০০৯ থেকে ২০১২ সালের সংসদীয় বিতর্ক তিনি পড়েছেন। তার দাবি, আজকের সংস্কার প্রস্তাবগুলো যদি ২০১৪ সালের সংসদে দেওয়া হতো, তাহলে এই সংসদের একজনকেও পাওয়া যেত না, যিনি ওই সংস্কারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতেন।
মানবাধিকার কমিশন ও পুলিশ সংস্কার অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ার বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন এনসিপির এই নেতা।
তিনি বলেন, “আজকে মানবাধিকার কমিশনকে ‘ল্যাপস’ করে দেওয়া হয়েছে। বারবার বলা হচ্ছে, আরও শক্তিশালীভাবে মানবাধিকার কমিশন নাকি উত্থাপন করা হবে। আজকে পুলিশ সংস্কার কমিশন অধ্যাদেশও বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। বলা হচ্ছে, আরও পুনর্বিবেচনা সাপেক্ষে এই সংসদে উত্থাপন করা হবে।”
তার মতে, যদি সদিচ্ছা থাকত, তাহলে অধ্যাদেশগুলো গ্রহণ করে পরবর্তী সময়ে সংশোধন করা যেত।
হাসনাত বলেন, “সবকিছুই তো সংশোধনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যদি নিয়তটা সহি থাকত, যদি সদিচ্ছা থাকত, এই অধ্যাদেশটাকে এখানে গ্রহণ করে পরবর্তী সময়ে কিন্তু সংশোধন করা যেত।”
তিনি সংসদ সদস্যদের প্রজন্মের ভাষা বোঝার আহ্বান জানান।
সংসদ সদস্যদের জনগণের কাছে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে এনসিপির এই নেতা বলেন, সংসদে যারা বসে আছেন, তারা দেশের সবচেয়ে সুবিধাভোগী মানুষের মধ্যে অন্যতম।
“এই সংসদে বসে, এসি রুমে বসে, এসি গাড়িতে চলে, মন্ত্রণালয়ের এসিতে বসে, বাসার মধ্যে ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের মধ্যে থেকে জনগণের সমস্যা বোঝা যায় না।”
হাসনাত বলেন, “আমরা এই সংসদে বসে যদি লোডশেডিং খুঁজি, এই সংসদে বসে লোডশেডিং পাওয়া যাবে না। এই সংসদে বসে জনগণের সমস্যা পাওয়া যাবে না।”
রাজনীতিতে বিভাজন ও নির্মূলের ভাষা নিয়ে সতর্ক করেন এনসিপির এই সংসদ সদস্য। তিনি বলেন, “আবার বিভাজনের রাজনীতিতে গেলে বিএনপি, এনসিপি বা জামায়াতে ইসলামী কেউই লাভবান হবে না। লাভবান হবে তারা, যাদের জুলাইয়ে পরাজিত করা হয়েছে।”
নয়া পল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে শনিরার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের বক্তব্যের নিন্দা জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বিএনপি ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ করে ক্ষমতায় এসেছে বলে শফিকুর রহমান ‘বক্তব্য দিয়েছেন’, এমন দাবি করে ফখরুল তার নিন্দা জানান।
পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীর সমালোচনা করে বিএনপি মহাসচিব বলেছেন, “তাদের যে অতীত সে ইতিহাস আমরা সবাই খুব ভালো করে জানি। সেই কারণেই সমগ্র জাতি অত্যন্ত সচেতনভাবে তাদেরকে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং আগামীতে যেন পুরোপুরি তাদেরকে নির্মূল করা যায় রাজনৈতিকভাবে সেভাবে আমাদেরকে কাজ করতে হবে।”
এই প্রসঙ্গ টেনে সংসদে একটি জাতীয় সমঝোতার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন হাসনাত। তিনি বলেন, নীতির জায়গায় মতভেদ থাকবে। নীতির জায়গায় সহমত ও ভিন্নমত থাকবে। কিন্তু একটি ‘রেডলাইন’ টানা উচিত, যা কেউ অতিক্রম করবে না।
“আমরা যখন শুনতে পাই, একটা রাজনৈতিক দলকে নির্মূল করার আহ্বান একটা সরকারি দল থেকে আসে, সেই বাংলাদেশ আমরা চাই না।”
নির্মূলের রাজনীতি, বিনাশের রাজনীতি, দমনের রাজনীতি, পীড়নের রাজনীতি যদি আবার শুরু হয়, সেখান থেকে এই সংসদের কেউ লাভবান হবে না বলে মন্তব্য করেন এনসিপির এই এমপি।
তিনি বলেন, “সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে সেই অপশক্তি, যারা বাংলাদেশকে ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিয়েছে। সেজন্য আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে হবে।”